মনে পড়ে বাড়ির বাঁধানো পুকুরঘাটে, বাগানের মধ্যে কত আশাময় ভবিষ্যৎ সুখস্বপ্নের কথা হয়েছে। পুজোর একসপ্তাহ আগে থেকে রাতের পর রাত জেগে হয়েছে গান শোনা এবং গাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা। নবমীর মোষ বলি দেখে কত ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ে ভয় পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কোলে চোখ বুজে রয়েছে। পশুরক্ত দেখে মুসলমানকে আতঙ্কিত হতে দেখেছি সেদিন। কিন্তু আজ কাদের প্ররোচনায় মানুষের রক্তও মানুষের মনে বিতৃষ্ণা আনতে পারছে না? অসভ্য পার্বত্য জাতির মধ্যে আজও নরবলি হয়ে থাকে শুনি। কিন্তু বাংলা তথা ভারতবর্ষের বুকের ওপর দিয়ে ওই যে নরমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান হয়ে গেল, তা যেন সেইসব বর্বর জাতিকেও লজ্জা দেয়।
আমাদের স্কুলটি ছিল বড়ো চমৎকার। সামনে খোলা মাঠ, পেছনে শ্রেণিবদ্ধ আমবাগান। মাঝখানে বাঁধানো পুকুর। ছবির মত পরিবেশ। আমাদের মাস্টারমশায় সুরেশবাবু ছিলেন সেই স্কুলের প্রাণ। পড়াশোনায়, খেলাধুলায় তিনি অনুপস্থিত থাকলে পন্ড হয়ে যেত সব কিছুই। আজ বহু কর্মীপুরুষের সান্নিধ্যে এসেও তাঁর কর্মনিষ্ঠার মনোমুগ্ধকর ছবি বড়ো হয়ে চোখের সামনে ভাসছে দিনরাত। তাঁরই উৎসাহে আমাদের “Rashi’s Eleven Football Club”-এর জন্ম হয়েছিল! ফুটবল খেলার জন্যে আমরা তখন পাগল,–ফুটবলের জন্যে রাজ্যপাট বিলিয়ে দিতেও তখন আমরা পেছপা নই! রাম, মালি, লক্ষ্মণ, বিশু, ব্ৰজা, নৃপেন আর সুরেশবাবুকে নিয়ে আমরা পনেরো-বিশ মাইল পথ পাড়ি জমাতাম ম্যাচ খেলার জন্যে। কোনো বাধাই আমাদের আটকে রাখতে পারত না।
ডাক্তারখানার পুকুরঘাটে ছিল আমাদের আড্ডাখানা। বিকেল হতে-না-হতেই এসে জমায়েত হতাম সেখানে। জার্মানির ফ্যাসিবাদ নিয়ে, চার্চিলের ইম্পিরিয়ালিজম নিয়ে, আমেরিকার অ্যাটম বম নিয়ে, আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্য নিয়ে আমাদের তর্কের শেষ থাকত না। এ আড্ডায় হিন্দু-মুসলমানের অবাধ গতায়াত ছিল। শান্তির সপক্ষে উভয় সম্প্রদায়ই ছিল সমান উৎসুক। কিন্তু শান্তির জন্যে যেসব যুক্তিজালের অবতারণা হত সেদিন, আজ আঘাত পেয়ে বুঝেছি তা ছিল ভুয়ো! মুখে শান্তির বুলি আউড়ে মনে সংগ্রামের বিষ জিইয়ে রেখে মানুষ আর যাই করুক দেশের দশের মঙ্গল সাধন করতে পারবে না কোনোদিন। মানবতাবোধের অপমান সমগ্র মানবজাতিকেই হাড়ে হাড়ে পঙ্গু করে দেবে একদিন।
চৌদ্দরশির বাজার আমাদের তল্লাটের নামকরা বাজার। মঙ্গলবার ও শনিবারে হাট বসার জন্যে বহুদূর গ্রামাঞ্চল থেকেও লোক আসত বেচাকেনার জন্যে। ধান, চাল, পাট, দুধ, মাছ, তরিতরকারির রাশি রাশি অস্পষ্ট ছবি আজ মনে পড়লে স্বপ্ন বলে ভুল হয়। অল্প মূল্যে বেশি জিনিস এখানে কোথায় পাওয়া যাবে বলুন? ‘দুধ বা মাছ’ কোনোদিন আমাদের গ্রামে সের হিসেবে বিক্রি হয়নি। খুব মাগগি বাজারেও চার আনায় আড়াই সের খাঁটি দুধের হাঁড়ি কিনেছি। তরিতরকারি তো নামমাত্র মূল্য।
বুধাই শীলকে মনে পড়ে। ‘বুদ্ধিদা’ বলে আমরা ডাকতাম তাঁকে। সংগীতবিদ্যায় তাঁর কৃতিত্ব স্মরণযোগ্য। তবলা, হারমোনিয়াম, সেতার যন্ত্রে তাঁর হাত ছিল অসাধারণ। তাঁর আঙুলের স্পর্শ পেয়ে বাদ্যযন্ত্রগুলো যেন কথা বলে উঠেছে। আমরা ছিলাম তাঁর বাজনার নিয়মিত শ্রোতা। বাবুদের বাড়িতে গানবাজনার আসর বসলেই বুদ্ধিদার ডাক পড়ত সকলের আগে। ওঁদের বাড়িতে শিক্ষকতা করে তাঁর সংসার নির্বাহ হত। আজ বুদ্ধিদা কোথায়? সংহারের উন্মত্ত পরিবেশের মধ্যে সংগীতের সৃজনী প্রতিভা কোনো নিরাপদ দূরত্বে তাঁকে নিয়ে যেতে পেরেছে কি না জানি না! দূরে গিয়েও তিনি বেঁচে আছেন কি না তাই বা কে বলে দেবে? ডাক্তারখানার পুকুরে আজ আর লোকসমাগম হয় না শুনেছি। স্কুলের মাঠের আর সে পরিবেশ নেই, সুরেশবাবুও অন্য কোথাও পলাতক, পূজাবকাশে জনতার ভিড় নেই, জমিদারবাড়িতেও পুজো বন্ধ। সব আনন্দ কে যেন একসঙ্গে অপহরণ করে নিয়ে এক অভিশপ্তভূমিতে রূপান্তরিত করে দিয়েছে সমস্ত দেশটিকে। আমরা আজ আপন ঘরেই তাই পরবাসী।
.
খাসকান্দি
অনেকদিন আগেকার কথা।
চাকরি উপলক্ষে কিছুদিন ছিলাম অসমের, এক মহকুমা-শহরে। আত্মীয়স্বজনবিহীন প্রবাসজীবনে তখন আসন্ন ছুটির মধুর আমেজ। সকালে সবে ঘুম থেকে উঠেছি। এমনসময় দেখা দিলেন এক নব-পরিচিত বন্ধু। তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুতে উঠলাম। দেয়ালে পেরেক ঠুকে সাজানো ছিল একগাদা টুকরো কাগজ। তাতে টুথ-পাউডার ঢেলে নেওয়া রোজকার অভ্যেস। সেদিনও ছিঁড়ে নিলাম একটুকরো কাগজ। আপন মনেই বললাম : আর একুশ দিন।
বন্ধু শুধালেন : কীসের একুশ দিন?
হেসে বললাম : ছুটির বাকি।
পেরেক ঠোকা কাগজগুলোর দিকে চেয়ে বন্ধু শুধোলেন : তাই কি ওতে লিখে রেখেছেন একুশ?
আজ্ঞে হ্যাঁ। শুধু একুশ নয়, পর পর লেখা আছে এক পর্যন্ত।
বন্ধু বিস্মিত হলেন : কেন বলুন তো?
কারণ একটা দিন যায় আর ভেবে আনন্দ পাই যে, ছুটিটা আরও একটা দিন এগিয়ে এল। ওঃ, ছুটিতে বাড়ি যাবার জন্যে আপনি তো একেবারে পাগল দেখছি!
সবিনয়ে জবাব দিলাম : শুধু বাড়ি যাবার জন্যে নয়, পাগল হয়ে আছি গাঁয়ে যাবার জন্যে ।
বলেন কী, এই বয়সেও গাঁয়ের জন্যে আপনার এত মমতা? গাঁয়ের মাটির জন্যে এত তীব্র আকর্ষণ।
নিশ্চয়ই! তাই তো কবি দেবেন সেন বলেছেন,
