রঘুনন্দন পাহাড়ের গা ঘেঁষে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত যে বিরাট ট্রাংক রোড চলে গেছে, তারই একধারে ত্রিপুরা জেলার দক্ষিণ প্রান্তে, কুমিল্লা সদরের অন্তর্গত আমার গ্রাম। নাম তার চান্দিসকরা। শুনেছি এককালে আমাদের গ্রামের নাম ছিল ‘চন্দ্র-হাস্য-করা, চান্দিসকরা তার সংক্ষিপ্ত রূপ। চান্দিসকরার আকাশ জুড়ে আজও চাঁদ হাসছে, প্রকৃতির সাজ বদল ঋতুতে ঋতুতে যথানিয়মেই চলেছে,বকুল ফুল পড়ে সাদা হয়ে যাচ্ছে আমাদের বাঁধানো ঘাট, চাঁপা-টগর-রজনীগন্ধা-হাসুহানা-ডুইচাঁপার গন্ধে ভোরের বাতাস আজও চঞ্চল হয়ে উঠছে, আম-কাঁঠাল-জাম-জামরুলের ভারে গাছগুলো নুয়ে পড়ছে,-মাছের তান্ডবে অশান্ত হয়ে উঠছে দিঘির কালো জল, কালবৈশাখীর প্রলয় নাচন শুরু হয়ে গেছে আকাশে-বাতাসে– মুসলমান চাষিরা দিন গুনছে মেঘের আশায়, কবে বৃষ্টি হবে, কবে খেতে লাঙল পড়বে : এসব আমি আজ দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তাঁতি-পাড়ার তাঁত আজ আর চলছে না, কুমোরের চাকা ঘুরছে না, কামারের লোহা জ্বলছে না, ছুতোরের বাটালি আজ নিস্তব্ধ! পৈতৃক ভিটা, পৈতৃক পেশার মায়া ত্যাগ করে তারা আজ দলে দলে হারিয়ে যাচ্ছে পূর্ববঙ্গের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর ভিড়ের ভেতর। আমিও তাদেরই সগোত্র–চলতে চলতে ভাবছি : উলটো রথের পালা আসবে কবে?
.
বালিয়া
নিশুতি রাত…কৃষ্ণাচতুর্দশীর সূচীভেদ্য অন্ধকারের মধ্য দিয়ে অতিসন্তর্পণে এগিয়ে চলেছে। আমাদের নৌকাখানি। নৌকার ছই-এর-দু-দিকই আবৃত… সম্মুখভাগে বসে আপন মনে গান গাইছে প্রতিবেশী কাসেম ভুইঞা..পেছন থেকে লগি দিয়ে নৌকা বেয়ে চলেছে যামিনী টিপরা। ছই-এর ভেতরে আমরা চারটি প্রাণী। সারাদিনের দারুণ অশান্তি আর উত্তেজনায় অবসন্ন! সর্বোপরি বর্তমানে জীবন পর্যন্ত সংশয়। কোনোক্রমে শহরে গিয়ে পৌঁছোতে না পারলে রাত্রিশেষে নররূপী পশুদের হামলা অবশ্যম্ভাবী–দিনের বেলায় গ্রামের মেয়েদের, বুড়োদের এবং শিশুদের শহরের নিরাপদ আস্তানায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলে আমরা শুধু ছিলাম রাত্রির অবস্থা দেখে তারপর একটা চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করব বলে। কিন্তু গোধূলির ধূলি উড়বার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে দলবদ্ধভাবে আক্রমণ, লুণ্ঠন ও জখমের সংবাদ এল-প্রান্তীয় বড়ো সড়ক ধরে মশালের সাহায্যে হামলাকারীর দল হই-হল্লা করতে করতে এগিয়ে চলেছে,–কোথাও-বা সারি সারি নৌকার সাহায্যে ওরা অন্তর্বর্তী বিল জলা প্রভৃতি পার হয়ে একের পর এক বাড়িতে হানা দিচ্ছে। এসব দৃশ্য আমাদের বাড়ির পূর্ব দিকের রাস্তায় দাঁড়িয়েই দেখা গেল। অবশেষে ওপাড়ার রহমন খাঁ এসে যখন জানাল রাত্রিতে আমাদের বাড়ি আক্রমণের প্ল্যান হয়েছে এবং চারদিকের আবহাওয়া বাগে এনে সর্বশেষে গ্রাম-কেন্দ্রের এই শক্ত ঘাঁটিটিকে বিপর্যস্ত করাই তাদের অভিপ্রায়–তখন আমাদের সম্মুখে নিরস্ত্রভাবে নিশ্চিত মৃত্যুবরণ কিংবা আত্মরক্ষার জন্যে আত্মগোপন এ দুটির একটি পথ শুধু খোলা রইল। রহমান জানাল, আমাদের বাড়িতে সম্প্রতি যে কয়েকটি বড়ো বড়ো বাক্স-প্যাঁটরা আমদানি করা হয়েছে তাতে বহু অস্ত্রশস্ত্র ছিল বলে ওদের বিশ্বাস,–তাই শক্তি পুরোদস্তুর সংগ্রহ করে তবেই ওরা এখানটায় হানা দেবে এবং সেটা এ রাত্রেই! কিন্তু ওদের বিশ্বাস বা সাময়িক ভয়ের কারণ যাই হোক, শূন্য বাক্স-প্যাঁটরা এবং নিছক বাঁশের লাঠির ওপর ভরসা করে আমরা চারিটি প্রাণী সহস্রাধিক ক্ষিপ্ত পশুর সম্মুখীন হবার সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। রাত্রিও প্রায় শেষ–অগত্যা কৌশলে পথের সুরক্ষিত ঘাঁটি পার হয়ে শহরে গিয়ে প্রাণ বাঁচানার পন্থাই সাব্যস্ত হল। প্রতিবেশী কাসেম খাঁর মস্তিষ্কের সুস্থিরতার কোনো প্রমাণই কোনোদিন পাইনি। আজ হঠাৎ এরকম দুঃসময়ে সে-ই অগ্রণী হয়ে এসে আমাদের নিরাপদে ঘাঁটি পার করে দেবার দায়িত্ব নিয়ে সত্যি অবাক করে দিল।
নৌকাঘাট ছেড়ে মাইলটাক দূরে ওদের ঘাঁটি। খালের এপারে-ওপারে ছাউনি ফেলে শিবির তৈরি করা হয়েছে। যেন একটি কাফেরও বিনাক্লেশে গ্রাম থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে। দুপুরের দিকটায় এদের হাতেই ঘোষেদের বাড়ির নৌকাবোঝাই যাবতীয় মালপত্র লুষ্ঠিত হয়েছে, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে নৌকার যাত্রীদের যৎপরোনাস্তি লাঞ্ছনা করা হয়েছে।
কে যায়?–মেজাজি স্বরে প্রশ্ন আসে একটা ছাউনির মুখ থেকে।
আমি কাসেম ভূঁইঞা।–কে রে? ইসমাইল নিহি?-কাসেম গান থামিয়ে ওদের প্রশ্নের জবাব দেয় এবং নিতান্ত নির্লিপ্ত কণ্ঠে প্রতি-প্রশ্ন করে।
আরে এত রাত্রে যাচ কই?–কাসেমের উত্তর : কই আর যামু,–যাই–রাইত পোয়াইলেই ত প্যাটের চিন্তা,–তার ব্যবস্থার লাইগ্যা।
কাসেমের ব্যাবসা দুধ বিক্রি। গৃহস্থ বাড়ির দুধ দাদন দিয়ে দীর্ঘকালীন বন্দোবস্ত নেয়, প্রত্যহ ভোরে তাই বাড়ি থেকে সংগ্রহ করে শহরের মিষ্টির দোকানগুলিতে সে চালান দেয়। কাসেমের জবাবে ওরা সন্তুষ্ট হল, তাই আমাদের নৌকাও অবাধে বেরিয়ে এল সামনের দিকে।
এমনি করে সর্বনাশা ছেচল্লিশের এক নিশীথ রাত্রে মহাঅপরাধীর মতো নিজের পরমপ্রিয় পুণ্যতীর্থ জন্মভূমি, জন্মগ্রাম থেকে নিঃশব্দে বিদায় নিয়ে এলাম।… তারপর বছরের পর বছর কেটে গেছে–কিন্তু মুহূর্তের জন্যেও সে-মাটির কথা ভুলতে পারিনি। আজন্ম যার আলো হাওয়া আমার জীবনকে বর্ধিত করেছে, যার মাঠ-ঘাট-বাট-বন অনুক্ষণ প্রভাবিত করেছে আমার মন, জ্ঞানোন্মেষের পর থেকে যাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ পঁচিশ বছরের অসংখ্য ঘটনা স্মৃতির ভান্ডার করেছে সমৃদ্ধ, মুহূর্তের তরেও তাকে ভুলি কী করে? আজও প্রতিমুহূর্তেই তাই শুধু পিছু-ডাক।
