প্রলয় মন্থন ক্ষোভে
ভদ্রবেশী বর্বরতা উঠিয়াছে জাগি
পঞ্চশয্যা হতে। লজ্জা শরম ত্যাগি
জাতি-প্রেম নাম ধরি প্রচন্ড অন্যায়
ধর্মেরে ভাসাতে চাহে বলের বন্যায়।
বরিশাল জেলা – বাণারিপাড়া গাভা কাঁচাবালিয়া মাহিলাড়া চাঁদসী সৈওর নলচিড়া
পরপারের ডাক এলে মানুষকে সব কিছু ছেড়ে এ সংসার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে হয় মহাপ্রস্থানের পথে তা জানি, আর জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝি তার জন্যে শোক করে কোনো লাভ নেই, হয়তো তা বৃথা; কেননা আলোর অপরদিকে যেমন আঁধার, জীবনের অপরদিকে তেমনি মরণ–যে চলে যায় তাঁর স্মৃতি শুধু পড়ে থাকে, তাঁর সন্ধান মেলে না আর কোনোকালে।
শতাব্দীব্যাপী সাধনায় যে স্বাধীনতা পেয়েছি আমরা, সে স্বাধীনতার যজ্ঞাহুতিতে আত্মবিসর্জন দিয়েছে বহু বীর, ত্যাগ ও দুঃখ ভোগ করেছে বহু দেশকর্মী, লাঞ্ছনা ও নির্যাতন হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছে অগণিত নর-নারী। এ চরম ও পরমবস্তু লাভের জন্যে পার্থিব ক্ষয়ক্ষতিকে মাথা পেতে নিতে কুণ্ঠা বোধ করেনি ভারতবাসী, বিশেষ করে বাঙালি। ত্যাগের মহিমায় প্রদীপ্ত করেছে তারা দেশকে, জননী ও জন্মভূমি তাদের চোখে এক ও অভিন্ন, জন্মদায়িনী ও দেশমাতৃকা ‘স্বর্গাদপি গরীয়সী’ তাদের কাছে।
পরাধীনতার বন্ধনমুক্তির জন্যে ধূপের দহনের মতো নিপীড়ন সহ্য করেছে যেমন অগণিত দেশবাসী তেমনি দুঃসহ ব্যথার মধ্যে দেশমাতৃকার স্বাধীনতাকে বরণ করে নিয়েছি আমি। স্মরণীয় সেই ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা উৎসবের দিনে আনন্দে মুখরিত কলকাতা মহানগরীর রাজপথ দিয়ে মাতৃহারার ব্যথা, বুকে নিয়ে চলেছিলাম শ্মশানযাত্রায়। শ্মশানে শায়িতা সেই করুণাময়ী স্নেহময়ী মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো ভেবেছিলাম, এক মাকে হারিয়েছি আর এক মা হয়তো আমার আছে, যে মায়ের সান্নিধ্যে গিয়ে স্নেহের নীড়ে মাথা এঁজে ভুলতে পারব মনের যত ব্যথা। কিন্তু কোথায় সে সান্ত্বনা? গর্ভধারিণী মাকে হারাবার সঙ্গে সঙ্গে মাতৃভূমি, পিতৃপুরুষের জন্মভূমিকেও হারিয়েছি। দেশমাতৃকা দ্বিখন্ডিত হয়ে আমাদের জন্মভূমি চলে গেছে আজ অন্য রাজ্যে, পরশাসনে। শ্মশানচুল্লির ধূমায়িত পিঙ্গলাগ্নি আমার যে মায়ের দেহকে ছাই করে দিয়েছে, জানি আমি জানি, এ জীবনে তাঁর আর সন্ধান পাব না; কিন্তু রাজনীতির পাকচক্রে শ্মশানের চেয়েও ভয়াবহ আগুনের লেলিহান শিখায় হাজার হাজার নর-নারী ও শিশুর জীবন পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে, আমাদের ঘরছাড়া, দিশেহারা হতে হবে তা ভাবতে পারিনি কোনোদিন। ঝড়ের মধ্যে নীড়হারা রাতের পাখি যেমন করে বিলাপ করে ফেরে বন থেকে বনান্তরে, আমরাও তেমনি দেশবিভাগের অভিশাপে অজানার স্রোতে ভেসে চলেছি দেশ থেকে দেশান্তরে, স্থান থেকে স্থানান্তরে; আর দৈনন্দিন জীবনে বহন করে চলেছি ছিন্নমূল উদবাস্তু জীবনের শত বিড়ম্বনা ও লাঞ্ছনা। জানি না কবে হবে এই মহানিশার অবসান!
শান্ত, স্নিগ্ধ, ছায়াসুনিবিড় আমার পল্লিগ্রাম ও সরল অনাড়ম্বর একান্ত পরিজনদের ছেড়ে এসে কোলাহলমুখর মহানগরীর লক্ষ লোকের ভিড়ের মধ্যে আজ হারিয়ে ফেলেছি নিজেকে –গতানুগতিক কর্মক্লান্ত একটানা জীবন নিয়ে কোনোমতে কষ্টে-ক্লিষ্টে বেঁচে আছি। বিস্মৃতপ্রায় কবে কোন ছেলেবয়সে কবিতায় পড়েছিলাম, ‘ভবিষ্যতের লক্ষ আশা মোদের মাঝে সন্তরে, ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সে রঙিন স্বপ্ন আজ চলে গেছে, বাস্তবের অভিজ্ঞতায় আজ বুঝতে পারছি কল্পনা ও বাস্তব এক নয়, আমাদের যাত্রাপথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, কণ্টকাকীর্ণ–জীবনযুদ্ধের প্রতিপদক্ষেপে রয়েছে কঠিন দ্বন্দ্ব, প্রবল প্রতিযোগিতা।
কর্মক্লান্ত জীবনের ক্ষণিক অবকাশে মাঝে মাঝে যখন আনমনে মহানগরীর ফুটপাথ দিয়ে চলি কিংবা গঙ্গার ধারে গিয়ে বসি তখন আমার মা আর আমার পল্লিগ্রাম বানারিপাড়ার স্মৃতি আমার মনে জাগে। এই স্মৃতি আমার সমস্ত অস্তিত্বকে যেন আচ্ছন্ন করে দেয়। কত কথাই না মনে পড়ে তখন, আর ভাবতে ভাবতে চোখ জলে ভরে আসে।
বাল্য ও কৈশোরের সামান্য কয়েকটা দিন কাটিয়েছিলাম আমার পল্লিগ্রাম বানারিপাড়ায়। বাবা থাকতেন বিদেশে, তাই বাকি সময়টা তাঁর সঙ্গে ঘুরেছি নানা জায়গায়, পড়াশুনাও করেছি নানা শিক্ষায়তনে। কিন্তু বাল্যকালের সেই পল্লিজীবনের স্মৃতি আজও অম্লান হয়ে জাগ্রত আছে আমার মানসপটে। পাগলামি স্বভাবের নিশ্চিন্ত দিনগুলোতে যে গ্রামের ধুলোমাটি গায়ে মেখে বাল্যবন্ধুদের সঙ্গে একত্রে খেলা করেছি, পুকুরে স্নান করেছি, স্কুলে গেছি, সেই সাতপুরুষের ভিটের মায়া আজও যে ভুলতে পারিনি। পিতৃপিতামহের আশিসপূত তাঁদের যুগযুগান্তরের পুণ্যস্মৃতি বিজড়িত বাণারিপাড়ার সঙ্গে আমার অন্তরের ও নাড়ীর যোগ, এ গ্রাম আমার বাল্যের মনভোলানো মায়াপুরী, এ গ্রাম যে আমার কাছে তীর্থভূমি–এর প্রতিটি ধূলিকণা আমার কাছে পবিত্র, তাই কী করে ভুলব, কী করে ভুলতে পারব আমার ছেড়ে-আসা বানারিপাড়া গ্রামকে? সন্তান যেমন ভালোবাসে মাকে, আমি তেমনি ভালোবেসেছি বাণারিপাড়াকে।
লক্ষ গ্রামের বাংলাদেশে আমার গ্রাম বানারিপাড়া একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে শুধু বরিশাল জেলায় নয়, সমগ্র বাংলার মধ্যে বাণারিপাড়া অনন্য।
