সেদিন আমিরউদ্দিনের বোকামি দেখে হেসেছিলাম–আজ বুঝতে পারছি গ্রামের আকর্ষণ গ্রামের ছেলের কাছে প্রবল, কত গভীর। দিগন্তবিস্তৃত ধানখেতের স্বপ্ন কোনোদিন কি ভুলতে পারব? ধান কাটা সারা হবার পর শুরু হত আমাদের ঘুড়ি ওড়ানোর পালা। কত ধুলো গায়ে মেখেছি, দৌড়তে গিয়ে কতবার হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছি–কত রক্ত মাঠের ধূলির সঙ্গে মিশে রয়েছে। সেই মাঠ পেরিয়ে দুপুরের খাঁ খাঁ রোদে বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে যেতাম মনুমিয়ার বাড়ি। মনুমিয়া আখের চাষ করত, তার ওপর ছিল আমাদের লোভ!
রেজ্জাক মিয়ার খেজুরের রসও কি আমাদের কম প্রিয় ছিল! রাত্রে রস পড়ে হাঁড়ি ভরতি হয়ে থাকত সকালে সে-রস বিক্রির জন্যে পাঠানো হত গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে। আমাদের বাড়িতেও খেজুরের রস কেনা হত পায়েস বানাবার জন্যে। আমাদের মন কিন্তু তাতে ভরত না। রেজ্জাক মিয়া ভোরবেলা যখন গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামাত, আমরা গিয়ে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমাদের লোলুপ দৃষ্টি দেখে রেজ্জাক মিয়া কিছু রস আমাদের মধ্যেই বিলিয়ে দিত।
ঘটা করে দুর্গাপুজো হত আমাদের বাড়িতে। পুজোর কটা দিন লোকজনের ভিড়ে সারাবাড়ি গমগম করত। পুজো উপলক্ষ্যে একদিন স্থানীয় বিশিষ্ট মুসলমান ভদ্রলোকদের
নেমন্তন্ন করে খাওয়ানো হত। পুজোর প্রসাদ তাঁরা খেতেন না, তাই তাঁদের জন্যে বন্দোবস্ত করা হত আলাদা খাবারের। পুজোমন্ডপের পাশেই আমাদের বৈঠকখানা ঘর। বিরাট আলোর ঝাড়ের তলায় পরিষ্কার চাদর আর তাকিয়া দিয়ে ফরাস পাতা হত। সকলে বসতেন সেখানে। আমরা ভয়ে বৈঠকখানা ঘরে ঢুকতাম না–আশপাশে ঘুরঘুর করে বেড়াতাম। আশরাফউদ্দিন, সোনা মিয়া, কালা মিয়া প্রভৃতি সকলেই হলেন গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি। বহুকাল থেকেই আমাদের বাড়ির সঙ্গে নিবিড় ঘনিষ্ঠতা এঁদের। আমাদের পূর্বপুরুষের সম্পর্কে কত গল্প শুনেছি এঁদের মুখ থেকে। পুজোর সময় জিনিসপত্র জোগাড় করে দেবার ভার থাকত এঁদের ওপর–কোন জিনিস কত পরিমাণ প্রয়োজন এঁরা সব জানতেন। এঁরা সকলেই চাষি–কিন্তু গুরুজনদের মতোই এঁদের আমরা সমীহ করে চলতাম। ভালোবেসে এঁরা আমাদের কচি মন জয় করেছিলেন।
এমনি কত শত সাধারণ দৈনন্দিন স্মৃতি আজ ভিড় করে দাঁড়িয়েছে মনের দ্বারে। ছেড়ে আসা গ্রামের ফেলে-আসা দিনগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছে আমার অন্তরলোকে। এদের কোনোটিই বিশেষ ঘটনা নয়–অতিসহজ-সরল, সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি কান্নার কথা। একদিন এর তেমন কোনো মূল্যই হয়তো আমার কাছে ছিল না, কিন্তু আজ তাকে হারিয়েছি, তাই সে হয়ে উঠেছে অমূল্য। একই গ্রামবাসী হিসেবে যুগ যুগ ধরে আমরা হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি বাস করে এসেছি–শুধু ধর্মবিশ্বাস ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও চিন্তাধারার ভেতর আর কোনো তফাতই ছিল না। দেশে যখন সমৃদ্ধি এসেছে, হিন্দু-মুসলমানের জন্যে সমানভাবেই এসেছে। যখন বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মহামারীর তান্ডব শুরু হয়েছে, তখনও হিন্দু-মুসলমানের জীবনে সমানভাবেই পড়েছে তার অভিশাপ। কিন্তু কোন এক অশুভ মুহূর্তে ঘোষণা করা হল : হিন্দু-মুসলমান পরস্পরের শত্রু, এদের ভেতর কখনোই মিল হওয়া সম্ভব নয়। মুসলমান প্রতিবেশী নতুন চোখে তাকাল হিন্দু-প্রতিবেশীর দিকে। বললে, তুমি আমার শত্রু–এতদিন যে আমরা পরস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে বাস করে এসেছি, তা মিথ্যে– এতদিন যে বন্ধুর মতো, ভাইয়ের মতো ব্যবহার করেছি, তাও মিথ্যে –শত শত বছর ধরে তোমাতে আমাতে যে আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা কখনো সত্যি নয়! যে শত্রুতা হিন্দু-মুসলমানের ভেতর কোনোদিন ছিল না, দিনের পর দিন ধরে বিষাক্ত প্রচারের ফলে সে-শত্রুতা সৃষ্টি করা হয়েছে শুধুমাত্র একটি দুষ্ট রাজনৈতিক চক্রান্ত সফল করবার জন্যে।
সফল হয়েছে সে-চক্রান্ত। মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, ছল চাতুরির দ্বারা দেশকে করা হয়েছে দ্বিখন্ডিত। হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক ঐক্য, রাজনৈতিক ঐক্য, ভাব-ভাষা, চিন্তা-কল্পনা-সুখ দুঃখ হাসি-কান্নার ঐক্য নির্মমভাবে হার মানল ধর্মবিশ্বাসের অনৈক্যের কাছে। একটা জাতির জীবনে এর চেয়ে বড়ো অভিশাপ আর বোধহয় হতে পারে না। লক্ষ লক্ষ মুসলমানের লক্ষ লক্ষ প্রতিবেশী আমরা আজ হলাম ঘরছাড়া, দেশছাড়া!
কিন্তু এই ভৌগোলিক অস্ত্রোপচার আমাদের মনের নিবিড় ঐক্যকেও কি স্পর্শ করতে পেরেছে? না–পারেনি। কলকাতার নিষ্ঠুর নির্মম পরিবেশের মধ্যে মনের শান্তি কোনোদিন আমাদের আসবে না, আসতে পারে না। কলকাতার আকাশ-বাতাস, আলো-আঁধার, জল মাটি, গাছপালার সঙ্গে আমার গ্রামের প্রকৃতির তফাত, বৈজ্ঞানিকের চোখে হয়তো নেই, কিন্তু যে আলোতে প্রথম আমি চোখ মেলেছি, যে মাটি আমাকে বক্ষে ধরেছে, যে বাতাস ঘোষণা করেছে আমার জন্মবার্তা–তাকে আমি কেমন করে ভুলব, তার স্পর্শ যে আমার অস্তিত্বের অণুতে-অণুতে মিশে রয়েছে। আমার গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি জলবিন্দু, প্রতিটি লতাগুল্মের সঙ্গে আমার নাড়ির যোগ। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আমার অন্তরের বাঁধন-একটা কলমের আঁচড়ে সে সবই কি মিথ্যে হয়ে গেল!
আমরা বাস্তুহারা, শরণার্থী–ভারতের দুয়ারে ভিক্ষাপ্রার্থী : এই আমাদের একমাত্র পরিচয় আজ। এই পরিচয়ের রক্তাক্ত টিকা ললাটে এঁকে কলকাতার পাষাণ-দুর্গের নিষ্ঠুর বন্ধনের মাঝখানে বসে আমি আজ অশান্ত মনে চেয়ে রয়েছি আমার ছেড়ে-আসা গ্রামের দিকে।
