ফরিদপুর শহর থেকে চৌদ্দরশির দূরত্ব মাত্র পনেরো মাইল। বর্ষাকালে টেপাখোলা হয়ে নৌকোয় যেতে হয়, অন্য সময় মোটরে। ফরিদপুর জেলার সকলেই আমাদের গ্রামের নাম জানেন। জিজ্ঞাসা করলে সকলেই রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারেন, যদিও মূল চৌদ্দরশি বলে কোনো নির্দিষ্ট গ্রামই নেই। পূর্বে স্থানটির বুকের ওপর দিয়ে বয়ে যেত কীর্তিনাশা পদ্মানদী। অকস্মাৎ তার গতিপথ বিপরীতগামী হওয়ায় তার বুকে প্রকান্ড চর জেগে ওঠে। যেখানে যখন চর জাগত জমিদারের লোক এসে মাপামাপি করত রশির ক্রমিক সংখ্যায়। এই চরগুলোই গ্রামের ভূমিকা। গ্রাম গড়ে ওঠে কীর্তিনাশার আনুকূল্যে, কিন্তু গ্রামের নাম থেকে যায় রশিমাপের সংখ্যাতত্ত্বের ওপরেই। এমনিভাবে পত্তন হয়েছে বাইশরশি, সাতরশি, নয়রশি ইত্যাদি নানা গ্রামের, আর এইসব গ্রামের সমষ্টিই শেষ পর্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করেছে চৌদ্দরশি ডাকনামে।
চৌদ্দরশি গ্রামের সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ছে গ্রামের জমিদারবাবুদের কথা। ‘জমিদার’ নামটির মধ্যে যে ভয়াবহতার চিহ্ন থাকে তা এঁদের মধ্যে ছিল না। এ জমিদারেরা অমায়িক। ফরিদপুর, বরিশাল, পাবনা জেলায় এঁদের বিরাট জমিদারি–এমন প্রতিপত্তিশীল জমিদার পূর্ববঙ্গে খুব কমই ছিল। তিন শরিকের জমিদারি, তিন ভাইয়ের তিন হিস্যে। তিনজনের বাড়ি, মন্দির, বাগান, দিঘি নিয়ে যেন তিনটি শহর। আমলা-কর্মচারী, পাইক-পেয়াদা, সেপাই, মোসায়েবের দল গিসগিস করত। বাবুরা পায়ে হেঁটে কোথাও বেরুতেন না, তাঁদের প্রত্যেকের ছিল সুসজ্জিত পালকি। পালকি-বেহারাদের হেঁইও হোহেঁইও হো-র একটানা শব্দ শুনেই বোঝা যেত কোন জমিদারবাবু আসছেন। পালকির সামনে পেছনে চলত বন্দুকধারী সেপাই। মনে পড়ছে বাবুদের দেখবার জন্যে গ্রামের ছেলে-বুড়ো এসে জুটত রাস্তার দু-পাশে। সে জনতায় হিন্দু-মুসলমান পৃথক হয়ে থাকত না,-গা ঘেঁষাঘেষি করে সবাই উঁকি দিত পালকির দরজায়। দেড়মাইল দূরে গ্রাম্যনদী ভুবনেশ্বরী। নদী চলার পথে জমা থাকত বাবুদের বড়ো বড়ো বজরা। আয়তনে ছিল মোটরলঞ্চের চেয়েও বড়। ত্রিশ চল্লিশ জন মাঝিমাল্লা ছাড়া এ বজরা চালানো সম্ভবপর হত না। মাঝিমাল্লারা ছিল প্রায় সকলেই মুসলমান। হিন্দু-জমিদারের সুখ-সুবিধের জন্যে তারা একদিন প্রাণ পর্যন্ত তুচ্ছ করতে পারত। গ্রাহ্যই করত না হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদের জিগিরকে। বাবুদের পেয়াদাও ছিল সকলেই মুসলমান তাদের লাঠি সড়কির ওপরেই নির্ভর করত বাবুদের মানসম্ভ্রম, প্রতিপত্তি, সেখানে কোনোদিন তো ভেদাভেদ দেখিনি। এক হিন্দু জমিদারের মুসলমান লাঠিয়ালরা বাবুর সম্মান রক্ষার জন্যে অন্য জমিদারের মুসলমান লাঠিয়ালের মাথা চূর্ণ করে এসেছে দ্বিধাহীন চিত্তে! ঠিক এর উলটোটাও হয়েছে। তখন মানুষ ছিল বড়ো। ধর্মের বিকৃতরূপ মানুষের মাথা খারাপ করতে পারেনি। মুসলমান পরিবারের সাহায্যার্থে কত হিন্দুকে নিঃস্বার্থভাবে দান করতে দেখেছি। বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে গোরুর গাড়ি বোঝাই করে টাকা পয়সা আসার গল্প শুনেছি। জমিদাররা ছিলেন এমনি ধনী। জাতিধর্ম নির্বিশেষে বহাল করতেন কর্মচারী। তাঁদের কাছে ধর্ম বড়ো ছিল না, বড়ো ছিল কর্মঠ লোকের অকৃত্রিম পরিশ্রম। মুসলমানরাও বুঝত সে কথা, তাই তাদের কাজে কোথাও ফাঁকি থাকত না। বড়ো হিস্যের রায়বাহাদুর মহেন্দ্রনারায়ণ, মেজো হিস্যের রমেশচন্দ্র ও ছোটো হিস্যের দক্ষিণারঞ্জন ছিলেন প্রসিদ্ধ। তাঁদের জমিদারি তদারকের জন্যে থাকত তিনজন অবসরপ্রাপ্ত জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট।
হিন্দু হলেও তিন শরিকের মধ্যে কখনো কখনো বিবাদ বাধত, কিন্তু সে কলহের ফল সাধারণত হত শুভই। জনসাধারণ তাঁদের কলহমন্থন করে লাভ করত অমৃত। বড়োবাবু নিজের সুনামবৃদ্ধির জন্যে যেই দুটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন, মেজোবাবু তার পালটা জবাব দিলেন ফরিদপুরে রাজেন্দ্র কলেজ বসিয়ে। ছোটোবাবু চুপ করে থাকতে পারেন না। ফরিদপুরে উদবোধন করলেন সিনেমা হাউসের। এমনিভাবে সুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে জনগণ পেল হাই স্কুল, হাসপাতাল, কলেজ ইত্যাদি। এগুলো থেকে সুযোগ-সুবিধে পেত গ্রামবাসীরাই। হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টানের গন্ডি টেনে কোনোদিন এসব প্রতিষ্ঠানকে খাটো করা হয়নি। আজ আর সেদিন নেই।
গ্রামে দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বড়ো আনন্দোৎসবের ব্যবস্থা হত। সবচেয়ে ধুম হত জমিদারবাড়িতে। গ্রামবাসীরা যে যেখানেই থাক, এসে জমায়েত হত এই সময়টিতে। কয়েকদিনের জন্যে গ্রামের বুকে অপূর্ব হিল্লোল জাগত যেন। পুজোর তোড়জোড় চলত একমাস আগে থেকে। এই উপলক্ষ্যে ময়দান ভরে যেত রকমারি দোকানপাতিতে, কার্নিভাল ও সার্কাসে। আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে ভরে যেত দেশ। এই আনন্দের পূর্ণাহুতি হত তখন যখন কলকাতা থেকে আসত নামকরা যাত্রার দল। আজ আর যাত্রাগানের আদর নেই তার এই উৎসভূমি কলকাতায়। কিন্তু মনে পড়ে দেশে আমরা যাত্রা শোনবার জন্যে কত রাত্রি পর্যন্ত উৎসুক হয়ে কাটিয়েছি। কত রাত্রি অনিদ্রায় কেটে গেছে কোন দল আসছে তারই জল্পনা-কল্পনায়! কোন দলের কোন অভিনেতা অন্যদলের চেয়ে ভালো তা নিয়ে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে গেছে ভেবে আজ এত দুঃখের মধ্যেও হাসি আসে! যাত্রাগান শোনার জন্যে শ্রোতারা আসত দূরান্তরের গ্রাম থেকে। বিদেশ থেকে আসত আত্মীয় পরিজনবর্গ। অপূর্ব আনন্দ কোলাহলে দিনগুলো কোথা দিয়ে যে চলে যেত বোঝাই যেত না। টনক নড়ত গ্রাম ছাড়বার সময়। সাময়িকভাবে গ্রাম ছাড়তেও যাদের চোখে জল আসত সেদিন, আজ তারা চিরতরে কী করে গ্রাম ছেড়ে দিন কাটাচ্ছে?
