এই আড়িয়ালখাঁর তীরে আমার গ্রাম–কুলপদ্দি। দেশের কুলপঞ্জিতে এর জন্মতারিখের সন্ধান পাওয়া যায়নি, তাই নামকরণের ইতিহাসটিও জানানো গেল না; তবে গাঁয়ের বহুপুরোনো স্মৃতি পুরোনো বন্ধুর মতোই মনের পর্দায় জড়িয়ে জড়িয়ে রয়েছে।
প্রকান্ড গ্রাম। প্রায় পাঁচ হাজার অধিবাসীর সুখ-দুঃখের কাহিনি দিয়ে এর ইতিহাস গড়া আর ভৌগোলিক সীমারেখার সঠিক পরিচয় পাওয়া যায় মাদারিপুর মিউনিসিপ্যালিটির বাঁধানো খাতায়। পৌর-প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীভূত গ্রাম। তাই আশপাশের গ্রামগুলোর কাছে সে ভোজসভায় নৈকষ্যকুলীনের মতো, দেবসভায় ইন্দ্রতুল্য। যদিও বিদ্যাসাগরের মতো কেউ জন্মাননি আমাদের গ্রামে, কোনো বাদশাহি আমলের ইমামবাড়াও নেই এর ত্রিসীমানায়, তবু সেজন্যে কোনো দুঃখ নেই আমাদের। সেখানে যা আছে তাই যথেষ্ট-শালুকভরা বিল, গাছে গাছে পোষ-না মানা পাখি, ধু-ধু করা মাঠে সোনার ফসল।
কতদিন নির্জন মাঠে শুয়ে শুয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেছি। মনে হত এই গাঁয়ের একজন বলেই হয়তো চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ত আমার ঘরে! শরতের বাতাস উতলা হয়ে উঠত শেফালি ফুলের গন্ধে। বৈশাখের অপরাহ্বে যেখানে গাঁয়ের ছেলেরা ফুটবল খেলত আনন্দের প্রস্রবণ বইয়ে দিয়ে, বর্ষার ভরা বাদলে সেখানেই ডিঙি নিয়ে আসত ভিন গাঁয়ের লোকেরা বাজারে সওদা করতে। জ্যোৎস্না রাতে বড়ো গাঙের মাঝি জোর গলায় গান ধরত—’মরমিয়া রে, ও মরমিয়া। মোর মনের কথা কইমু আজি তোরে।’ সেই পল্লিগীতির সুরটুকু এখনও আমার মনে লেগে রয়েছে, শহরের কোলাহলে আজও তা মুছে যায়নি।
নাগমশাই ছিলেন পাঠলারার শিক্ষক। ছোটোখাটো লোকটি বয়সে নয়, আকৃতিতে। তাঁর বেতখানির কথা মনে পড়ে। সুদীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে স্ত্রী সুনন্দা এবং ওই বেত্রদন্ডখানা তাঁর সুখ-দুঃখের সঙ্গী। ওই বেতখানা দেখিয়ে দেখিয়ে সেদিন তিনি ছাত্র পড়াতেন। আজ সে-স্কুল ভেঙে গিয়েছে, ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে যেন দাঁড়িয়ে পড়েছে নাগমশায়ের গতানুগতিকতা।
কেশবদাকে ভুলিনি। কী দুর্দান্ত প্রতাপ ছিল তাঁর যুবামহলে! গাঁয়ের এমন একটি ছেলেও ছিল না যে কেশবদার কথার অবাধ্য হতে সাহস পেত। সময়টা ছিল অগ্নিযুগ। আমি স্কুলে পড়ি। একদিন দুপুর বেলা স্কুল হতে ফিরছি, হঠাৎ কেশবদার সঙ্গে দেখা,–এই শোন তো। একেবারে attention-এ দাঁড়িয়ে পড়লাম।
কেশবদাকে ভালো লাগত। আদর্শ যাঁর উজ্জ্বল তাঁকে ভক্তি করা স্বাভাবিক। তাঁর ডাকে একবার নিঃশব্দে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি চাপা গলায় বলেছিলেন,’বন্দুক ছুঁড়তে জানিস?’
একটু অবাক হয়েছিলাম, মনে মনে ভেবেছিলাম–দু-দুটো বন্দুক আমাদের বাড়িতে, আর বন্দুক ছুঁড়তে জানি না? কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের বন্দুক দুটি ছিল অহিংস, আমাদের মতোই বৈষ্ণব। তা ছাড়া কেশবদার নিকট মিথ্যে বলাটাও ঠিক হবে না। বললাম,–না কেশবদা। এখনও শিখিনি।
আয় শিখিয়ে দেব।
একটু ভয় হল, তবু কেশবদার পেছন পেছন জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে বসলাম।
এটাকে কী বলে জানিস? ছোট্ট একটা চকচকে বন্দুক বার করলেন কেশবদা। এবার রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম। শঙ্কিত নয়নে চারদিকে তাকাতেই হেসে বলেন কেশবদা, ‘ভয় নেই, তুই দেখ না ভালো করে।
কেশবদা পিস্তলটা গুঁজে দিলেন আমার হাতে।
কয়েকটা দিনমাত্র কেশবদার শিষ্যত্ব করেছি। তারপর একদিন সকালবেলা শুনি, কেশবদার বাড়ি ঘেরাও করে তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে ইংরেজ সরকার–দেশপ্রেমের অপরাধে।
আজও সেই কেশবদাকে দেখছি। বার্ধক্য এসেছে, তাঁর দেহে নয় শুধু, মনেও। ছোটোদের কয়েকটা ইজের আর প্যান্ট নিয়ে মানিকতলার মোড়ে দাঁড়িয়ে ফেরি করছেন। নিঃসম্বল দেশকর্মী সংসারের ঘানি টানবার আর কোনো উপায়ই খুঁজে পাননি। এমনি কত ব্যর্থতার ইতিহাস জমে আছে সংসারের স্তরে স্তরে। জীবনের মাশুল দিয়ে কত জনেই তো পেল শুধু লাঞ্ছনা আর অপমান কে তার হিসাব রাখে? তবু আজ গাঁয়ের পরিচয়ে কেশবদার পরিচয় না দিয়ে পারলাম না।
শুধু কেশবদার দেশপ্রেম নয়, কত ইন্দ্রনাথের মাছ চুরির কাহিনি বাতাসে বাতাসে ঘুরে বেড়ায় আমার গাঁয়ে, কত কবির কল্পনা অনাদৃত অবস্থায় ছড়িয়ে আছে এর ঘাটে-পথে, কিন্তু বাইরের জগতের সঙ্গে কে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দেবে?
ভোরবেলা আমার ঘুম ভাঙত বৈতালিকের গীতে। রাত্রিশেষে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভৈরবীর সুর ছড়াত আমাদের হরেকৃষ্ণ বৈরাগী। তার গানের বিষয়বস্তু ছিল–রজনি প্রভাত হয়ে এল, পাখিরা শিস দিতে আরম্ভ করেছে, একটু পরেই পুবের আকাশ লাল হয়ে উঠবে, হে রাধাকান্ত! রাধিকার হৃদয়বল্লভ! আর কত ঘুমোবে, এবার তুমি জাগো। হরেকৃষ্ণ আর কার ঘুম ভাঙায় জানি না। রাধিকার হৃদয়বল্লভ তো সর্বত্রই আছেন, কিন্তু হরেকৃষ্ণের সুর আজ আর সেখানে ঝংকৃত হয় না কেন?
ষোলোখানা পুজো হত আমাদের গ্রামে। সে এক রাজসিক ব্যাপার! প্রায় শ-খানেক ঢাকের বাজনায় সমস্ত গ্রামটি সারারাত্রি সজাগ হয়ে থাকত। নবমীর রাত্রিতে শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যেত অফুরন্ত আনন্দে। কুঞ্জদা হয়তো হঠাৎ বিচিত্রভঙ্গিতে একটু ‘লোকনৃত্যম’ দেখিয়ে দিতেন তাঁর পূজ্যপাদ খুডোমশায়কে, অনন্ত হয়তো রাত এগারোটায়ই এঁদো পুকুরটায় গা ডুবিয়ে জোর গলায় সূর্যস্তব শুরু করে দিত। অবশ্য এসব তাদের ইচ্ছাকৃত অপরাধ নয়, পরোক্ষে কোনো একটি তীব্র রসসুধা গ্রহণের প্রত্যক্ষ ফল।
