কলকাতায় পথে-ঘাটে কতরকমের পাগলই না দেখছি–তবু দিনু পাগলাকে ভুলতে পারি না। সেই দিনু শেখের মেয়েটাও মরে গেল–আগের বছর বউ মরেছে কলেরায়, দিনু পাগল হয়ে গেল। ঘন কালো সুঠাম দেহে, একমাথা ঝাঁকড়া কালো চুলে সে পরত বেছে বেছে ধুতরো ফুল। সুদে ও তস্য সুদে তার ভিটেমাটি আগেই গ্রাস করেছিল মহাজনরা–তাই ছিল না তার কিছুই। কালীতলায় পড়ে থাকত রাতের বেলায়, দিনভর বসে থাকত সে পদ্মার ঘাটে। বউ-ঝিরা তার রক্তচক্ষু দেখে একটুও ভীত হত না–আর দিনুর কড়া পাহারায় একটি বাচ্চাও জলে ডুবতে পারত না। একটু বেকায়দায় পড়ে গিয়েছে তো–দিনু ডাঙা থেকে লাফিয়ে পড়েছে–জল থেকে তুলেছে ডুবন্তকে। খিদের বেলায় একটা কলাপাতা নিয়ে যেমন খুশি ঢুকে পড়েছে যেকোনো বাড়িতে–পেয়েছে পেটভরা ভাত। স্ফুর্তি করে খেয়ে ‘আল্লাকালী’, ‘আল্লাকালী’ বলে লাফাতে লাফাতে ছুটে চলে গেছে বাইরে, দু-চোখের বাইরে। কিছুক্ষণ বাদেই দেখা যেত তাকে, চাষির হাতের লাঙল কেড়ে নিয়ে সে চালাচ্ছে বলদ—’হেঁইও–হট’–ততক্ষণে আইলের ওপর বসে চাষি ভাই একটু তামাক খেয়ে নিচ্ছে। সে আর কতক্ষণ! একটু পরেই দিনু ছুটেছে পদ্মার তীরে।
সেই শান্ত পাগল দিনুই একবার ভীষণ কান্ড করে বসল। শীতের মধ্য রাত্রি, হরি পোদ্দারের খড়ের গাদায় আগুন লাগিয়ে দিয়ে সে জোর চেঁচাতে শুরু করল-”ও পোদ্দার মোশাই–দ্যাহেন কত্তা, কী নাল ঘোড়া দাবাড় দিছি। যত লোকজন হই-হুঁল্লোড় করে আগুন নেভায়, দিনু ততই নাচে বগল বাজিয়ে, কী সুকর্মই না সে করেছে। অগ্নি নির্বাপিত হল। তারপরে গাঁয়ের মাতব্বর ব্যক্তিরা বসে গেলেন বিচার করতে। পঞ্চায়েতি বিচার করতে। পঞ্চায়েতি বিচারসভায় হিন্দু-মুসলমান দাস-কৈবর্ত সকলেই থাকতেন। দিনুকে জিজ্ঞাসা করা হল, কেন সে এমন কাজ করল। সাফ উত্তর দেয় দিনুজারা, বড়ো কড়া জারা (শীত)। সেই বছর থেকে যেবারই বেশি শীত পড়েছে, গাঁয়ের লোকে চাঁদা করে দিনুর জন্যে শীতের কম্বল কিনে দিয়েছে, নয় তো জোগাড় করে দিয়েছে। দিনু আর শীতেও কাঁপেনি–লাল ঘোড়াও আর ছুটোয়নি। দিনু আর নেই। কিন্তু কলকাতায় এসে দেখি সেই দিনু পাগলার মৃত্যু হয়নি। সারাদুনিয়ার ঘরে ঘরে দিনু পাগলার জন্ম হয়েছে–তারা ছুটিয়ে আসছে লাল ঘোড়া। এবার হরি পোদ্দারের দলের যে কী দশা হবে ভেবে পাইনে কিছু, তাদের রুখতে হলে যে কম্বলের দরকার, তা দেবে কে?
চৈত্র মাসের খরার দিনে দেখতুম গাঁয়ের চাষি-ছেলেরা মাঙনে বের হত। ঝকঝকে একটা ঘটি হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে, গোরুর দড়ি দিয়ে আম্রপল্লব-বাঁধা পাঁচন বাড়ি কাঁধে নিয়ে ঘরে ঘরে সিন্নির চাল মেগে নিত। বলত একদিলের সিন্নির চাল দেন। কোন আল্লাদেবতা যে এই ‘একদিল’ জানতুম না। এখন বুঝি একদিল মানে একপ্রাণ। এত বড়ো দেবতার কৃপা কুড়োতে হিন্দু ও মুসলমান চাষিদের মধ্যে বিভেদ হত না। সেই ভিক্ষালব্ধ চাল দিয়ে সম্মিলিত যে সিন্নি পতিত ভিটেয় হত–তাতে হিন্দু-মুসলমান সবাই যোগ দিয়ে বৃষ্টির কামনা করত। মন্ত্রতন্ত্র কিছু ছিল না। একপ্রাণের কামনার ফল ফলত বই কী–হয় শীঘ্র, নয় বিলম্বে।
সেই ছেড়ে-আসা অবিখ্যাত আমার গ্রাম! কলকাতার মিলের চিমনি ভোরের বেলাতে ভোঁ করে ওঠে-ঘুম ভাঙতেই শুনি! মনটা রোজই ছ্যাঁৎ করে ওঠে। ওই গোয়ালন্দের স্টিমার কাঞ্চনপুরঘাট ছেড়ে এসেছে–যাবে নারায়ণগঞ্জে, বাঁশি বাজাচ্ছে–ভোঁ-ভোঁ।
.
সোনারং
খাওয়া পরা দেখছি হল ভার,
মায়ের মুখ কেবল মনে পড়ে;
তাদের কথা বলছ কিবা আর,
দূর থেকেও সঙ্গ নাহি ছাড়ে।
খাওয়াপরা সকল দিছি ছেড়ে,
ছেলেগুলোই সব নিল রে কেড়ে!
কতকাল আগে কোন কবি এ গান গেয়ে গেছেন তা সঠিক না জানলেও তাঁর দুঃখের সঙ্গে আমাদের দুঃখের মিল দেখে আশ্চর্য বোধ করছি। আজ আমরা জন্মভূমি ছাড়া হয়ে নাওয়া খাওয়া ত্যাগ করেছি, আমরা মাকে ভুলতে চাইলেও তিনি চোখের সামনে উঠছেন ভেসে বার বার। স্মৃতিসঙ্গ কিছুতেই মুক্তি দিচ্ছে না,–তাঁর দুরন্ত ছেলেগুলো তাঁকে কেড়ে নিয়েছে আমাদের কাছ থেকে! মাকে ছেড়ে প্রবাসী হয়েছি, প্রবাসযাত্রার শেষ কবে হবে জানি না।
বার বার মনে পড়ছে আমার গ্রাম সোনারং-এর কথা। আশা-নিরাশার স্মৃতি মনের মণিকোঠায় ভিড় করে রয়েছে জট বেঁধে, মন হাঁপিয়ে উঠছে চারপাশের দেওয়াল-ঘেরা শহুরে আবহাওয়ায়। এখানে মুক্তি নেই, উদারতা নেই, ছুটি নেই, ফাঁক নেই। আমার গাঁয়ের উন্মুক্ত প্রান্তরের উদার হাতছানি কোথায় পাব শান-বাঁধানো কলকাতার বুকে? হৃদয়বীণার তারে মরচে ধরেছে–তাকে হয়তো আর সুরে বাঁধতে পারব না! সুর কেটে যাচ্ছে তাই বার বার।
আমার গ্রামটির ইতিহাস শান্তির ইতিহাস। ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে সে গ্রাম মহান। আজও সেখানে বৌদ্ধযুগের শান্তির ধ্বজা উড়তে দেখা যায়। সেখানে রয়েছে বৌদ্ধযুগের ধ্বংসাবশেষ। গ্রামের কবি হরিপ্রসন্ন দাশগুপ্ত মশায়ের কাছে শুনেছি সেই আলো-ঝলমল তথাগতের শান্তির ললিত বাণীর মনোরম গল্প। আজও বর্ষার দিনে যেখানে বাঁকাজল খেলা করে তার তলায় বিশ্রাম করে তথাগতের সারিবদ্ধ সোনার দেউল। জন্মভূমি পক্ষবিস্তার করে রক্ষা করছেন বিস্মৃত ইতিহাসকে। ভারতবর্ষের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের জন্যেই চিন-জাপান পর্যন্ত ভারতকে গুরু বলে স্বীকার করে নিয়েছে। তাঁর শান্তির বাণীকে বর্বর মানুষ আর ব্যর্থ পরিহাস করতে পারবে না–সলিলসমাধি সৌধরেখা আজ জলরেখায় গেছে মিশে! মনে পড়ে প্রথম যেবার ঢাকা শহরে ক্ষুদ্র মিউজিয়ামটি দেখতে যাই, সেবার প্রথমেই দেখতে পাই সুউচ্চ স্কুপের ওপর ভগবান বুদ্ধের স্তব্ধ মূর্তিটি। আপনা আপনিই সেদিন তাঁর পায়ে আমার মাথা পড়েছিল লুটিয়ে। সেখানে দাঁড়াতেই কানে বেজে উঠেছিল কবিরাজ গোস্বামীর গানটি,
