সব তীর্থ সার
তাই মা তোমার কাছে এসেছি আবার।
আরও অনেক কথাই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে সেদিন বলেছিলাম। বন্ধু একটুখানি হেসেছিলেন মাত্র।
আমিও হেসেছিলাম সেদিন রাতে। জাগরণে নয়, স্বপ্নে।
ধুলো-ঢাকা যশোর রোডের বুকে নেমেছে বৈশাখী পূর্ণিমার উজ্জ্বল জ্যোছনা। পথের দু ধারে অর্জুন গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধ প্রহরীর মতো। আলো-ছায়ার আলপনা আঁকা পড়েছে ধুলোর রাস্তায়।
ওই তো দেখা যায় বাঁশতলার পুল। বর্ষার খরস্রোত কুমারের উদ্ধত জলধারা যখন ওই সংকীর্ণ পুলের সংকীর্ণতর ছিদ্রপথে পথ খুঁজে মাথা আছড়াত অবিশ্রাম, পুলের মুখে তখন প্রতিবৎসর সৃষ্টি হত একটা তীব্র ঘূর্ণাবর্ত। ছেলেবেলায় আমরা ওকে বলতাম ‘বাটি’। ক্ষুধার্ত কুমার-নন্দন যেন মুখর মুখব্যাদান করে আছে তীব্র আক্রোশে। ছেলেবেলায় আমরা পুলের ওপর থেকে ওর ক্ষুধার্ত মুখে ফেলে দেখতাম কচুর পাতা, বটের ছোটো ডাল, ভাঁট ফুল, আরও কত কী। সেগুলো স্রোতের মুখে দু-তিনটে পাক খেয়ে ঘূর্ণাবর্তের অতল গহ্বরে যেত তলিয়ে। আমরা উচ্ছ্বসিত আনন্দে হেসে উঠতাম করতালি দিয়ে। ঘটনার ক্ষুরধার ঘূর্ণাবর্তে আজও অতলে তলিয়ে যাচ্ছে জীবনের আশা, আনন্দ, করতালি। কিন্তু আজ আর হাসবার অবসর নেই। আজ শুধু ক্রন্দন। কুমার, পদ্মা, মেঘনার তীরে তীরে শুধুই মর্মভেদী হাহাকার।
কিন্তু যে-কথা বলছিলাম।
ওই বাঁশতলার পুলের পাশ দিয়ে জেলা বোর্ডের ছোটো রাস্তা। দু-পাশ ধরে ছোটো ছোটো খেজুর গাছের সারি। ধানের খেত। দিগন্তবিস্তৃত গজারের বিলের রহস্যময় হাতছানি।
রাস্তা ধরে আরও খানিকটা এগিয়ে গেলেই ছোটো কাঠের একটা পুল। মস্ত বড় একটা তেঁতুল গাছের ছায়া দিয়ে ঘেরা। পুলের দু-পাশ দিয়ে কাঠের রেলিং! সকাল-সন্ধ্যায়, সময়ে অসময়ে গ্রামের ছেলে-বুড়ো সকলের ওটা বেওয়ারিশ আড্ডার জায়গা। বর্ষায় ওর আশপাশে ছোটো ছোটো ছিপ দিয়ে মাছ ধরে ছোটো ছোটো ছেলেরা। বসন্ত সন্ধ্যায় ওই রেলিংয়ে ভর দিয়ে গলা ছেড়ে গান গায় কিশোর বালকের দল। যুবকদের আড্ডা-ইয়ার্কি চলে রাতের প্রথম প্রহর পর্যন্ত। ক্রমে রাত বাড়তে থাকে। ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাকে মন্থর হয়ে আসে পল্লির আকাশ। বৃদ্ধেরা তখন ওই পুলে জমায়েত হয় সমাজ পঞ্চায়েতের ভূমিকা নিয়ে। ন্যায় ও অন্যায় শাসনের রকমারি ফতোয়া জারি করে। পুলের নীচে খালের জলধারা কুলকুল রবে বয়ে চলে।
এই তো পৌঁছে গেলাম গাঁয়ে।
গ্রাম, কিন্তু ম্যালেরিয়া-বিধ্বস্ত, নিরানন্দ, কুঁড়েঘর সম্বল কতকগুলো জীর্ণ শীর্ণ স্বপ্নহীন মানুষের বাসভূমি নয়। ঝকঝকে টিনের দু-তিন মহলা বাড়ি, আম-জাম নারিকেল-সুপারি কাঁঠালের বাগান, তাল-খেজুর গাছের গুঁড়ি দিয়ে ঘাট বাঁধানো কাক-চক্ষু জলভরা পুকুর, ত্রিনাথ-বাউল-হরিকীর্তন-যাত্রাদলের আনন্দধ্বনি মুখরিত প্রাঙ্গণ, আর পর্যাপ্ত আহার-নিদ্রা লালিত-তৈলচিক্কণ মানুষ–এই নিয়ে গড়া একটি মানববসতি। এই বাংলার গ্রাম। তোমার আমার সকলের। হায় রে সেদিন!
গ্রামে ঢুকতেই বাঁ-দিকে আগাছায় ঢাকা একটি পোড়ো ভিটে। গ্রামের ছেলে-বুড়ো যাকেই পরিচয় জিজ্ঞাসা করো, বলবে–হরিকাকার ভিটে।
ক্ষণেকের তরে সময়ের নদীতে লাগুক উজানের টান। ফিরে চলো কুড়ি বছর আগেকার এক মধুর চৈত্রসন্ধ্যায়।
হরিকাকার বাড়ি। সামনে আমগাছে ঘেরা বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণের একপাশে চৈত্র পুজোর আসন পাতা।
দাওয়ায় বসে আছেন হরিকাকা। গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের সরকারি কাকা। একহারা কালো চেহারা, করিৎকর্মা লোক। গ্রামের যাত্রাদলে পার্ট করেন। অর্জুনের ভূমিকা থেকে ঘেসড়ার ঘুঙুর-নৃত্য অবধি সব অভিনয়ে তিনি সমান দক্ষ।
হরিকাকা এবার জুড়ে দিয়েছেন চৈত্র পুজোর মেলা।
বিকেল হতেই গাঁয়ের শৌখিন ছেলে-বুড়োর দল একে একে জমতে লাগল কাকার আঙিনায়। আম গাছের তলায় কলার পাতা পেতে সবাই এক সঙ্গে পেল খিচুড়ি প্রসাদ। তারপর সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হল বেলোয়ারি সং নিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণ। কেউ সাজল লোলজিহ্বা খঙ্গহস্ত মহাকালী, কেউ-বা বাঁশরিভূষণ শ্রীনন্দন কেউ ত্রিশূলধারী শ্মশানচারী ভোলানাথ, আবার কেউ-বা নৃত্যপরায়ণা সুন্দরী উর্বশী।
সারারাত ধরে চলে গৃহ হতে গৃহান্তরে সং নিয়ে পল্লিপরিক্রমা। পল্লিবাসীরা পরম আগ্রহে সঙের দলকে বাড়িতে ডেকে নেয়। গান শোনে। নাচ দেখে। সাধ্যমতো ‘বিদায়ি’ দেয় চাল ডাল পয়সা। দেখতে দেখতে সঙের দলের ভান্ডারীর ঝুলি ভরে ওঠে। কালের কুটিল গতি! সেই পল্লীবাসীরা আজ কোথায়?
অতএব ওপথ ছেড়ে চলো যাই গ্রামের ‘তরুণ পাঠাগারে। ওপাড়ার মুখুজ্জেদের কাছারি বাড়িতে গাঁয়ের ছেলেদের নিজের হাতে গড়া পাবলিক লাইব্রেরি। অনেকরকম বই ওখানে পাবে। গণেশ দেউস্করের দেশের কথা থেকে পাঁচকড়ি দে-র নীলবসনা সুন্দরী পর্যন্ত। পড়তে পড়তে সবুজ সঙ্ঘের মুখপত্র হাতে-লেখা মাসিক পত্রিকা ‘তরু’-র কয়েকটি পুরোনো সংখ্যাও হয়তো পেয়ে যাবে। তাতে কত সম্ভব অসম্ভব ধরনের লেখার সন্ধান পাবে তা তুমি কল্পনাও করতে পারো না। দেশ-উদ্ধারের এক বিষম জ্বালাময়ী পরিকল্পনার যে আভাস ওতে প্রকাশিত হয়েছিল তার সন্ধানে একদিন পরমপরাক্রমশালী ব্রিটিশ শক্তির পর্যন্ত টনক নড়ে উঠেছিল। হাসবার কথা নয়। সত্যি, ওই পাঠাগারে অনেকবার পুলিশ সার্চ করেছে। কিন্তু সার্চের দিন আজ গত হয়েছে। ওই পাঠাগারের পাশের রাস্তা দিয়ে এখন ‘মার্চ’ করে চলেছে নতুন কালের পুলিশ। জানি না সে মার্চ কোনো ফার্স’ হয়ে দাঁড়াবে কি না। সেখানকার একালের অধিবাসীরা আজ গৃহহারা বাস্তুত্যাগী। তাদের হাতে ভিক্ষার ঝুলি।
