কিন্তু গ্রাম পরিক্রমার এখনও অনেক বাকি। হরিকাকার বাড়ি বাঁয়ে রেখে, ডাইনে ফেলে অশ্বত্থা-গজানো উঁচু দোলমঞ্চ-চলো আরও এগিয়ে!
উলুধ্বনি শুনতে পাচ্ছ? বেলা এখন দুপুর। গাঁয়ের কোনো সম্ভ্রান্ত সীমান্তিনী বুঝি ‘দুধ-চিনি’ দিতে এসেছে পুজোমন্ডপে। কবে হয়তো ছেলের জ্বর হয়েছিল গরম লেগে। স্নেহময়ী মাতা মানত করেছিল পুত্রের রোগমুক্তি হলে পুজোমন্ডপে দেবীর আসনে দেবে দুধ-চিনি। ও তারই কণ্ঠের উলুধ্বনি। তুমি যদি এখন সেখানে উপনীত হও, তাহলেও প্রসাদ পাবে একটু চিনি বা একটুকরো বাতাসা। পল্লির দেবসেবার সঙ্গে মানব-সেবার যোগ অঙ্গাঙ্গি।
ওই পুজোমন্ডপে এ গাঁয়ের ‘টাউন হল’, আশপাশের পাঁচ গাঁয়ের ফৌজদারি দেওয়ানি আদালত। বছরে একবার এখানে হয় মহিষমর্দিনী দুর্গাপুজো। গাঁয়ের ছেলে-বুড়ো সকলের মন পুজোর তিনদিন বাঁধা থাকে এই মন্ডপের চতু:সীমানায়। গান বলল, বাজনা বল, আনন্দ বল, উৎসব বল,–সারাগাঁয়ের উচ্ছ্বসিত আনন্দ-ধারা ওকেই কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ওই পুজোমন্ডপ গ্রামের প্রাণকেন্দ্র। সন্ধ্যায় ওখানে গ্রামবৃদ্ধ সমাজপতিদের সভা বসে। কত আলাপ-আলোচনা, বিচারদন্ড চলে। প্রতিরবিবারে বসে হরি-সংকীর্তনের আসর। কলিযুগের মুক্তিমন্ত্র হরিনাম আর মৃদঙ্গের বোলে নৈশ পল্লির তারাভরা আকাশ মুখর হয়ে ওঠে। হায় রে! বাংলার সে-আকাশ জুড়ে আজ সর্বহারা আর্তনাদ, মৃত্যুর বীভৎস হাহাকার।
ওই পথ ধরে আরও খানিকটা এগিয়ে গেলেই দেখতে পাবে টিনের আটচালায় বসেছে পাঠশালা। কানাই মাস্টার রজব মৌলবির শিক্ষাদান চলেছে অব্যাহত গতিতে। পাঠশালার সামনে দেখবে, ছেলেরা সার ধরে দাঁড়িয়ে নামতা পড়ছে সমবেত কণ্ঠে–দুই একে দুই, দুই দু-গুনে চার ইত্যাদি।
তাই বলে এই ভরা দুপুরবেলা ওপথ ধরে আর যেয়ো না কিন্তু। জানো না তো আর কিছুটা এগিয়েই পথ শেষ হয়েছে পুরোনো কালীখোলায়। বেতের ঝোঁপ আর ভাটির জঙ্গল দিয়ে ঘেরা সামান্য একটু জায়গা। দুটো প্রাচীন বট গাছ শাখা-প্রশাখা মেলে জায়গাটা একেবারে ঢেকে রেখেছে। তারি একপাশে খড়ের ভাঙা মন্দিরে বিকট দর্শন বিরাট কালীমূর্তি। উইয়ের ঢিপিতে ঢেকে গেছে পদতলে শায়িত মহাদেবের অর্ধেক দেহ। কাটা-কুমড়োর লতা এসে ঘিরে ধরেছে কালামূর্তির রূপালি মুকুট। একপাশে হয় তো আস্তানা গেড়েছে শেয়াল। ও নাকি মা কালীর জাগ্রত রক্ষী। তোমাকে দেখে যদি হঠাৎ ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে চেঁচিয়ে ওঠে, তবে আর রক্ষা নেই। মা কালীর তৃতীয় নয়ন নাকি তাহলে বিদ্যুৎ চমকের মতো একবার তোমার ওপর দিয়ে খেলে যাবে। আর অমনি তুমি বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে–
আর কোথায় যাও? এই তো গ্রামের শেষ। ওই তো সামনে ধু-ধু করছে চম্পার বিল। তার থই থই-করা কালো জলে লাল পদ্মফুলের আলোকরা শোভা। সেই পদ্মফুল একদিন দিয়েছিলাম কিশোরবেলায় বন্ধুর হাতে অনুরাগের লীলাকমল করে। ফুল পেয়ে কিশোর বন্ধু উচ্ছ্বসিত হয়ে আমায় প্রণাম করেছিল। তার ছেলেমানুষিতে আমি হেসে উঠেছিলাম অট্টহাসি। সেই হাসি হেসেছিলাম আর-একদিন অসমের এক মহকুমা-শহরে। জাগরণে নয়, লীলাকমলের স্বপ্ন দেখে।
কিন্তু যে স্বপ্ন এতক্ষণ তোমায় দেখালাম, সে তো শুধুই স্বপ্ন নয়। একদিন তো এই-ই সত্য ছিল। যে গ্রামটিকে কেন্দ্র করে একদিন স্বপ্নের জাল বুনেছিল অনেক কিশোরমানুষ সে তো একটি গ্রামমাত্র নয়, সে যে গ্রামকেন্দ্রিক বাঙালি সভ্যতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
গ্রামের নাম খাসকান্দি। ফরিদপুরের জেলা শহর থেকে যশোর রোড ধরে মাত্র সাত মাইল দুরে একটি সম্পন্ন-গ্রাম। সকাল বেলাকার নগর-সংকীর্তনের দল, দুপুরের পাঠশালা, অপরাহুের দুধের বাজার আর রাতের যাত্রাদলের আসরের জন্যে আশপাশের অনেক মানুষের মুখে মুখে একদিন ফিরত এই গ্রামের প্রশংসাধ্বনি। কিন্তু সে গ্রামের কথা আজ বুঝি আবাস্তব স্বপন-কাহিনিতেই পর্যবসিত হয়। হায় রে ধূলিলুষ্ঠিত বিশুষ্ক পলাশ, লীলাকমল! হায় রে আমার সোনার গ্রাম–আমার ছেড়ে-আসা গ্রাম!
.
কুলপদ্দি
ছোটোবেলার দিদিমার কোলে বসে এক স্বপনপুরীর গল্প শুনতাম। সেখানে গাছে গাছে সোনা ফলত। হিরার মতো বৃষ্টিরা ঝাঁক বেঁধে নেমে আসত সেই দেশের বুকে। নদীর কলতানে শোনা যেত বীণার ঝংকার। কত আগ্রহ নিয়ে সেই দিন সেই গল্প শুনেছি আর প্রশ্নের পর প্রশ্নে বিরক্ত করে তুলেছি বৃদ্ধা দিদিমাকে। সেদিন কি একবারও ভেবেছি যে আমাকেও একদিন এমনি গল্প শোনাতে হবে সকলকে; মাত্র ত্রিশ বছর বয়সেই পঙ্গু মন নিয়ে দিদিমার অভিনয় করতে হবে সারাটা দেশের সামনে?
দিদিমা মারা গিয়েছেন অনেককাল, কিন্তু অক্ষয় হয়ে আছে সেই স্বপনপুরী। সেদিনকার অবুঝ মনে সহানুভূতি জাগ্রত বন্দিনি রাজকন্যার জন্যে, আজ নিজের দুর্ভাগ্যের কথা স্মরণ করে নিজের ওপরই অনুকম্পা হয়। তাই মনে মনে এখন স্বপ্নের জাল বুনি, স্মৃতির কুসুম নিয়ে রচনা করি তারই কাহিনি, কবিরা কল্পনায় যাকে গড়ে তোলে কাব্যে, আজন্ম শহরবাসীরা যার ছবি দেখে স্বপ্নে।
আড়িয়ালখাঁ নদী নয় নদ। স্ত্রী নয়, পুরুষ। কিন্তু তাকে পুরুষ কল্পনা করা আমার পক্ষে অসম্ভব। শুধু আমি কেন, তরঙ্গভঙ্গে উজ্জ্বল আড়িয়ালখাঁর তীরে দাঁড়িয়ে জগতের সবচেয়ে বেরসিক লোকও বোধ হয় বলতে পারে না- খাঁ সাহেব এমন নেচে নেচে কোথায় যাচ্ছ তুমি? তবু আড়িয়ালখাঁ নদী নয়, নদ। তার নাম গঙ্গা বা যমুনার মতো কিছুই হতে পারবে না, তার নাম থাকবে–আড়িয়ালখাঁ।
