বেত মেরে কি মা ভুলাবে,
আমরা কি মা’র সেই ছেলে?
তাঁরই গ্রামবাসী আমরা কী করে ভুলে থাকব আমাদের গ্রাম-মাকে?
সুভাষচন্দ্র বসুর পদার্পণে ধন্য হয়েছে আমার গ্রাম। খুব ছোট্ট ছিলাম তখন, কিন্তু আজও বেশ স্পষ্ট মনে আছে–জাতীয় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বক্তৃতা দেওয়ার পর আমাদের পাশের বাড়ির দালানের বারান্দায় জ্যোৎস্না রাত্রে ইজিচেয়ারে শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম করছিলেন সুভাষচন্দ্র, তাঁর আশপাশে ছিলেন আরও কয়েকজন। জ্যোৎস্নায় উদ্ভাসিত আকাশের দিকে তাকিয়ে সুভাষচন্দ্র ক্ষীণকণ্ঠে গেয়ে উঠলেন—’এমন চাঁদের আলো, মরি যদি সেও ভালো।‘ পাশে দাঁড়িয়ে আমার এক দাদা প্রশ্ন করলেন–কী মরণ? সুভাষচন্দ্র উত্তর দিলেন, ‘যে মরণ স্বরগ সমান।’ সুভাষচন্দ্র আজ জীবিত কি লোকান্তরিত জানি না, কিন্তু দেশমাতৃকার বন্ধনমুক্তির জন্যে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে রাত্রির আলো-আঁধারেই তিনি দেশ থেকে বহির্গত হয়েছিলেন। আজ দেশবাসীর কাছে নেতাজিরূপে বন্দিত তিনি, কিন্তু তাঁকে দেশগৌরব মুকুটমণি প্রথম পরিয়েছিলেন কলকাতা মহানগরীর এক জনসভায় আমাদেরই গ্রাম-গৌরব স্বৰ্গত চিত্তরঞ্জন গুহঠাকুরতা।
অপূর্ব শোভামন্ডিত আমার ছেড়ে-আসা গ্রামে আবির্ভাব হয়েছে বহু স্মরণীয় ও বরণীয়ের –জীবনের এক-একটি ক্ষেত্রে তাঁদের এক-একজনকে পথিকৃৎ বললেও বোধ করি অত্যুক্তি হবে না।
থানা, ডাকঘর, হাটবাজার, স্কুল ইত্যাদি নিয়ে আমার গ্রামটি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। পল্লিসৌন্দর্যের এক অফুরন্ত ভান্ডার–সুখশান্তিতে নিরুপদ্রবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করেছে গ্রামবাসীরা। গ্রামের আশপাশে রয়েছে বিভিন্ন আশ্রম। গ্রামের মধ্যে আছে স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন চকমিলানো বানিয়াবাড়ি। এ বাড়ি গ্রামের একটি গৌরবের বস্তু। দূর-দূরান্তরের গ্রামের লোকেরা নৌকাপথে এর সমুখ দিয়ে যাওয়ার সময় নৌকা থামিয়ে একবার অন্তত এ বাড়ির সৌন্দর্য না দেখে যেতে পারে না। যাত্রা-থিয়েটারের দ্রব্যসামগ্রী থেকে শুরু করে একটা সংসারের পক্ষে আবশ্যক যাবতীয় জিনিসপত্র পাওয়া যায় এখানে। জেবিডি কালির আবিষ্কারক স্বনামখ্যাত জগবন্ধু দত্ত এ বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা।
দুর্গা পুজোর দু-দিন আগে থেকে লক্ষ্মী পুজোর পরদিন পর্যন্ত প্রবাসী ও অপ্রবাসী গ্রামবাসীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্যে জাহাজের মতো বিরাট একখানি করে স্টিমার খুলনা থেকে সরাসরি বানারিপাড়া পর্যন্ত চলাচল করত। বহুদূরের গ্রামবাসীরাও বাণারিপাড়া স্টেশনে নেমে নৌকো করে চলে যেত নিজ নিজ গ্রামে। পুজোর পরে শুরু হত নানারকমের সভাসমিতি, প্রীতিসম্মিলনী, বড়ো ও ছোটোদের নাট্যাভিনয় ও যাত্রাগান। এসব অনুষ্ঠানে মুসলমানেরাও যোগ দিয়েছে প্রতিবেশী ভাই হিসেবে, পুজোর প্রসাদ নিয়েছে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধায়। প্রসাদের প্রধান উপকরণ ছিল নারকেলের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী। গ্রামের মেয়েদের হাতের তৈরি নারকেলের জিনিস খেয়ে সুভাষচন্দ্র পরমতৃপ্তি পেয়েছিলেন।
ছোটো-বড়ো প্রতিটি লোকের সঙ্গেই প্রত্যেকের কী মধুর সম্পর্কই না লক্ষ করেছি গ্রামে, কলকাতার জীবনে আজ তা বিশেষভাবেই অনুভব করছি। ধোপা, নাপিত, ভূমালি এরা সবাই ছিল আপনার জন। ছোটোবেলায় এক সম্পর্কীয়া পিসির বিয়ের ছবি ভেসে উঠছে চোখের সামনে। বিয়ের আসরে আমাদের গাঁয়ের নাপিত এসে বিড়বিড় করে কী যে গৌরবচন বলে গেল তখন তা ঠিক বুঝতে না পারলেও পরে তার কাছ থেকে টুকে নিয়ে সবটা মুখস্থই করে ফেলেছিলাম। এখনও সে গৌরবচনের কিছুটা মনে পড়ে, ছড়া কেটে সে বলেছিল,
চন্দ্রসূর্য দেবগণ চিন্তাযুক্ত হৈল মন।
না হইলে নাপিতের কর্ম, শুদ্ধ হয় না কোনো বর্ণ।
ডাইনে শংকর বামে গৌরী,অদ্য মিলন হইল শিব-গৌরী।
আপনেরা চাঁদবদনে বলেন হরি হরি,
নাপিতের দক্ষিণা স্বর্ণ একভরি।
নাপিতস্য গড়গড়ি!
এই ‘নাপিতস্য গড়গড়ি’ কথাটি ছিল আমাদের হাসির খোরাক। কিন্তু সে যাই হোক, বর কনের মিলনকে শুদ্ধ করে দিয়ে নবদম্পতির জন্যে তার শুভ কামনার বিনিময়ে সে যে দক্ষিণস্বরূপ একভরি মাত্র স্বর্ণ প্রার্থনা করত তা কী আর এমন বেশি! বিবাহাদি ব্যাপারে এমনি নিজ নিজ কাজ করে থোপা, ভূমালি প্রভৃতি সব বৃত্তিজীবীই বিদায় পেত। তারা সব আজ কোথায়? তাদের কী করে চলে?
বাণারিপাড়া সম্মিলনীর কথা উল্লেখ না করলে এই গ্রামের বর্ণনা অসমাপ্ত থেকে যাবে। বাণারিপাড়ার বহু অধিবাসী ভাগ্যান্বেষণে আজ দেশের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়েছেন। বাণারিপাড়ার কয়েকজন উৎসাহী কর্মী প্রবাসে থেকেও পারস্পরিক মিলনক্ষেত্র হিসেবে এবং সেবার আদর্শ নিয়ে সম্মিলনীর প্রতিষ্ঠা করলেন। সেই থেকে সম্মিলনী নানাভাবে গ্রামের সেবা করে আসছে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে আমাদের হাস্যমধুর প্রাণচঞ্চল গ্রামখানি আজ নিস্তব্ধ শ্মশান–এই শ্মশানে আবার শিবের আবির্ভাব কবে হবে কে জানে?
মনে পড়ে কতদিন ভোরে রায়ের হাটের পুলের ওপর দাঁড়িয়ে মুসলমানদের দূর হতে ভেসে-আসা নামাজের সকরুণ সুর শুনেছি–সে-সুরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও মিলনের আহ্বান ছিল। দিবাবসানে কত সন্ধ্যায় সর্ব উত্তরের বাড়ির পুলের ওপর দাঁড়িয়ে ঘরে ঘরে সন্ধ্যারতির কাঁসর-ঘণ্টা বাজনা শুনেছি, সেই আরতির তালের সঙ্গে যেন নৃত্য করেছে আমার সারাপ্রাণ। কত রাত্রে নদীর পারে বেড়াতে বেড়াতে চোখে পড়েছে, নদীর জলে ছুটে চলেছে। শত শত চাঁদের রুপালি বন্যা। শরৎকালে কত প্রভাতে, শীতের কত মধ্যাহ্নে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে দেখেছি প্রকৃতির অফুরন্ত সৌন্দর্য-সারি সারি পাল তুলে চলেছে কত অজানা মাঝির নৌকা, দূরদিগন্তের শ্যামলিমা মুগ্ধ করেছে মনকে। কিন্তু সেসবই আজ স্মৃতি। তাই তো বলতে ইচ্ছে হয়—’নয়ন সম্মুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।’ রাজনৈতিক ঘটনা বিবর্তনে সে-গ্রাম আজ আমার কাছ থেকে দূরে-বহুদূরে, কিন্তু জীবনের শত পটপরিবর্তনেও মনের পটে আঁকা থাকবে একখানা ছবি–সে-ছবিখানি আমার ছেড়েআসা গ্রাম বানারিপাড়ার।
