কালক্রমে রাজারামের জমিদারি ও প্রতাপ এত দূর বিস্তৃত হয়েছিল যে, তদানীন্তন মোগল সম্রাট রাজারামকে রায় চতুর্ধারী উপাধিতে অলংকৃত করেন। ‘চতুর্ধারী’ শব্দের শব্দগত অর্থ হল যিনি চারিটি সেনাবাহিনীর অধিনায়ক। এই চতুর্ধারী শব্দই ক্রমে লোকমুখে রূপান্তরিত হয় চৌধুরিতে। কথিত আছে একবার বারোভূঁইয়াদের অন্যতম প্রধান সীতারাম রায় রাজারাম রায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু দোর্দন্ড প্রতাপ রাজারাম তাঁর অজেয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় সীতারামকে পরাভূত করেন। এই অজেয় সেনাবাহিনীর অধিকাংশই ছিল নমঃশূদ্র প্রজাবৃন্দ। এরা একদিকে যেমন দুঃসাহসী ও দুর্দম, তেমনি সরল ও নম্র এদের প্রকৃতি। এরা প্রধানত জমির চাষ-আবাদ ও কুটির শিল্পের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করত। অনেকে করত মাঝি-মজুরের কাজ। আবার এরাই ছিল তখনকার দিনে প্রতাপশালী ভূস্বামীদের মজুত জঙ্গিবাহিনী।
কালের আবর্তনে সেই রাজারামের আমল অতীত হয়ে গিয়েছে কবে। তবু অলিখিত ইতিবৃত্ত ভাস্বর আখরে লেখা রয়েছে গাঁয়ের অন্তরের মণিকোঠায়। ছেলেবেলায় আমরা ঠাকুমা-দিদিমার মুখে রাজারাম রায়, জয়চন্দ্র রায়, তাঁদের পার্শ্বচর ভোলা বাগদি, রহিম শেখের রোমাঞ্চকর জীবন-কথা শুনে ভেবেছি–সত্যি কি তেমনি কাল কোনোদিন ছিল, না এ সবই কাল্পনিক রূপকথার কোনো অবাস্তব কাহিনি।
আড়াইশো বছরের ব্রিটিশ শাসন তার দুষ্টক্ষতের চিহ্ন যদিও রেখে গেছে পূর্ববাংলার প্রতিপল্লিতে, তবু সে আমলেও গ্রামগুলো যে কিছুটা উন্নত ও আধুনিক হয়েছিল সে-কথা অস্বীকার করব না। আমাদের খালিয়া গ্রামও কয়েকটি বিষয়ে আধুনিককালের সঙ্গে তাল রেখে চলেছিল। আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকে খালপাড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটি ডাক ও টেলিগ্রাফ অফিস। আধুনিক সভ্যতার এক অমূল্য অবদান এই ডাক ও তার বিভাগ। সাতসমুদ্র তেরো নদী পারের আপন মানুষের নিরালা মনের কথা তারা এনে পৌঁছে দিয়েছে গাঁয়ের মানুষের কাছে। রোজ সকালে দেখতাম আমাদের গাঁয়ের ডাক-পিয়োন জলধর তার সেই চিরপরিচিত জীর্ণ ছাতাটি মাথায় দিয়ে একটা হলদে ক্যাম্বিসের ব্যাগ কাঁধে করে যখন বাজার খোলায় এসে হাজির হত তখন চারদিক থেকে গাঁয়ের লোকেরা তাকে অস্থির করে তুলত চিঠির তাগাদায়। যে বাষ্পীয় ইঞ্জিন একদিন সারাপাশ্চাত্য জগতের অগ্রগমনে দিয়েছিল অবিস্মরণীয় গতিবেগ–যার ঢেউ-এর দোলায় টেমস নদীর উপকূল থেকে প্রশান্ত মহাসাগর অবধি চঞ্চল হয়ে উঠেছিল, তার ক্ষীণ রেশ আমাদের এই আত্মভোলা কিশোরকুমার নদীর প্রশান্ত বুকেও এসে লেগেছিল। তাই দেখে এক সময় গাঁয়ের আবালবৃদ্ধবনিতা বিস্ময়ান্বিত হত। সেই প্রথম বিস্ময়ের পর অনেক দিন অতীত হয়ে গেছে, এখন আর গাঁয়ের লোকেরা জাহাজ দেখে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে না।
কত তন্দ্রাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় আকাশে উড়োজাহাজের ঝাঁক দেখে গাঁয়ের ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েরা মায়ের কোলে জড়োসড়ো হয়ে ডাগর চোখ দুটো তুলে বলত, ‘মা! ওই বুঝি সেই পরনকথার ব্যাঙ্গমা পাখি?’ গাঁয়ের শ্ৰীকণ্ঠ মুদি বলত, ও হল পুষ্পক রথ। কতদিন দেখেছি খালিয়া বাজারের পুলের কাছে শ্ৰীকণ্ঠ মুদির সেই দোকানটা হর ঠাকুরদার বক্তৃতায় সরগরম হয়ে উঠেছে। দেখেছি, হর ঠাকুরদা মাঝে মাঝে তাঁর হাত দু-খানা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রাইচরণ, নিতাই, রসুল মিয়াদের বোঝাচ্ছে,–‘বোঝলা কিনা রসুলভাই, সেই যে মহাভারতে ল্যাখছে পুষ্পক রথের কথা। হেই পুষ্পক রথই হেন উড়োহাঁস জাহাজ অইয়া আকাশে উইড়া বেড়ায়।’ শ্ৰীকণ্ঠও ঠাকুরদার কাছ থেকেই শুনেছে পুষ্পক রথের কাহিনি। রসুল নিরক্ষর চাষি। সে মহাভারত পড়েনি। তবু ওই শ্ৰীকণ্ঠ মুদির দোকানে বসেই সে মহাভারতের গল্প শুনেছে অনেকদিন। রসুল তার দাড়ির মধ্যে হাত বুলোতে বুলোতে বিজ্ঞের মতো কইত, ‘তা কথাডা ঠাউরমশায় যা কইছ হেথা একালে মিথ্যা নয়।’
গ্রামের বাজারে প্রতিবৎসর মেলা বসত চার বার! একটি বারুণীর দিনে, একটি পয়লা বৈশাখে, আর রথের সময় দু-দিন। পয়লা বৈশাখের মেলার নাম ‘গলুয়ের মেলা’। এইদিনে আগে কবিগান হত এবং অনেক দল পাল্লা দিয়ে গান করত। একবার একজন মেয়ে কবিওয়ালি প্রতিপক্ষকে বলেছিল,
ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখোনি কুনো,
মুখপোড়া গাবুর একটা বুনোনচ্ছার তোরে করব তুলোধুনো।
বলাবাহুল্য সকলের মতে তারই জিত হল।
আমাদের গাঁয়ের পূর্বপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত ছিল একটি প্রথম শ্রেণির উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়। রাজারামের নাম অনুসারেই গাঁয়ের লোকে তার নাম দিয়েছিল রাজারাম ইনস্টিটিউট। আশপাশের দু-দশখানা গাঁয়ের ছেলেরা এই শিক্ষায়তন থেকেই প্রবেশিকা উত্তীর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশে-বিদেশে। তাদের মধ্যে অনেকে আজ সমগ্র দেশের বরেণ্য সারাদেশের গৌরব। ভারতীয় জাতীয় মহাসভার সভাপতি দেশবরেণ্য অম্বিকা মজুমদারমশায়ও একদিন এই রাজারাম ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছিলেন। বাংলার অন্যতম প্রসিদ্ধ সাধক কবি ও দার্শনিক কিরণচন্দ্র দরবেশও ছিলেন এই খালিয়া গ্রামেরই ছেলে। তিনিও ছিলেন একদিন এই রাজারাম ইনস্টিটিউটের ছাত্র। বর্ষাকালে যখন খালিয়ার পথঘাট নদীনালা একাকার হয়ে যেত তখন আমাদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণও জলে থইথই করত। ছাত্ররা তখন দূরদূরান্তর থেকে নৌকো করে এসে স্কুলে পড়াশোনা করত। যাদের নৌকো থাকত না তাদের ভোঙায় অথবা কলাগাছের ভেলায় করে স্কুলে আসতে হত। গাঁয়ের ছেলেদের মধ্যে লেখাপড়া শেখার আগ্রহ যে কত প্রবল ছিল এ থেকেই তার কিছুটা বোঝা যায়। এই বিদ্যালয়টির পেছনে ছিল অনাড়ম্বর শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অকৃত্রিম অনুরাগ। কিন্তু আজ সে বিদ্যালয়টির চারদিক ঘিরে গুমরে উঠছে শুধু এক ‘নাই নাই’ রব। নাই সেসব নীরব দেশকর্মী শিক্ষকেরা–নাই সেসব দুষ্টুমি আর খুশিতে উজ্জ্বল কিশোর ছাত্রদের কলরব।
