ছত্রিশ জাতের গ্রাম ছিল আমাদের নটাখোলা। ব্রাহ্মণপাড়ার ভট্টাচার্যদের বাড়িতে বাড়িতে ন্যায়ালংকার, বিদ্যালংকার, তর্কতীর্থ, তর্কতীর্থ, কাব্যতীর্থদের টোলে ঢুকে ঢুকে দেখেছি, টোলের প্রবাসী ছাত্ররা সুর করে পড়ত বেদ-বেদান্ত, স্মৃতি, তর্কশাস্ত্র, কাব্য, দর্শন। গোঁসাইপাড়ার গোস্বামীগণ শোনাতেন চৈতন্যচরিতামৃত। আধুনিক গাঁয়ের একমাত্র মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ের ছেলেরা ইংরেজির দুরূহ উচ্চারণ অভ্যাস করত চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করে। তাদের বিজাতীয় বিকৃত উচ্চারণে চমকে চেয়ে থাকত কলসি কাঁখে পদ্মার ঘাটে গমনরতা গাঁয়ের কুললক্ষ্মীরা। গাঁয়ের হাঁটা-পথে ধাবমান বলদজোড়াকে আপন মনে যেতে দিয়ে লাঙল কাঁধে করিমচাচা অথবা মহেন্দ্র বিশ্বাস সেই পড়য়াদের ইংরেজি বুলিতে হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত–ওরা হয়তো মনে করত গুহ, বসু ও মজুমদার বাবুদের ছেলেরা তাদের গালাগাল দিচ্ছে। সেই ব্রাহ্মণপাড়ার কোল ঘেঁষেই মস্তবড়ো দাসপাড়া। এ পাড়ায় থাকত গাবর দাসেরা। এদের কাজ ছিল সম্পন্ন গৃহস্থবাড়ির কাজ করা–ভিটেয় মাটি তোলা, বাগান তৈরি করা, ধান মাড়াই করা ও ফাইফরমাশ খাটা। এতেই সুখে-দুঃখে পঞ্চাশ-ষাট ঘর দাসেদের চলত অনাবিল জীবনপ্রবাহ।
দাসেদের পাড়া পেরিয়ে গেলেই সাহাদের বাড়িঘর। এরা সবাই ছিল সম্পন্ন, যেমন শ্রী ছিল ঘরদোরের তেমনি ফুটফুটে আঙিনা। তাঁদের অনেকেই করত চালানি কারবার। সেই চালানির পেঁয়াজ, রসুন, তিল, সরষে, খেজুর গুড়, কলাই ছাঁদি-নৌকোয় ভরে গাঁয়ের মাঝিমাল্লারা ‘গাজি পাঁচপীর বদর বদর’ বলে পদ্মার বুকে ভাসিয়ে দিত সপ্তডিঙা মধুকর। এমন পাকা মাঝি ছিল তারা যে, কোনোদিন নৌকো ডুবে যায়নি তাদের, যদিও তারা সুন্দরবন পেরিয়ে এসেছে কলকাতায়, উজান ঠেলে গিয়েছে আসামের ধুবড়ি, তেজপুরে। কলকাতার পর ওরা গিয়েছে পাটনায়, কানপুরে-ফিরে এসেছে সরষের তেল নিয়ে, বিহারি আখিগুড়ে নৌকো ভরতি করে। আর আসাম থেকে ওরা এনেছে ধান আর ধান-কত ধান! এই গাঁয়ের ঘাট থেকেই রপ্তানি হত ঝিটকা বন্দরের প্রসিদ্ধ হাজারি গুড়, কিন্তু পরিমাণ ছিল বড়ো অল্প। আজকালকার ফিটকারি মেশানো নকল হাজারি গুড় সে নয়। আসল হাজারি গুড় বেশি সাদা হয় না–তাতে পায়েস রান্না করলে দুধও জমে যায় না। কাঁচা রসের সুমিষ্ট গন্ধে পদ্মার ঘাট মিষ্টি হয়ে যেত মাত্র দু-এক মন হাজারি গুড়ের সুগন্ধে। কোথায় লাগে তার কাছে। ভীম নাগের সন্দেশ-কলকাতার নলেন গুড়! যা খেয়েছি আজও যে তার আস্বাদ ভুলে যেতে পারছি না। হাজারি শেখ জন্মেছিল ক-পুরুষ আগে জানি না, হাজারি নিজে কিন্তু ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমায় অমর হয়ে রয়েছে–থাকবেও।
সাহাপাড়ার ডান পাশেই পুবের দিকে আইড়মারার মাঠের কোল ঘেঁষে উত্তর-দক্ষিণে ছিল তাঁতিপাড়া-মুসলমান কারিগর। মাঝখানটায় একটা মাত্র গেঁয়োপথের ব্যবধান–হিন্দু মুসলমানের সীমান্তরেখা। দিবারাত্র শুনতাম খটাখট শব্দ। তাদের মাকু চালানোর আওয়াজ আইড়মারার বিল পেরিয়ে, পাঠানকান্দির গ্রাম ছাড়িয়ে শোনা যেত ইছামতী নদীর কোলের বন্দরে–লেছড়াগঞ্জে। বন্দরের ব্যাবসায়ীরা সেই তাঁতিদের কাপড়, শাড়ি, চাদর, গামছা বিকিয়ে দিত ঘরে ঘরে। পঞ্চাশের মন্বন্তর এল–সেই তাঁতিকুল সুতোর অভাবে বেকার হয়ে গেল, না খেয়ে শুকিয়ে মরল অনেকে। দুর্ভিক্ষের পরে এল মহামারি! গ্রাম উজাড় হয়ে যায়! আমি নিজে ধরনা দিলুম তৎকালীন চিকিৎসামন্ত্রীর কাছে–ফল হল না কিছু। সামান্য কজন কর্মী যতটা পারি করলাম। স্বাভাবিকভাবেই মরে মরে ফুরিয়ে এল সেই মহামারি। তাঁতিপাড়ার আওয়াজ তখনও বন্ধ হয়নি। দেশ ভাগ হবার পূর্ব পর্যন্ত চলেছে কোনোক্রমে। তারপরে ধীরে ধীরে থেমে গেছে–সাতাশ ঘরের সাতঘর হয়তো টিকে আছে। তাঁত বেচে ফেলেছে–খেতখামারে নিড়ানি দিয়েছে তারা–নিড়ানো ফুরিয়ে গেছে, এখন তারা নিকটের শহরের পথে পথে হেঁটে বেড়ায়,–পাকিস্তানি কোঁদল শোনে–আর ভাবে, এ জীবনের আর কত বাকি!
চাষিরা ছিল দু-জাতের। হিন্দুও ছিল, তবে মুসলমানই বেশি। তারা নির্দিষ্ট কোনো পাড়ায় থাকত না। যেকোনো দিকে হিন্দু-মুসলমানের ঘর পাশাপাশিই ছিল। ব্রাহ্মণ হলেও, আমাদের বাড়িটার ঠিক গা ঘেঁষে তিনদিকেই ছিল মুসলমান প্রতিবেশী–সবাই চাষি। জহিরুদ্দিন শেখের স্ত্রী আমাদের ছিলেন বড়োচাচি, বুধাই শেখের সুন্দরী স্ত্রীকে বলতাম ‘ধলা-ভাবি’ গোপাল শেখের স্ত্রীকে তো ভাবি বলেই ডাকতাম–কারণ গোপাল আমার বাবাকে ‘বাবা’ই বলত। আমার বাবা ডা. হৃদয় ভট্টাচার্যকে সারাপরগনার লোকেই চিনত। ঢাকা মেডিক্যাল স্কুলের প্রথম পর্যায়ের পাশ করা ছাত্র ছিলেন তিনি, পাশ করা হৃদয় ডাক্তার। গোপাল একবার কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর চিকিৎসায় বেঁচে উঠে পিতৃদেবকে বাবা বলে ডেকে চিকিৎসার দক্ষিণা দেয়–সেই থেকে চিরদিনই ছিল সে আমাদের বড়ো ভাই। আমাদের সুখের দিনে বাবরি চুল ঝুলিয়ে লাঠি নিয়ে নাচত আর দুঃখের দিনে–শোকে-সন্তাপে আমাদের উঠোনে গড়াগড়ি দিয়ে সবার সঙ্গে সমানে কাঁদত। ধমক খেয়ে বাগানের আমগাছ কেটে শ্মশানযাত্রার ব্যবস্থাও করে দিত। মোল্লাপাড়ার মাজুদিদিকে আজও পারি না ভুলতে। আমার মাকে তিনিও মা বলেই ডাকতেন। রাত্রির আঁধারে বোরখা পরে, চাকরের হাতে লণ্ঠন দিয়ে চটিজুতো পায়ে তিনি সপ্তাহে প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়ি-তখনকার দিনে মেয়েদের জুতো পরার রেওয়াজ হয়নি। কাজেই মাজুদিদির ওই অপরূপ মূর্তিটা চোখে বেশি করেই বাজত। দিদির কাজ ছিল ভারি মজার। যত রাজ্যের ভালো ভালো জিনিস চাকরকে দিয়ে বয়ে নিয়ে এসে আমাদের সকল ভাইবোনকে, মা, দিদিকে সামনে বসে খাইয়ে তবে তিনি যেতেন। কোনো নতুন জিনিস তাঁর আগে আমাদের কেউ এনে দিতে পারত না। দিদি ছিলেন নিঃসন্তান–আমাদের কোলে না নিতে পারলে তাঁর ভালো লাগত না। কতদিন পন্ডিত মশাইয়ের মার খাবার ভয়ে পালিয়ে গেছি মাজুদিদির বাড়িতে সেই পতিত জমির ওপারে। মাজুদিদির কোলে বসে কতদিন মজা করে দুধ-ভাত খেয়েছি। মর্তমান কলা দিয়ে আর পুরোনো খেজুরগুড় মিশিয়ে। আমার ব্রাহ্মণত্ব তাতে ঘোচেনি। মা জানতেন, বাবা তো ছিলেন সাহেব। নিষেধের প্রাচীর সেই পুরোনো দিনে আমাদের ভ্রাতা-ভগ্নীর সম্বন্ধটাকে ঘিরে ফেলতে পারেনি। এর সঙ্গেই মনে পড়ে সেই ছোটোবেলার শীতের দিনের কথা। গাছের তলায় সকালের রোদ্দুরটা আগে এসে পড়ত আমাদের বাড়িতে। সেইখানটায় ছেঁড়া চট বিছিয়ে ইস্কুলের পড়া তৈরি করতুম। এক এক ফাঁকে ক্ষেপু শেখের স্ত্রী ‘চাচি’ হাতছানি দিয়ে ডাকতেন। ছুটে গিয়ে কাঁটাল পাতায় করে সদ্য তৈরি নতুন গুড়ের ‘চাঁচি’ নিয়ে মহাআনন্দে রোজ চাখতুম। পঞ্চাশের ধাক্কায়ও বেঁচে ছিলেন চাচি, যদিও তাঁর তিনকুলে কেউ ছিল না। কিন্তু যেই আমরা দেশ ছেড়েছি চাচি আর বেঁচে থাকতে চাইলেন না। শুনেছি তাঁকে পদ্মার ভাঙাপারের ফাটলে ফেলে দিয়ে মাটি চাপা দিয়েছে গাঁয়ের দয়ালু মুসলমানেরা, ছাফন কাফনের খরচা জোটেনি। এই কলকাতায় বসে যতদিন ভেবেছি ছুটে গিয়ে চাচির সেই কবরখানা দেখে আসি, আর ফেলে আসি সেখানে তাঁর দেশছাড়া এক জিম্মি-ছেলের কয়েক ফোঁটা অশ্রু। রাক্ষুসি পদ্মা কি সে কবর এখনও রেখেছে?
