.
গাভা
সুখস্মৃতিকে রসিয়ে রসিয়ে রোমন্থন করা বোধহয় মনের একটা বিলাস। না হলে আজ এত দুঃখকষ্টের মধ্যেও, ছন্নছাড়া অব্যবস্থিত জীবনের দুর্দিনেও কেন আমার জন্মভূমি গাভার কথা এত বেশি করে মনে পড়ছে? আমার মাটির মায়ের কাছ থেকে যে শান্তি যে সান্ত্বনা যে সুখ যে বৈভব পেয়েছিলাম একদিন, তার সঙ্গে আজকের দিনের জীবনকে তুলনা করতে কেন আমি ব্যস্ত? মন আমার অতীত-মুখর,–এই নগরজীবনের সমস্ত কিছুকে অগ্রাহ্য করে বল্গাহীন ঘোড়ার উল্কার গতি নিয়ে ছুটে চলেছে মন। তার সামনে কোনো বাধা কোনো বিপত্তিই যেন টিকবে না, মানুষের গড়া ভেদাভেদের কোনো তোয়াক্কাই করে না সে। উদ্দাম ঊর্ধ্বশ্বাসে সে পরিক্রমা করছে গাভা গ্রামটিকে কেন্দ্র করে। মনে পড়ছে, শীতের এক অপরাহ্নে কলকাতার শ্মশানের বহ্নিশিখায় এক মাকে হারিয়েছিলাম। বহুদিন পরে আর এক খন্ডপ্রলয়ে পূর্ববাংলার দিগন্তবিস্তৃত হিংসার আগুনে হারালাম আমার দেশমাতাকে। জননীর সঙ্গে সঙ্গে জন্মভূমিও গেলেন আমাদের অকূলপাথারে ভাসিয়ে। অসহায় বোধ করছি নিজেদের ভাগ্যের কথা চিন্তা করে। যাঁর স্নেহাঞ্চলে বড়ো হয়েছি তাঁর প্রতি অপরিসীম আকর্ষণ থাকা বিচিত্র নয়। প্রকৃতির পরিহাস এমন নির্মমভাবে কেন আমাদের ওপর বর্ষিত হল? সংসারের অমোঘ বিধানে একদিন এই ধরাতল থেকে সকলকেই যেতে হবে–তাই জ্বলন্ত চিতাগ্নির মধ্যে গর্ভধারিণী মাকে চিরবিদায় দিয়ে এসে বিয়োগব্যথায় মুহ্যমান হলেও –সময়ের পদক্ষেপে তা ফিকে হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মাটির মা–যাঁর সঙ্গে জীবনে ছাড়াছাড়ি হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই সেই মাকে হারানোর ব্যথা ভুলব কী করে? রাত্রিদিন অন্তরের অন্তস্তলে গভীর ক্ষতের অসহ্য যন্ত্রণা মনকে বিকল করে দিচ্ছে যেন। প্রকৃতির অফুরন্ত সৌন্দর্য-সম্পদ থেকে আমি নির্বাসিত। অপূর্ব সুষমামন্ডিত আমার ছেড়ে-আসা গ্রামের চরিদিকে শুধু সবুজের প্রাণভোলানো হাতছানি। সর্বত্রই ছিল সম্ভাবনার সুর, কিন্তু আগমনির বাঁশি বাজতে-না-বাজতেই যেন তা রূপান্তরিত হয়ে গেল বিদায়ের সুরে। সুন্দর ভুবন থেকে তো আমরা কোনোদিন বিদায় চাইনি, আমরা চেয়েছিলাম মানুষের মধ্যে বাঁচতে। কবিগুরুর বাণী তাই মনে আনত প্রেরণা। শহরের রুক্ষমলিন বাঁধন কাটিয়ে যখন আমার মাটির মায়ের স্নেহস্নিগ্ধ আবেষ্টনীর মধ্যে গিয়ে হাজির হতাম, তখনই কবিগুরুর মহাবাণীর সত্যতা সম্বন্ধে উপলব্ধি ঘটত। তখনই মন পাখা তুলে নেচে উঠত, মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে যেত, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। মুহূর্তে ভুলে যেতাম শহরের সব গ্লানি, দুঃখকষ্ট, অপমান–জীবনের পুঞ্জীভূত দৈন্য অপসারিত হয়ে সেখানে বড়ো হয়ে দেখা দিত নবজীবনের গান। দু-পাশে ধানের খেতের রৌদ্র-ছায়ার লুকোচুরি খেলা, ভরা জোয়ারের জলে পরিপূর্ণ খালের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথের দু-পাশে ঘন সন্নিবিষ্ট নারিকেল বীথি আর সুপারিকুঞ্জের মনোরম খিলানের নীচে পল্লিমায়ের শুচিস্নিগ্ধ শান্তিনিকেতন। পল্লিমায়ের সেই মনোমুগ্ধকর ছবিখানি চোখ বুজে ধ্যান করলে আজও আমি তাকে স্পষ্ট দেখতে পাই। আজ সেই মাকে হারিয়ে নিজেকে রিক্ত ও সর্বহারা বলেই মনে হচ্ছে–জীবিকার্জনের ধাঁধায় শাহরিক যন্ত্রসভ্যতার চাপে শরীর ও মন ক্লান্ত হয়ে পড়লে আজও মাথা আপনাআপনি জন্মভূমির পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে ভক্তি-নম্রতায়। আপন মনেই ভাবি মাটির মাকে কি ভবিষ্যতে আবার তেমনি আপন করে ফিরে পাব?
আমার ছেড়ে-আসা গ্রামও আর এককালের উদবাস্তু পুনর্বাসনেরই এক গৌরবজনক ইতিহাস। মগের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে সাধকপ্রবর রামকৃষ্ণ ঘোষ একদিন জন্মভূমি ভাতশালা গ্রাম ছেড়ে আশ্রয়ের সন্ধানে অনির্দিষ্ট পথে নৌকা ভাসান এবং বসতি স্থাপনের উপযুক্ত মনে করে বরিশাল জেলার এই গাভা গ্রামেই আস্তানা পাতেন। সে আজ বহুদিনের কথা–তখন চারদিকে ধু-ধু দিগন্তবিস্তৃত বিল ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ত না এখানে। তারপর ধীরে ধীরে বহুযুগ পেরিয়ে এসে এই লোকবসতি বাংলার অন্যতম বৃহত্তম গ্রামে রূপান্তরিত হল–সাধক রামকৃষ্ণ ঘোষের বংশধরদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গ্রামও উঠেছিল সমৃদ্ধির স্বর্ণশিখরে।
আমাদের পূর্বপাড়ার সঙ্গে পশ্চিমপাড়ার মিলনসেতু ছিল বড়ো পুলটা–বিলের শেষপ্রান্তে অস্তগামী সূর্য যখন অপূর্ব বর্ণচ্ছটায় যেত দিগন্তের কোণে তখন এই পুলে বসত প্রাণচঞ্চল তরুণ আর কিশোরদলের মজলিশ। সময় সময় তাদের মধ্যে অসীম সাহসী কোনো যুবক হয়তো পুলের রেলিঙের ওপর থেকে ভরা বিলের জলে পড়ত লাফিয়ে। প্রবীণদের আড্ডা বসত দারোগাবাড়ির ঘাটলায়। পড়ন্তবেলায় মাঠে মাঠে ছেলেদের খেলাধুলা ও হইচই হট্টগোলে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত সমস্ত গ্রামখানি। ভোরবেলা কিন্তু বাজারই ছিল আমাদের মহামিলন-ক্ষেত্ৰ-ছেলে-বুড়ো সবাই সেখানে এসে জুটত প্রাণের তাগিদে, গল্প করার নেশায়! ঘুম না ভাঙতেই বাজার বসত আমাদের গ্রামে–যার প্রয়োজন নেই সেও আসত সকলের সঙ্গে একজায়গায় ক্ষণিক মেলামেশার আনন্দ উপভোগ করতে। এ ছাড়া আর একটি মিলনক্ষেত্র ছিল গ্রামের পোস্ট অফিস। শহরের পোস্ট অফিসের মতো সেখানে কড়াকড়ি ছিল না–আর পোস্টমাস্টার, পিয়োন, ডাক-হরকরারা সবাই ছিল আপনজন, আত্মীয়-বিশেষ। পোস্ট অফিসের দরজায় বাংলায় ও ইংরেজিতে অবশ্য স্থায়ীভাবেই যথারীতি ‘ভিতরে প্রবেশ নিষেধ’ সংবলিত সাইনবোর্ডটি ছিল ফলাও করে টাঙানো! কিন্তু আমাদের গতি তাতে রুদ্ধ হত না কোনোদিন–চিঠি থাক বা না থাক সটান ঢুকে পড়তাম অফিসের ভেতর। সময় সময় মাস্টারমশায়ের কাজেও হাত লাগাতাম, শান্ত নিরীহ মানুষটি তাড়াতাড়িতে সব কাজ করে উঠতে হিমশিম খেয়ে যেতেন। তাঁর অবস্থার কথা চিন্তা করে আজও মনটা মুচড়ে ওঠে। কারও কোনো ভালো খবর পেলে তা নিজেই জানিয়ে আসার জন্যে অধীর হয়ে উঠতেন তিনি। জানি না আজ তিনি কোথায়, “সকলকে শুভসংবাদ দেওয়া যাঁর কাজ ছিল আজ তাঁর শুভসংবাদ দেবে কে?
