পূর্ববঙ্গের ভয়ংকর নদী মেঘনা। তারই পূর্বপারে অবস্থিত সুবৃহৎ রেল ও স্টিমার জংশন, বাণিজ্যবহুল বন্দর চাঁদপুর। আসামের কুলিধর্মঘটকে কেন্দ্র করে দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহনের নেতৃত্বে চাঁদপুরের ঐতিহাসিক আন্দোলন, জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম ও সংগঠনকর্মে উৎসর্গীকৃত প্রাণ ভারতের প্রবীণতম, সর্বজনশ্রদ্ধেয় জননেতাদের অন্যতম হরদয়াল নাগের কর্মসাধনা চাঁদপুরের পরিচয়কে ভারতের দূরতম প্রান্ত অবধি প্রসারিত করেছে। নতুন বাজার, খেয়া পার হলেই কয়েকটি পাটের কল, তার গা ঘেঁষে এঁকে বেঁকে রাস্তা চলেছে দক্ষিণমুখী, খানিকটা নীচু জমির হাঁটাপথ ছাড়িয়েই জেলা বোর্ডের বড়ো সড়ক সোজা চলে গেছে পূর্বে ও দক্ষিণে…এমনি চলতে চলতে শহরের কোলাহল যখন নিঃশেষে বিলীন হয়ে যায় যখন প্রায় দু-ক্রোশ পথ পড়ে গেছে পেছনে, সামনে তখন ছায়ায় ঢাকা, পূর্বে ও পশ্চিমে, উত্তরে ও দক্ষিণে বৃক্ষরাজির আবেষ্টনীর মধ্যে ছায়াছবির মতো চোখে পড়ে একটি গ্রাম–’বালিয়া’ : লৌকিক নাম ‘বাইলা। আধুনিক সভ্যতা নিয়ে গর্ব করবার মতো কিছুই তার নেই, কিন্তু প্রকৃতির অফুরন্ত, অজস্র আশীর্বাদ যে তাকে অনুক্ষণ ঘিরে রেখেছে, গ্রামের সীমানায় পা। দিতেই যেকোনো পথিকের তা চোখে পড়ে। গ্রামটির প্রবীণতার সাক্ষ্য আর প্রতিক্ষণের জাগ্রত প্রহরীরূপেই যেন দাঁড়িয়ে আছে একটি সুউচ্চ তালগাছ আর তার পাশে জোড়া আমগাছ-গ্রামের ঠিক হৃদপিন্ডের ওপর,-সেনদের বাড়ির একেবারে সামনেটায়। জমিদার হিসেবে নয়, শিক্ষায় ও সামাজিক মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠ হয়েই এই বাড়ি দূরাতীত থেকে সসম্মান দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে প্রতিবেশী গ্রামগুলোর।
আমাদের বাড়ি বরাবর গ্রামের সমুখে সুবিস্তীর্ণ প্রান্তর, কোথাও উঁচু গাছপালা সূর্যদেবের আত্মপ্রকাশের পথকে অবরুদ্ধ করে রাখেনি। তাই প্রভাতের স্নিগ্ধতা আর সূর্যালোক মিলিয়ে যে দুর্লভ মাধুর্য প্রকৃতিদেবী দু-হাতে বিলাতে শুরু করেন, তার সম্মোহনে দলে দলে ছেলে মেয়ে ভিড় জমায় সেই আমগাছের তলায়; গাছের নবোদগত আম্রমুকুলে ঢিল ছোড়ে কেউ, কেউ বা অদূরে খালের হাঁটুজলে নেমে হাতমুখ প্রক্ষালন করতে থাকে।
চাঁদপুর জংশনে মেঘনা থেকে যে শাখা-নদীটি শহরটিকে দু-ভাগে ভাগ করে দিয়ে এগিয়ে গেছে সম্মুখপানে,–প্রায় সহস্র গজ পরেই তার রূপান্তর ঘটেছে প্রকান্ড খালে, ক্রমে আরও সংকীর্ণ হয়ে এই খাল বাণিজ্যবাহী জলপথরূপে শহরের সঙ্গে সহস্রাধিক গ্রামকে সংযুক্ত করে নোয়াখালির প্রান্তসীমায় গিয়ে মিশেছে। বর্ষায় তাই বাড়ির সম্মুখ দিয়ে সারি সারি চলমান নৌকার মজা দেখতে সকাল সন্ধ্যায় ছোটোদের ভিড় জমে, বড়োদের মধ্যে যাঁরা বিদেশবাসী, গাঁয়ে এসেছেন ছুটি-ছাটা উপলক্ষ্যে, খালের পাড়ে এখানে সেখানে দু-জন চারজন করে দল বেঁধে পলিটিক্স চর্চা করছেন তাঁরা। জিন্না বড়ো পলিটিশিয়ান কি গান্ধি বড়ো, সূর্য সেন-অনন্ত সিং-এর আমলই ছিল ভালো কিংবা সত্যাগ্রহই এনে দেবে বাঞ্ছিত স্বাধীনতা, পড়য়া হাল পটিশিয়ানদের মধ্যে তাই নিয়ে চলে অফুরন্ত বাক-বিনিময়।
…এই মাঝি, নৌকা থামাও। হঠাৎ হরিমোহন পরামানিক খালের পাড় দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে একরকম খালের জলে নেমেই একটা নৌকার ছই শক্ত হাতে টেনে ধরে।
কী অইল বাবু?–ছই-এর ওপর থেকে সশঙ্ক হয়ে প্রশ্ন করে মাল্লা আর পেছন থেকে মাঝি একই সঙ্গে।
কী অইল? মাঠের মধ্য দিয়া পাল তুইল্যা যাইতেছ, জানো না পাল তুইল্যা গেলে হেই জমিতে আর কোনোদিন ফসল অয়না?
ও হো,–এই নামা-নামা, পাল নামা।–মাঝির নিজেরও হয়তো চাষবাস আছে, তাই শস্যক্ষতির আশঙ্কাটা তার মনে সহজেই প্রবল নাড়া দেয়।
বর্ষার নতুন জলে খালে মাছ ধরার কী আনন্দ! পুঁটি, ট্যাংরা, বাতাসি আর কাজলী-বজরীর ঝাঁকিজালের ফাঁকিতে না পড়ে উপায় কী? জোছনা রাতে চাঁদা মাছগুলো চাঁদের আলোকে ঝিকমিক করে ওঠে জালের ফাঁকে ফাঁকে। অমাবস্যায় পাকা ধরুয়াদের হাত যেন অবলীলাক্রমেই অন্ধকারের মধ্যে জাল থেকে রকমারি মাছগুলোকে খুলে নেয়-কাঁটার ঘা লাগে না। প্রায় প্রত্যহ সন্ধ্যায় কালবৈশাখীর দৌরাত্ম্য। তারই মধ্যে বেপরোয়া হয়ে মাছ ধরা চলে,–মাঝে মাঝে কেবল কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে একজন অপরজনের অবস্থিতি জেনে নেয়।
সন্ধ্যা হতে-না-হতেই পাড়ায় পাড়ায় শিশুদের কাঁসর-ঘণ্টাধ্বনি আর অবিশ্রান্ত কলরব মুখরিত করে তোলে গ্রাম। মাঝে মাঝে খোল-করতাল নিয়ে দল বেঁধে এপাড়া থেকে ওপাড়া, এবাড়ি থেকে ওবাড়ি। আমাদের গ্রাম-পরিবেশের এ ছিল এক আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।
মাঝে মাঝে পালা সংকীর্তনের আসর জমে উঠত আমাদের বাড়িতে কিংবা আমাদের জ্ঞাতিবাড়ি পশ্চিমের বাড়িতে। গাইয়ে–’বাইলার দল’! আমাদের গ্রাম ও প্রতিবেশী গ্রামের প্রায় দু-ডজন কীর্তনীয়া আর কীর্তন-রসিক নিয়ে গড়া এইদল। বছর পাঁচ পুরোদস্তুর ট্রেনিং দিয়ে এরা সত্যিকারের একটা ভালো দল খাড়া করেছে।–’রাধার বিচ্ছেদ’ ‘নিমাই-সন্ন্যাস, ‘মানভঞ্জন’, ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’, ‘নৌকাবিলাস’–প্রতিটি পালাগানের যেমন মর্মস্পর্শী রচনা, তেমনই তার সুর।
পুবের হিস্যার সোনাদার বার্ষিক শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়েছে, সন্ধ্যায় পালাকীর্তনের ব্যবস্থা। ত্রিপল টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে বিরাট উঠোনের ওপর। বসবার ঠাঁই শতরঞ্চি আর মাদুর ইতিমধ্যেই শ্রোতৃসমাগমে ভরে গেছে। তা ছাড়া একপাশে গাছপিঁড়িতে অত্যন্ত আগ্রহভরে বসে আছেন আমাদের অশীতিপর বৃদ্ধ প্রতিবেশী ও প্রজা মেহেরুল্লা খাঁ এবং তাঁর আশপাশে ইসমাইল শেখ, হরমোহন খাঁ, হামির ভুইঞা, ইয়াসিন গাজি, কলন্তর খাঁ, রহমান এবং আরও বহু মুসলমান। ফরমায়েশ হল, ‘নিমাই সন্ন্যাস’ হোক!
