দলপতি জগদীশ চন্দ আর রমেশ নাহা, মূল গায়েন হরিচরণ মহানন্দ, বায়েন (খোল বাজিয়ে) বিভূতিদা, ওরফে বিভূতি পাগলা, দোহারদের মধ্যে প্রধান অনন্ত আর শিশির কাকা–কালু, ব্রজেন্দ্ৰকাকা, ছোট্টকাকা এঁরা দ্বিতীয় পঙক্তির। আর একজন আছেন চিত্তদা। তিনি ক্ষীণদৃষ্টি, সত্যি কোনোদিন কোনো গান গেয়েছেন কি না সঠিক কেউ বলতে পারে না। তাহলেও কথা এবং সুরের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মুখভঙ্গি অব্যর্থরূপে প্রমাণ করে তাঁর কীর্তনপ্রিয়তার কথা। আসলে কীর্তনপ্রিয়তাও তত বড়ো কথা নয়, যত বড়ো কথা হচ্ছে দলের লিষ্টিতে নাম রাখা! তবে চিত্তদা কিন্তু গল্পরসিক। শুধু রসিক নন, গল্পস্রষ্টা! বারোহাত কাঁকুড়ের তেরোহাত বিচি আর তিলকে তাল করার অসংখ্য গল্প মুহূর্তে বানিয়ে গানের ফাঁকে ফাঁকে আসর জমাতে তাঁর জুড়ি নেই! হরিচরণ হাতের করতালসহ হাত দুটি তুলে সভ্যগণ’ সমীপে নমস্কার জানিয়ে শুরু করে,
বাছা নিমাইরে,–বাছা নিমাই,
কোথায় গেলি রে,
দুঃখিনী মায়েরে ফেলে!
কণ্ঠ যেমন তীক্ষ্ণ, তেমনি মধুর। প্রধান দোহার অনন্তও মোটেই ‘ফ্যালনা’ নয়। ওদিকে বায়েন বিভূতি পাগলা এ তল্লাটের ওস্তাদ খোল বাজিয়ে। তাঁর খোল সত্যিই কথা কয়–আর এই খোল সহরতে তার নৃত্যের অপূর্ব ভঙ্গিমা বাইলার দলের প্রধান আকর্ষণ। উপযুক্ত সঙ্গতের মধ্যে গান সহজেই জমে ওঠে। দ্রুততালে তখন গানের অপর একটি কলি গাওয়া হচ্ছে,
নিমাই তোরে কোলে লব,
সব দুঃখ পাশরিব,
বড়ো আশা করেছিলাম মনে–
নিমাই রে!
গান শুনতে শুনতে পুত্রশোকে শোকাতুরা দক্ষিণহিস্যার মণিদি সুরের মূর্ঘনায় মূৰ্ছিতা হয়ে পড়ে! তাঁকে নিয়ে উদব্যস্ত হয়ে ওঠেন মেয়েরা। গান চলতেই থাকে। গায়েন, বায়েন, দোহার, শ্রোতা কেউ যে তখন আর এ জগতে নেই! অদ্ভুত অপূর্ব রসানুভূতি– আজও যার রোমাঞ্চ জাগে দেহে ও মনে।
সেনদের বাড়ির দোলউৎসব সুবিখ্যাত। সর্বজনীনতার মাধুর্য দিয়ে মন্ডিত এ উৎসবের প্রতিটি অঙ্গ। গ্রামের সবাই, এমনকী আশপাশের গ্রামেরও বহু ছেলে-বুড়ো বর্ষঘুরে আসতেই এ উৎসবের প্রত্যাশায় দিন গুনে চলে। পুজোর আনন্দ, আবিরের ছড়াছড়ি তো আছেই–তা ছাড়াও অষ্টপ্রহর সংকীর্তনান্তে মহোৎসবের খিচুড়ি আর লাবড়া! সেদিন সারদা পিসি এসে ধরে পড়লেন উদ্যোক্তাদের–তাঁর গুরুঠাকুর এসেছেন, মহোৎসবের পর তাঁকে দিয়ে শ্রীশ্রীগীতা পাঠ করাতে হবে। অতিউত্তম প্রস্তাব, মুহূর্তে পশ্চিম হিস্যার বাঁধানো বারান্দায় একটা বেদির মতো তৈরি করে দেওয়া হল, তার ওপরে বসলেন পন্ডিত কমলাকান্ত কাব্যতীর্থ। সুপুষ্ট বলিষ্ঠ দেহ, গৌরকান্তি, মুখাবয়বে জ্ঞান-গভীরতার ছাপ সুস্পষ্ট। মেয়েদের মঙ্গলশঙ্খধ্বনির পর তাঁর গুরুগম্ভীর কণ্ঠ থেকে ধ্যানমন্ত্র উচ্চারিত হতে থাকে,
মূকং করোতি বাঁচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম
যকৃপা তমহং বন্দে পরমানন্দ মাধবম।
তারপর বেছে বেছে কয়েকটি শ্লোক পাঠ আর বাংলায় তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন পন্ডিতমশায়। শ্রোতৃবৃন্দ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে অমৃতময়ী শ্রীভগবানবাণী-সারগর্ভ জীবনদর্শনের মধুর ব্যাখ্যান। হঠাৎ টিপরার ‘জুম’ সর্দার কৈলাস সভায় ছুটে এসে ডুকরে কেঁদে ওঠে –’আমার জোয়ান মর্দ ছেলেটি তিন দিনের জ্বরে মারা গেল!’ সভাস্থল থেকে একটা তীব্র বেদনার ধ্বনি উত্থিত হয়। বিভূতিদা, যামিনীকাকা ও আমরা জনকয়েক মিলে কৈলাসকে সান্ত্বনা দিতে দিতে নিয়ে যাই স্থানান্তরে, কেউ কেউ লেগে যায় শ্যামমোহনের সৎকারের ব্যবস্থায়।
এ অঞ্চলে অনেক টিপরার বাস। চেহারায় টিপরাদের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজাদের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে, তাই ওরা ত্রিপুরার আদিম অধিবাসী বলে দাবি করে। ফরসা রং ছাড়া কালো রং একজনেরও নেই ওদের মধ্যে, অদ্ভুত শক্ত বাঁধন দেহের, যেন লোহা পিটিয়ে গড়া হয়েছে। যতদূর জানা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষগণ এদের প্রজাস্বত্ব দিয়ে এনেছিলেন গ্রামরক্ষী ও বিশ্বাসী অনুচররূপে। এদের সকলের পদবিই ‘সিং’-কৈলাস সিং, মিষ্ট সিং, যামিনী সিং, রমণী সিং, কামিনী সিং, এমনি সব নাম। মেয়েরাও পুরুষদের মতো সমান পরিশ্রমী ও বিনয়ী। সাধারণত ওরা কয়েকটি পরিবার দল বেঁধে একজায়গায় ছোটো ছোটো কুঁড়ের মধ্যে বাস করে। এই বাস-ব্যবস্থাকেই বলা হয় ‘জুম’। প্রায় প্রত্যহই বিকেলের দিকে আমরা বেড়াতে যেতাম কোনো-না কোনো জুমে। টিপরাদের সঙ্গে আলাপে অফুরন্ত আনন্দ পেতাম। ওদের সরলতা, সৎসাহস, আতিথেয়তার কথা আজ বড়ো বেশি করে মনে পড়ে।
এগ্রামে অধিকাংশই টিনের ঘর। পাকা ঘর শুধু একটি–আমার খুল্লতাত তার মালিক। দোতলা দালান, দক্ষিণ খোলা, অবিশ্রান্ত হাওয়ার আনাগোনা, তারই লোভে সন্ধ্যার দিকে ছেলে-বুড়ো জমায়েত হয় কাকার শান-বাঁধানো বারান্দায়। আজগুবি গল্পে জমে ওঠে ভরা বৈঠক। প্রধান গল্পকার এবাড়ির অর্ধশতাব্দীর পুরাতন ভৃত্য সুধন্য। এমনি সময় যথারীতি ডাক পড়ে কবিয়াল গৌরাঙ্গের–বৃদ্ধ দীনদয়ালের বড়ো ছেলের। গৌরাঙ্গ আমাদের দু-বাড়ির কোনো-না-কোনো হিস্যার কাজে আছেই, যদিও কেবল খোরাকি দিয়েও কোনো এক হিস্যা তাকে একনাগাড়ে দীর্ঘদিন রাখতে নারাজ। গৌরাঙ্গের পৈটিক দাবিটা বড়ো মাত্রাতিরিক্ত, ওদিকে কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। তবু তার সরল নির্বুদ্ধিতার জন্যেই সবাই তাকে ভালোবাসত। তাই বেকার হতে হয়নি তাকে কোনোদিন। গৌরাঙ্গ নিজেকে কবির দলে সরকার (কবিয়াল) বলতে গর্ববোধ করে। কোন কোন বিখ্যাত কবির দলে সে শাকরেদি করেছে তার ইতিহাসও সে নির্ভুল বলে দিতে পারে। আমরা অবশ্য জানতাম, কবি অক্ষয় সরকারের দলে থেকে ফুটফরমাশ খেটেছিল ও মাসখানেক, ব্যস, ওই পর্যন্তই তার শাকরেদি!
