গ্রামের একটাই ছিল প্রধান রাস্তা–প্রথমে লোকাল বোর্ডের, পরে উন্নীত হল ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সড়কে। পদ্মাপার হতে মহকুমার সদর মানিকগঞ্জ পর্যন্ত ষোলো মাইল রাস্তা। সেই পথের পাশ ধরেই থাকত কৈবৰ্তরা। তারা ছিল প্রায় দু-শো ঘর। মাছের চালানি কারবার করত তারা। স্টিমারঘাটে বরফ দিয়ে কলকাতায় এত মাছ তারা পাঠাত যে স্টিমারকে কোনো কোনো দিন তারা দু-ঘণ্টাও আটকে রাখত। এখন তারা আর বেশি কেউ নেই, দু-এক ঘর হয়তো আছে। জেলেরা রাস্তার পারে মেলে দিত কতরকমের জাল-ইলিশধরা, চিংড়িমারা, নদীবেড় দেওয়া। তারা সব দেশ ছেড়ে এসে নবদ্বীপের আশপাশে ‘হা গৌরাঙ্গ’, ‘হা গৌরাঙ্গ’ করছে এখন। কুমোরদের সংখ্যা খুব ছিল না বটে, তবে দুটো বাড়িতে হাঁড়ি-কলসি যা হত তাতে গ্রামের তৈজসপত্রের অভাব মিটে তো যেতই, তারপর তারা নৌকো করে বাড়তি হাঁড়ি-কলসি সুন্দরবনে বিকিয়ে দিয়ে নৌকোভরতি ধান নিয়ে ফিরে আসত ফি-বছর। তারা পাট উঠিয়ে কোথায় গেছে জানি না। এ ছাড়া ছুতোরপাড়া, কামারপাড়া নিয়ে এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম আর কোথাও গিয়ে পাব কি না সন্দেহ। অভাব হয়তো ছিল, তবে অভাবের বোধ ছিল না বলেই জিনিসের অপ্রতুলতার কথা শোনা যায়নি সে গাঁয়ে।
বারোমাসে তেরো পার্বণ, আর তার ঘটাও ছিল তেমনি। দেখতে দেখতে কার্তিক মাস পড়ে যেত। ধান ঘরে উঠেছে, পথঘাট কিছু শুকিয়েছে, লেগে গেল বরোয়ারি কালীপুজোর ঘটা এ উপলক্ষে। ভদ্র পাড়ায় হত কালীর আসরে যাত্রাগান, শখের থিয়েটার, কবিগান, জারিগান। হিন্দু-মুসলমান চাঁদা দিয়ে, পান তামাক খেয়ে একত্রে গলাগলি করে রাতের পর রাত গান শুনত–কবিদের গানের লড়াই, ছড়ার কসরত শুনে তারিফ করত। মদন কবিওয়ালা, ছমির বয়াতি উভয়েরই ছিল গ্রামের মহলে মহলে সম্রাটের সম্মান। চৈত্রসংক্রান্তি, রথ ও দোলের মেলায় গ্রামে চলত সস্তা বিপণির বিকিকিনি, কত ভিন গাঁয়ের কত জিনিসের হত আমদানি! চার পয়সা, আট পয়সার পুতুল থেকে এক পয়সার বাঁশি পর্যন্ত কিনে আমরা কত যে সুখী হয়েছি, সে সুখ আর কি ফিরে পাব? দশহরাতে নিজেদের দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে জেলেদের বড়ো বড়ো ছাদি-নৌকোয় বের হতুম আমরা। সাতখানি প্রতিমার সঙ্গে চৌদ্দজন ঢাকি বিসর্জনের বাজনা বাজিয়ে মরাগাঙের স্থির জলে বেদনার মূৰ্ছনা বইয়ে দিত। দু-পারের হিন্দু-মুসলমান গৃহবধূরা সজল চোখে বিদায় দিত দেবী জগন্মাতাকে। বাইরের নৌকোতে ঘুরে ঘুরে খঞ্জনিতে তাল ঠুকে গাইত মুসলমান বয়াতি বিদায়ের বিসর্জন গান। দশহরার পরের দিন সকল বাড়িতেই লেগে যেত তাড়াহুড়ো। মাইলখানেক দূরে বাহাদুরপুরের ঘাটে যেতে হবে ইছামতী নদীর কিনারায়। ওইখানেই হত নৌকোবাইচ–এক-শো হাতের, আশি হাতের লম্বা নৌকোয় পাল্লা দিয়ে বেয়ে আসত কত শত শত নৌকো নীল, লাল, সবুজ নিশান উড়িয়ে। সব নৌকোই মুসলমান মাঝিদের–গলুইয়ের ওপর কালো বাবরি উড়িয়ে, পিতলে বাঁধানো বৈঠা ঘুরিয়ে পঞ্চাশ-ষাট জন বাইচ-খেলোয়াড়কে সমান তালে, সমান জোরে জল টেনে চলতে তারা সংকেত করত। এ যেন মহাযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির ইঙ্গিতে যুদ্ধ করে চলেছে সৈন্যদল–সেনাপতি অলক্ষ্যে নন, পুরোভাগে। প্রতিযোগিতা চলত দেশবিদেশের নৌকোয়, পাল্লা দিত গ্রামে গ্রামে, মহকুমা মানিকগঞ্জের পরগনায় পরগনায়। যে বছরে পাটের দাম যত বেশি মিলত, সেই বছরে তত জোর পাল্লা। হারজিতের সমাধান কোনোদিন দেখতে পেতুম না, কারণ কোথায় যে ওই পাল্লা শেষ হত, কত মাইল দূরে, তা শুধু ইচ্ছামতী নদীই বলতে পারত। আমরা দেখতুম শুধু উল্কাবেগে ছুটে চলেছে এক এক জোড়া নৌকা। নয় তো দেখেছি, ধীরে ধীরে বেয়ে চলেছে একখানি বাইচের নৌকো–চার-পাঁচজন বয়াতি গায়ক ঘুঙুর পরে নেচে নেচে খঞ্জনি বাজিয়ে গেয়ে চলেছে বয়াতি গান–নিজেদের রচনা, বর্তমান যুগধারা ও অতীতের সুখ-দুঃখের ব্যঙ্গ প্রকাশ। দেশ ভাগ হবার পরে শেষ গান শুনেছি বয়াতির কণ্ঠে বিষাদের সুরে,
কলি যুগে জান বুঝি আর বাঁচে না–
কোথায় থেকে তুফান আইল,
ঘর বাড়ি সব উড়াইয়্যা নিল,
মানুষজনে খাইত্যাছে আইজ কুত্তা শিয়ালে।
সেই বয়াতি সুরের বিদায়ক্রন্দন আজও কানে বাজে–কলকাতার সুর-লয় সংযোগে আভিজাত্যমন্ডিত যেসব ভাটিয়ালি গান আজ শুনছি, তার চাইতেও গভীর করে যে সেই বৈঠার তাল, খঞ্জনির মূৰ্ছনা মনেপ্রাণে দাগ কেটে রেখেছে। তেমনটি কি আর শুনব? ছন্দহীন পঙক্তিবিহীন সেই গেঁয়ো কবির মর্মভরা কবিতা, ইচ্ছামতীর জলেই কী চিরকালের মতো বিসর্জন দিয়ে এলাম?
পৌষ মাস এসে পড়ল। এর সময়েই হত আলিজান ফকিরানির দরগায় বছরের উৎসব। সারামুলুকের হিন্দু-মুসলমান ছুটে যেত ফকিরানীর আশীর্বাদ, দোয়া নেবার জন্যে। তার দরগা দুধে দুধে ধুয়ে দিত, তার সর্বজনীন সিন্নির খিচুড়ি মাথায় করে নিয়ে যেত হিন্দু-মুসলমান সবাই। পঙ্গু ফকিরানী তাঁর রুক্ষ জটাজালপূর্ণ মাথাটি নাচিয়ে নাচিয়ে একবার এর আর ওর গলা জড়িয়ে ধরে ‘আল্লার জান, বাঁচো’ বলে ছুটতেন এধার-ওধার। হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ ভুলে এই গেঁয়ো তাপসী রাবেয়া’র আশীর্বাণী মাথায় করে কৃতার্থ হত সবাই। মকিম শেখের কোলে চড়ে কতবার গেছি সেই প্রসাদী সিন্নি খেতে। সেই ফকিরানীও আজ নেই–সিন্নিও ফুরিয়ে গেছে। দরগা নাকি পদ্মার জলে অতলে তলিয়ে গেছে। ভোর হলেই এখনও কানদুটো শুনছে শেষরাতের আজানধ্বনি, উদ্ধব বৈরাগীর উদাসিয়া গান। চৈত্র মাসের কালীকাঁচ আর বুড়ো মোল্লার বহুরূপ এখনও যে চোখের সমুখে নেচে বেড়ায়! ঘোষালের যাত্রার আসরে ভীমের গদা এখনও যে বনবন করে মনের চোখের সামনে ঘুরছে!
