অমৃত হালে বিভূতি বায়েনের সাকরেদ হয়েছে। আমাদের পরামর্শমতো সে খোলে চাঁটি মারতেই গৌরাঙ্গ শুরু করে,
রামগুণাগুণ বাদ্য বাজে
গোবর্ধনের বাড়ি হে,
(আমরা দোহাররা : রামগুণাগুণ বাদ্য বাজে…)
গোবর্ধনে অম্বল খায়
হাপপুর হুপপুর হে।
মুহূর্তে দারুণ হাসির রোল পড়ে যায় ‘অম্বল’ খাওয়ার দাপটে!
আশ্বিন মাসের শেষ। দুপুরে বাড়ির বৈঠকখানার সামনে একটা বড়ো আমগাছতলায় মাদুর পেতে বসে একদিন গল্প করছিলাম আমরা জনকয়েক মিলে। এমনি সময় চন্ডীপুর (নোয়াখালি) থেকে হরেনকাকা এমন একটা সংবাদ এনে হাজির করলেন যা দুঃস্বপ্নেরও অতীত বলে বোধ হল। তিনি জানালেন, ওই অঞ্চলে দলে দলে ক্ষিপ্ত মুসলমান কয়েকটি বাড়িতে হানা দিয়ে সমস্ত ঘর অগ্নিদগ্ধ করেছে, লুণ্ঠন করেছে জিনিসপত্র, গোরুবাছুর পর্যন্ত। দুটি রোমহর্ষক হত্যাকান্ডের সংবাদও দিলেন তিনি, আর বললেন সর্বত্র এই আগুন ছড়াবার জন্যে সভাসমিতিতে প্রচারও চলছে। চব্বিশ ঘণ্টা পার হতে-না-হতেই খবর পেলাম পাশের গ্রামে অগ্নিকান্ড আর লুঠতরাজের। বেলাবেলি মেয়েদের, বুড়োদের আর শিশুদের সরিয়ে দেওয়া হল নিরাপদ স্থানে–শহরের আইন-শৃঙ্খলার মধ্যে। রাত্রিশেষে দশসহস্রাধিক মানুষের গ্রামকে শ্মশানপুরীর নিস্তব্ধতার মধ্যে নিঃশেষে শূন্য করে দিয়ে আমরা তরুণরাও জন্মভূমি, জন্মগ্রাম থেকে বিদায় নিলাম। শত শতাব্দীর ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল যে ইতিহাস, বর্বরতার হিংস্র অভিযান তাকে চুরমার করে দিল নিমেষে। ইতিহাসের এই ছিন্নসূত্র আবার কোনোদিন জোড়া লাগবে কি না কে জানে!
.
কালীকচ্ছ
গ্রাম-প্রাণ আমাদের বাংলাদেশ। অসংখ্য গ্রাম পূর্ব বাংলায়। আমরা ছেড়ে এসেছি সেসব গ্রাম। সেসব ছেড়ে-আসা গ্রামের মধ্যে কালীকচ্ছ একটি নাম–সে অন্যতমা, সে অনন্যা সে আমার গ্রাম-জননী। পূর্ববাংলার আর সব গ্রামের মতোই জল-বাতাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আমার কালীকচ্ছ মহিমাময়ী। আর সবাইয়ের মতো আমারও দেহ-মনে শিহরন জাগে বহুস্মৃতি-বিজড়িত সেই জন্মগ্রামের কথা ভাবতে। মায়ের মতো করে সেই গ্রামই যে আমায় শিখিয়েছিল সংগ্রামময় এই পৃথিবীতে সংগ্রামী হয়ে বেঁচে থাকতে। আজ তাই তার অভাব মনকে পীড়িত করে, করে তোলে বিষাদ-ভারাক্রান্ত। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে একটি বড়ো কর্মকেন্দ্র ছিল কালীকচ্ছ। মুক্তিযুদ্ধের সেই ইতিহাসে কালীকচ্ছের অবদান বড়ো কম নয়। কিন্তু ভবিষ্যৎ ভারত ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায় সংযোজনায় সাময়িকভাবে হলেও সে আজ বঞ্চিত।
আজ থেকে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগেকার কথা। সেই ছোটোবেলার কত স্মৃতিই না আজ হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে। আমাদের বাড়িকে বলা হত রামপ্রসাদের রামের পুরী। সাতমহল বাড়ি। তাতে ছিল জঙ্গলাকীর্ণ একটা পুরোনো মন্দির। শেয়াল শিকার করতে গিয়ে একদিন একটা কুকুর নিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম সেই মন্দিরে। কিন্তু শেয়াল ধরা পড়েনি সেখানে। তাহলেও সেই মন্দিরে পাওয়া গেল একটি সুরক্ষিত বাক্স। খুব খুশি মনেই সেই বাক্স নিয়ে আমি ফিরে এলাম। প্রাণের ভয়ে যে মন্দিরের ধারে কাছেও যায় না কেউ সেখানে যাওয়ার কথা বাড়িতে খুলে বলাও তো মুশকিল। ও মন্দির নাকি ছিন্নমস্তার। কোনো এক সন্ধ্যায় ওই মন্দির থেকে এক ছিন্নমস্তা মূর্তিকে বার হয়ে যেতে দেখে আমাদেরই এক প্রপিতামহী নাকি চিরতরে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। সেই থেকেই মানববর্জিত এই মন্দিরে অপদেবতার ভয়ে কেউ প্রবেশ করতে সাহস পায় না। সেই মন্দিরে বাক্সটি দেখে ভাবলাম হয়তো ওই দেবতারই ধনরত্ন রাখা আছে তাতে। সাগ্রহে বাড়ি নিয়ে এলাম। বাক্সটি খুলেই বাবা কীরকম গম্ভীর হয়ে গেলেন এবং এ নিয়ে বেশি হইচই করতে বারণ করে দিলেন।
বাক্সটিতে যা জিনিসপত্র ছিল তা নিয়ে দেখানো হল স্বগৃহে অন্তরিন প্রমথনাথ নন্দীকে। তিনি বললেন, ওগুলো তাজা কার্তুজ, গ্রামের বিপ্লবীদের সম্পত্তি। আমার বড়ো ভাই এনে ওইখানে রেখেছিলেন।
তখন প্রমথবাবু ও অন্যান্য কয়েকজন যুবকের গতিবিধির ওপর লক্ষ রাখবার জন্যে গ্রামে গুপ্তচর ঘোরাফেরা করত। পুলিশ একবার খোঁজ পেলে হাজতে যেতে হবে সকলকেই। তাই বাক্সটি ফেলে দেওয়া হল পচা-ডোবার মধ্যে।
বিপ্লব আন্দোলনে আমাদের গ্রামের যুবকরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করে এসেছে প্রথম যুগ থেকেই। শ্রীঅরবিন্দ আমাদের গ্রামে পদার্পণ করেছিলেন ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে। পল্লি-মানুষের মনে বিপ্লব-বহ্নির ছোঁয়া লাগানো ছিল উদ্দেশ্য। বিপিনচন্দ্র পালও দু-বার আমাদের গ্রামে গিয়েছিলেন–কয়েকটি সভায় বক্তৃতাও দিয়েছিলেন। আমাদের গ্রামেই জন্মেছিলেন মানিকতলা বোমা মামলার বিপ্লবী বীর উল্লাসকর দত্ত। ওই মামলা তখনও চলছে। ধরা পড়লেন আমাদের অশোক নন্দী। মামলায় জড়াবার আগেই মৃত্যু তাঁকে সরিয়ে নিলে। পরবর্তীকালে কুমিল্লার ম্যাজিস্ট্রেট হত্যার ব্যাপারেও আমাদের গ্রামের বহু যুবক-যুবতি ধৃত ও অন্তরিন হয়েছিল। এক পুলিশের চরকে গুলি করা হয় আমাদের গ্রামে। সে ছিল মুসলমান। গুলি করেছিল আমাদের গ্রামেরই বিরাজ দেব। এ মামলায় ও আর একটি মামলায় তার জেল হয়েছিল মোট ৪৫ বৎসরের। মুসলমান গুপ্তচরকে মারার জন্যে সেদিন মুসলমান বন্ধুরাই সাহায্য করেছিল হিন্দুদের।
