বরিশাল জেলায় যে যায়নি সে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের ‘সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্য শ্যামলাং মাতরম’ বাংলা মায়ের এই রূপ বর্ণনা প্রত্যক্ষ করেনি। প্রকৃতি দেবীর অকুণ্ঠদানে প্রতিদিন দু-দুবার করে জোয়ার-ভাটার খেলায় বরিশালের গ্রামপ্রান্তর সুজলাং, বরিশালের মলয় শীতলাং ও বরিশালের মাটি সুফলাং শস্য-শ্যামলাং হয়েছে। রসপুষ্ট বরিশালবাসী তাই দূর-দূরান্তরে থেকেও বরিশালের মাটিকে ভুলতে পারে না। সেই বরিশালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জনপদ বাণারিপাড়া।
আমার গ্রামের পশ্চিমে বিস্তৃত খরস্রোতা নদী-দূর-দূরান্তরে যাবার স্টিমার পথ, আর গ্রামের মধ্য দিয়ে উত্তর ও পূর্বদিক ঘেঁষে ছোটো স্রোতস্বিনী খাল চলে গেছে–বরিশাল শহরে যাবার নৌকাপথ এটা। এই খাল ও নদীর সংযোগস্থলে খালের দু-পাশে বিরাট বন্দর। এর বিপরীত দিকে গ্রামের পূর্ব সীমানায় সপ্তাহে দু-দিন হাট বসে এবং এই হাটে হাজার হাজার মন ধান চাল কেনাবেচা হয়ে থাকে। বন্দর ও হাটকে যুক্ত করে গ্রামের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে গেছে সিমেন্ট বাঁধানো একটি রাস্তা। এই পথ ক্রমে দীর্ঘ হয়ে বরিশাল শহরে গিয়ে মিশেছে। বর্ষা-অন্তে মোটরযোগে বরিশাল শহরে যাতায়াতে এই পথই প্রশস্ত। গ্রামের কিছু দূরে উত্তরে চাখার, খলিসাঁকোটা, উজিরপুর; পূর্বে নরোত্তমপুর, গাভা, কাঁচাবালিয়া, দক্ষিণে আলতা, আটঘর, স্বরূপকাঠি ও পশ্চিমে বাইসারি, দস্তোঘাট, ইলুহার প্রভৃতি প্রসিদ্ধ গ্রামগুলো বানারিপাড়াকে মধ্যমণি করে স্ব স্ব ঐতিহ্যের বাহকরূপে দীপ্যমান রয়েছে। গ্রামের দক্ষিণাংশে বাস বিখ্যাত নট্টসম্প্রদায়ের, যাদের সুমধুর ঢোল বাজনা ও যাত্রাগান বাংলাদেশে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। গ্রামের চারদিকে রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, তারা বংশপরম্পরায় হাট-বন্দরের শ্রীবৃদ্ধিসাধন করে গ্রামকে সর্বদা প্রাণচঞ্চল রেখেছে। আর সেই সুন্দর পাকা রাস্তার দু-ধারে ও গ্রামের অন্যত্র ছড়িয়ে আছে বাংলার সুপরিচিত বুদ্ধিজীবী ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্য মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়, যারা সংস্কৃতি ও শিক্ষায় সমাজে খ্যাতিলাভ করেছে। এদের মধ্যে গুহঠাকুরতা বংশই সংখ্যায় গরিষ্ঠ, প্রতিষ্ঠায় শ্রেষ্ঠ ও সর্বত্র সুপরিচিত।
এই মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টায় গ্রামে নানাবিধ শিক্ষা ও সংস্কৃতিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এদেরই অনুপ্রেরণা ও স্বার্থত্যাগে প্রায় সত্তর বৎসর পূর্বে এ গ্রামে স্থাপিত হয়েছে প্রথম উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়। দুটি বৃহৎ দালানে অবস্থিত রয়েছে এই বিদ্যালয়টি। গ্রামান্তরের বহু ছাত্রকে দেখেছি বাণারিপাড়ার ঘরে ঘরে থেকে শিক্ষালাভ করেছেন। স্বর্গীয় বসন্তকুমার গুহঠাকুরতা ও রজনীকান্ত গুহঠাকুরতা প্রভৃতি বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবৃন্দের সাহায্যে একদিকে ক্রমশ শ্রীবৃদ্ধি হয়েছ এ বিদ্যালয়টির, অপরদিকে পরবর্তীকালে জাতীয় বিদ্যালয়, হরিজন বিদ্যালয়, মনোরঞ্জন শিল্পসদন, একটি অবৈতনিক বালিকা বিদ্যালয় ও শ্রীভবন নামে একটি উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। বাণারিপাড়ার পাবলিক লাইব্রেরিটিও স্থাপিত হয়েছে প্রায় ষাট বৎসর পূর্বে। পরে আরও একটি লাইব্রেরি গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিনামূল্যে দরিদ্র জনসাধারণের চিকিৎসার জন্যে জেলাবোর্ডের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি দাঁতব্য চিকিৎসালয়, যাতায়াতের সুবিধার জন্যে খালের ওপর নির্মিত হয়েছে চার চারটে প্রকান্ড লোহার পুল। পূর্বে বাজারের কাছে যে রমণীয় দোলায়মান লোহার পুলটি ছিল তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংগঠনমূলক কাজ এগিয়ে চলেছে একদিকে, অন্য দিকে গ্রামে আনন্দ বিতরণের জন্যে লোকসংস্কৃতির বিশিষ্ট অবদান কীর্তনগান, কবিগান, যাত্রা ও থিয়েটার প্রভৃতির ব্যাপক প্রচলনও হয়েছে।
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশি আন্দোলন থেকে শুরু করে অসহযোগ ও আইন অমান্যের কাল পর্যন্ত যাবতীয় রাজনৈতিক আলোড়নে বানারিপাড়া বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে এসেছে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে এ গ্রামের অবদান সত্যিই বিরাট। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে দার্জিলিং-এ লেবং নামক স্থানে তদানীন্তন গভর্নর অ্যাণ্ডারসনকে হত্যা করতে গিয়ে ভবানীপ্রসাদ ভট্টাচার্য নামে ১৬ বৎসর বয়সের যে যুবক ফাঁসির মঞ্চে জীবন বিসর্জন দেয় সে-যে এই গাঁয়েরই আত্মভোলা ছেলে! আইন অমান্য, বিলিতি দ্রব্য বর্জন মাদকদ্রব্যের দোকানের সামনে পিকেটিং, ঘরে ঘরে লবণ তৈরি, সুতোকাটা প্রভৃতি বিষয়ে কেশব ব্যানার্জি, কালাচাঁদ ভট্টাচার্য, ক্ষিতীশ ঠাকুরতা, কুমুদ ঠাকুরতা, ইন্দুমতী গুহঠাকুরতা, নলিনী দাশগুপ্ত ও অন্যান্যকর্মীবৃন্দ যে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সে-যুগে সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ছিলেন মনোরঞ্জন গুহঠাকুরতা–বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে বরিশাল সম্মেলনের সময় সরকারি আদেশ অগ্রাহ্য করে বন্দেমাতরম’ ধ্বনি উচ্চারণের জন্যে পুলিশের লাঠিতে নিগৃহীত চিত্তরঞ্জন গুহঠাকুরতা তাঁরই অমরকীর্তি সন্তান। পুলিশের প্রহারে জর্জরিত-দেহ, তবু বন্দেমাতরম’ ধ্বনির বিরাম নেই। সুতীব্র প্রতিবাদে জানিয়ে দিলেন তিনি,
