বিদ্যালয়টির পাশেই ছিল একটি সাধারণ গ্রন্থাগার। গাঁয়ের উৎসাহী তরুণ কর্মীরা এই গ্রন্থাগারটি গড়ে তুলেছিল।
স্বদেশি যুগে যেদিন বাংলার একপ্রান্ত থেকে আর-একপ্রান্ত অবধি বেজে উঠেছিল পরাধীনতার শিকল-ভাঙার ঝনঝনানি সেদিনও আমার এই ছেড়ে আসা গ্রামখানি সিংহের মতো অধীর হয়ে উঠেছিল শিকল ভাঙার উন্মাদনায়। বাবার কাছে শুনেছি কত নিস্তব্ধ অমারাত্রির অন্ধকারে খালিয়ার মুক্তিপাগল দুর্বিনীত তরুণদল তাদের স্বাধীনতার সাধনায় মগ্ন ছিল লোকচক্ষুর অগোচরে ঝোঁপ-জঙ্গল ঘেরা কালীমন্দিরের আঙিনায়! সেখানে চলত বিপ্লবীদের লাঠিখেলা, ছোরাখেলা, বন্দুক চালনা, বোমা তৈরি, আর চলত গভীর মন্ত্রণা কী করে বেনিয়া দস্যু শ্বেতাঙ্গদের হটিয়ে দেওয়া যায় সাগরপারে। সারাভারতের বিপ্লবী বীর বালেশ্বর সংগ্রামের প্রথম শহিদ কিশোর চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরির সংগ্রামী জীবনের প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল এই খালিয়া গ্রামের ঝোপে-জঙ্গলে। যে স্বাধীনচেতা রাজারাম প্রাণের নিবিড় মমতায় গড়ে তুলেছিলেন এই খালিয়া গ্রাম-দেহের প্রতি রক্তবিন্দু দিয়ে রক্ষা করেছিলেন তার স্বাধীনতা, বহুযুগান্তে তারই এক বংশধর তরুণ বিপ্লবী চিত্তপ্রিয় সারাভারতের মুক্তির জন্যে বালেশ্বরের যজ্ঞভূমিতে নিজের অস্থিমজ্জা রক্তমাংস আহুতি দিয়ে পিতৃঋণ শোধ করে গেছে। জবাব দিয়েছে খালিয়া গ্রামের মুখপত্র সারাবাংলার হয়ে–সারাভারতের পক্ষ থেকে উদ্ধত শ্বেতাঙ্গ শাসনের ও শোষণের প্রতিবাদে। সেই শহিদ-তীর্থ খালিয়া গ্রামের মানুষ আজ ভারত শাসকদের কাছে উদবাস্তু মাত্র–আর কিছু নয়। কী মর্মান্তিক পরিহাস!
আজ আমার-ছেড়ে আসা গ্রামের কথা লিখতে বসে একটি দিনের কথা কেবলই মনে পড়ে। গ্রামে তখন শারদোৎসবের ধুমধাম। বহুদূরদেশ থেকে প্রবাসীরা সব গাঁয়ে ফিরে এসেছে মাটির মায়ের টানে। আমাদের গাঁয়ে প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই দুর্গোৎসব হয়ে থাকে। তাই পুজোর কটাদিন গাঁয়ের কারুরই থাকা-খাওয়ার কোনো বিধিনিয়ম থাকে না। সব বাড়িতেই সকলের নিমন্ত্রণ। ফেরার দিন সকাল থেকেই সব জিনিসপত্র বাঁধাছাদা শুরু হয়ে যায়। বিকেলেই বাড়ি থেকে যাত্রা করতে হবে। দিনটা দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে গড়িয়ে গেল। বিকেল বেলায় দেখি রাজুদা বাইরের দাওয়ায় বসে গুড়ক গুড়ুক করে তামাক খাচ্ছে। মাথায় একটা লাল গামছা পাগড়ির মতো করে বাঁধা। রাজুদা আমাদের নৌকোর মাঝি। জাতে নমঃশূদ্র। আমাকে দেখেই রাজুদা বলে উঠল,–‘কি ছোটো-কর্তা, দেরি করতে আছ ক্যান। হ্যাঁসে তো ইস্টিমার পাব না য়্যানে। হকাল হকাল বাইরাইয়া পড়ো।’ বাড়ির দিঘির ঘাট থেকে যখন আমাদের নৌকা ছাড়ল তখন দিনের সূর্য ক্লান্ত হয়ে সন্ধের কোলে চলে পড়েছে। নৌকা যখন খালের প্রান্তে সাধুর বটতলার পাশ দিয়ে কুমার নদীতে পড়ল তখন গোধূলির স্বর্ণরেণু ছড়িয়ে পড়েছে আমার ছেড়ে আসা গ্রামখানির ওপরে। আমার ভাইবোনেরা নৌকার ছইয়ের ওপর বসে দেখছে সেই অপরূপ বিলীয়মান ছবি। গাঁয়ের সীমানা ছেড়ে যতই দূরে চলে আসছিলাম ততই আমার মন ব্যথাতুর হয়ে উঠেছিল কী এক অনির্দেশ্য বেদনায়। চোখ দুটো হয়ে উঠছিল অশ্রুছলছল। কী যেন নেই! কী যেন হারিয়েছি, কাকে যেন চাই, কাকে যেন আর পাব না– এমনি এক অসহায় মর্মরাঙা বেদনা আমার বুকের মধ্যে গুমরে উঠছিল। সেই অব্যক্ত বেদনার মূল আমি নিজেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শুধু অজ্ঞাতে অস্ফুটে কখন বলে চলেছিলাম,
মাতৃভূমি স্বর্গ নহে সে যে মাতৃভূমি,
তাই তার চক্ষে বহে অশ্রুজলধারা
যদি দু-দিনের পরে
কেহ তারে ছেড়ে যায় দু-দন্ডের তরে।
গ্রাম ছেড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ছে পল্লিকবির রচিত একটি গান। লক্ষ্মণের শক্তিশেলে শ্রীরামচন্দ্র খেদোক্তি করে বলছেন,
সুমিত্রা মা বলবে যখন,
রাম এলি তুই কই রে লক্ষ্মণ–
(আমি) কোন প্রাণ ধরে বলব তখন :
মাগো, তোমার লক্ষ্মণ বেঁচে নাই।
দেশজোড়া লক্ষ্মণের দল আজ শক্তিশেলে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। কবে তাদের সবার মূৰ্ছা ভাঙবে সে আশায় দিন গুনছি।
.
চৌদ্দরশি
রবীন্দ্রনাথ মানুষের মধ্যে বাঁচতে চেয়েছিলেন এবং মানুষের মধ্যে বাঁচবার জন্যে প্রেরণার বাণীও দিয়ে গেছেন আমাদের। কিন্তু আমরা মানুষের কাছ থেকে নির্বাসিত হলাম, তাদের মধ্যে ঠাই তো পেলাম না! যেখানে আজীবন কাটালাম সেখানে আমাদের আর কোনো স্থান নেই আজ। কীর্তিনাশ ও যেখানে তার স্বভাবগুণে আমাদের বসবাসের জন্যে ‘চৌদ্দরশি’ জায়গাটি সৃষ্টি করল, সেখানে হিংস্র মানুষ আমাদের থাকতে না দিয়ে তার কুটিল অনুদার মনোভাবেরই পরিচয় দিয়েছে। কালবৈশাখীর হঠাৎ ঝড়ের তান্ডবে শীতের ঝরাপাতার মতো উড়ে গেলাম নিজের দেশ থেকে। এ ঝড় কোথা থেকে এল? কার অদৃশ্য কারসাজিতে আমাদের বাস্তুভিটে ছেড়ে আসতে হয়েছে? সমস্ত কিছু থাকা সত্ত্বেও কেন আজ আমরা ‘উদবাস্তু’ নামে চিহ্নিত হচ্ছি? একেই হয়তো অদৃষ্টের পরিহাস বলে! অঘটনপটন পাটোয়ারের দল যে তান্ডব সৃষ্টি করেছে তার ‘বলি’ আমরাই হলাম ভেবে মাঝে মাঝে চোখ জলে ঝাপসা হয়ে আসে।
আমাদের গ্রামের নাম চৌদ্দরশি। গ্রাম ছেড়ে এসেছি বটে, কিন্তু তার স্মৃতি ভুলতে পারছি কই? যেখানকার বাতাসে আমার সুখ-দুঃখ হাসি-কান্না মিশে রয়েছে তাকে এক কথায় মনের মণিকোঠা থেকে ঝেড়ে ফেলি কেমন করে? দৈহিক অপসরণ সম্ভব হলেও কল্পনার অশ্বমেধ ঘোড়াকে আটকাব কোন জাদু মন্ত্রে? এখনও অসতর্ক মুহূর্তে গ্রামের নদীর ধারের, বাবুদের ডাক্তারখানার, স্কুলের মাঠের, বাগানবাড়ির স্মৃতি রোমন্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। চৌদ্দরশি কি আজও প্রাণমাতানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সকলকে আকর্ষণ করছে?
