কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসের দিকে জলে যখন টান ধরত, তখনকার প্রধান আকর্ষণ ছিল মাছ ধরা। জল কমে আসায় তখন পুকুর, ডোবা, নালায় এসে আশ্রয় নিত মাঠের মাছগুলো। ছিপ, পলুই বা জাল ফেলে মাছ ধরার তখন মহাধুম পড়ে যেত চারদিকে। জীবন্ত পুঁটি ‘খোটে, খোটে উঠত বঁড়শিতে। বড়ো বড়ো শোল আর গজাল মাছ ধরারই বা কী আনন্দ! টোপ গেলার সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে গিয়ে ছিপ টেনে মাছ তুলতে সে কী ছুটোছুটি! একটু দেরি হলে শিকার হাতছাড়া হবার খুবই সম্ভাবনা। মৎস্য ধরিব খাইব সুখে’–কথাটা পূর্ববাংলার এই নীচু জলাভূমির ক্ষেত্রেই বুঝি বেশি খাটে!
আমাদের ছেড়ে-আসা গ্রামের এমনি কত কথা–এমনি কত স্মৃতি আজ চোখের সামনে এসে ভিড় করে–মানসপটে দেখা দেয় পল্লিমায়ের এমনি কত স্নেহসিক্ত রূপ। জীবনের এতগুলো বছর যার স্নেহক্রোড়ে কেটে গেছে হাসি-কান্না রং-তামাশার মধ্য দিয়ে, তার কোলে ফিরে যেতে আবার যে সাধ যায়–ইচ্ছে হয় পরমপীঠস্থান আমার জন্মভূমিকে আবার আপনার করে ফিরে পেতে!
.
নটাখোলা
রাজনীতি কীর্তিনাশা পদ্মার ওপরেও টেক্কা দিয়েছে বিংশ শতাব্দীর মাঝখানে এসে! পদ্মা এক পাড় ভেঙে অন্য পাড়ে সমৃদ্ধির প্রাসাদ তোলে, কিন্তু ভেজাল রাজনীতি বড়ো নির্মম! পিতৃভূমি ত্যাগ করে আজ কত নিরাশ্রয় মানুষ দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাপাত্র সম্বল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের দুঃখ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তার উপলব্ধি অধিকাংশ মানুষের মনকে স্পর্শও করছে না! সমস্ত জীবন সুখে কাটিয়ে শেষজীবনে যাঁরা দুটি ভাত-কাপড় আর একটুখানি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে হন্যে হয়ে মানসম্মান হারিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাঁদের অবস্থার কথা ক-জন ভাবছেন দরদ দিয়ে? স্বাধীনতার জন্যে জীবন বিপন্ন করেছি আমাদের ভয়ে একদিন বিদেশি শক্তিও ভীত হয়েছিল, কিন্তু ভ্রাতৃবিরোধ সেই ঐতিহ্যটুকু হরণ করে সর্বদিক থেকে যেন সমস্ত বাঙালি জাতিকে হীন করে তুলেছে। বাংলার মানুষ আত্মীয়বোধে জীবন দিতে পারে, কিন্তু আজ হীন স্বার্থ বড়ো হয়ে উঠে মানুষের মানবতাবোধকেও যেন বিপর্যস্ত করতে বসেছে। আমাদের এই যে অপমৃত্যু এর জন্যে দায়ী কে? জাতীয় ঐতিহ্য বিসর্জন দেওয়া আর আত্মহত্যা করা দুই-ই যে সমান কথা।
পদ্মার কুলুকুলু ধ্বনি একদিন মনে যে আমেজ আনত আজ আর গঙ্গার কূলে বসে সে অনুভূতি যেন পাই নে। আমাদের অবস্থা যেন সেই ছড়া-বর্ণিত এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা মধ্যিখানে চর’ গোছের। দুঃখ-লাঞ্ছনা ভোগ করে করে অবস্থা হয়েছে স্যাণ্ডউইচের মতো নিষ্পিষ্ট। গ্রামের মানুষ আমরা, শহরজীবনে অভ্যস্ত নই। তাই পদে পদে কলকাতায় পায়রা খুপি অস্বাস্থ্যকর ঘর নামধেয় বস্তিজীবন আমাদের শ্বাসরোধ করে তুলছে দিন দিন। এই দ্বীপান্তর থেকে কবে মুক্তি পাব তা ঈশ্বরই জানেন। ছেড়ে-আসা গ্রামকে আজ তাই বেশি করে মনে পড়ছে। খুঁটিনাটি জীবনকথা চোখের সামনে ভেসে উঠে মনকে উদাস করে তুলছে। বার বার। মুক্ত জীবন, মুক্ত বাতাস একে উপড়ে নিয়ে এই যে ইটকাঠ-ঘেরা কারাগারে আমাদের জোর করে বন্দি করে রাখা হয়েছে একে কি স্বাধীনতা আখ্যা দিয়ে সম্মানিত করা মৃতপ্রায় মানুষের পক্ষে সম্ভব?
পদ্মার উত্তাল তরঙ্গ কূল ছাপিয়ে তীরবর্তীদের ভিজিয়ে দিত, আর সেই ঢেউয়ের বুকে দুলে দুলে চলত গাঁয়ের কতরকমের নৌকো। কোনো কোনোটার বুকে আঁকা থাকত ছোটো ছোটো লাল তারকা। গাঁয়ের ছেলেরা ঝাঁকে ঝাঁকে বাঁকে বাঁকে, ডিঙি নৌকোয় মাছ ধরত; কৈবৰ্তরা ঘাটে ঘাটে তাদের ডিঙি ভিড়িয়ে সেই মাছ কিনে নিত। গ্রাম ছেড়ে সে মাছ চলে যেত দূরে–কত দূরে–কলকাতায়। সকাল থেকে সন্ধে নাগাদ পদ্মার বুকে চলত হাজার হাজার নৌকোর আনাগোনা–দেশি, বিদেশি ছোটো ছোটো ডিঙির মাঝখান দিয়ে পাল তুলে চলত বড়ো বড়ো হাজারমনি পাঁচ-শোমনি চালানি নৌকো–দূর থেকে মনে হত ছোটো ছোটো পাতিহাঁসের দলে চলেছে যেন এক-একটা বড়ো বড়ো রাজহংস।
নারায়ণগঞ্জ লাইনের স্টিমারগুলো গোয়ালন্দ বন্দর থেকে ছেড়ে এসে মাঝখানটায় কাঞ্চনপুরে ভিড়ত; সেখান থেকে স্টিমার ছাড়বার ভোঁ পদ্মার বাতাসে ভেসে ভেসে এসে পড়ত আমাদের স্টেশনঘাটে। সে ধ্বনি ইলামোরার মাঠ পেরিয়ে আইড়মাড়া বিলের ওপারেও শোনা যেত ভিন গাঁয়ে। পাটগ্রাম, পাঠানকান্দি, হেমরাজপুর, বাহাদুরপুর–এ পরগনার প্রায় সমস্ত লোকই জানত–শহর কলকাতা থেকে তাদের প্রবাসী কুটুম্ব ওই স্টিমারে আসছে। ভোরের সেই স্টিমারের ভোঁ, আর সন্ধ্যার গোয়ালন্দগামী স্টিমারের বাঁশি এ গাঁয়ের এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চলের নর-নারীর মনে জাগিয়ে তুলত মিলনের আনন্দ, বিচ্ছেদের বেদনা। আজও সকাল-সন্ধ্যায় শোনা যায় সেই স্টিমারের ভোঁ। কিন্তু স্টিমারঘাটে নেই সে ভিড়–নেই আর সেই দোকানপাট। ছেলেরা পালিয়েছে, নয়তো মরেছে না খেয়ে–কৈবৰ্তরা পালিয়ে এসেছে রাণাঘাটে, নয়তো নবদ্বীপে। এখন কি সেই বিরাট চালানি নৌকো তেমনি পাল তুলে চলে? বড়ো বড়ো পানসিগুলো নদীপারের যাত্রী নিয়ে আজ কি পদ্মার বুকে পাড়ি জমায়? ঘাটে ঘাটে গাঁয়ের মেয়েদের কচকচানি, ছেলে-মেয়েদের জলে দাপাদাপি হয়তো ফুরিয়ে গেছে, শাঁখ বাজিয়ে ঘণ্টা পিটিয়ে গঙ্গাপুজোরও হয়ে গেছে হয়তো অবসান!
