মনে পড়ে আমাদের পশ্চিমপাড়ার খেলার মাঠের কথা। পাঠ্যাবস্থায় গ্রীষ্মের লম্বা ছুটিতে ওইটুকুন চতুর্ভুজ মাঠে ফুটবল খেলার কী বিরাট ধুমই না পড়ে যেত! ওই মাঠেই অনুশীলন করে আমরা আশপাশের–এমনকী বিক্রমপুরস্থ দূর গ্রাম থেকেও কত শিল্ড-কাপ জয় করে নিয়ে এসেছি তার ঠিক নেই।
ছেড়ে-আসা গ্রামের আরও অনেক কিছুই আজ মনে পড়ে। মনে পড়ে, শীতের সময় শিবরাত্রির উৎসবের কথা। রাত্রি জাগরণের নামে সবাই যখন নির্জলা উপবাসে কাতর, আমরা তখন গাঁয়ের গৌর মুদি, আদিত্য ভট্ট আর শরৎ ভট্টদের খেজুর গাছের রস চুরি করে। খেতাম। শীতে ঠকঠক করে কাঁপত সবার শরীর। কিন্তু তাতে কী?
চৈত্র মাসে চড়ক পুজোর কথাও ভুলতে পারা যায় না। গাজন দলের লোকেরা বাড়ি বাড়ি কত সং দেখিয়ে বেড়াত, বেদে-বেদেনির নাচ নাচত। গাঁয়ের কবিয়ালরা চমৎকার নতুন নতুন গান বেঁধে তাদের সহায়তা করতেন। কুমাই মুদি আর ট্যানা সাধু প্রভৃতি সেসব জনপ্রিয় কবিয়ালরা আজ কোথায়?
আমি তখন একেবারেই ছোটো। পাঠশালার নীচের ক্লাসে পড়ি। আমাদের গাঁয়েরই এক বাড়িতে কবিগানের আসর বসেছে। আমিও তার একজন উৎসুক শ্রোতা। ওইটুকু বয়সে সে গানের অর্থ বোঝা দুরূহই ছিল আমার পক্ষে। তবু দু-পক্ষের কবির লড়াই যে খুবই উপভোগ করেছিলাম, সে-কথা আজও বেশ মনে পড়ছে। কী অস্বাভাবিক কবিত্বশক্তি দেখেছি সেকালের কবিয়ালদের। সঙ্গে সঙ্গে কবিতায় উত্তর-প্রত্যুত্তর চলেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। কখনো চলেছে কেচ্ছা এবং পাল্টা কেচ্ছার তুফান আবার কখনো বা চলেছে ধর্মালোচনা। তার প্রায় সবটাই ছিল আমার উপলব্ধির বাইরে। তবু নেহাত হজুগে মেতে এবং কবিয়ালদের অদ্ভুত কবিত্বশক্তিতে মুগ্ধ হয়ে সারারাত কাটিয়ে দিয়েছি কবিগান শুনে। বড়ো হয়েও কবিগান শুনেছি নতুন নতুন দলের। সেসব গান বুঝেছি, তার অন্তর্নিহিত কথা উপলব্ধি করেছি। সখী-সংবাদের একটি গানের কয়েকটি পদ এখনও ভুলতে পারিনি। শ্যামের আগমন প্রতীক্ষায় সেজেগুজে প্রায় সারারাতই কাটিয়ে দিলেন বিনোদিনী রাধা। কৃষ্ণ যখন এলেন শ্ৰীমতীর কুঞ্জদ্বারে তখনকার পরিবেশ এবং তার প্রতিক্রিয়া কী নিখুঁতভাবেই না বর্ণনা করেছেন পুববাংলার কবিয়াল! দুই দলের বাদ-প্রতিবাদ ও হাস্যপরিহাস চলেছে অনেকক্ষণ ধরে। কিন্তু যখনি আরম্ভ হয়েছে তত্ত্বকথা বা অবতরণ করা হয়েছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের, তখনই সমগ্র জনতা হয়ে গেছে একবারে নীরব নিথর। কবি গেয়েছেন,
শ্যাম আসার আশা পেয়ে, সখিগণ সঙ্গে নিয়ে বিনোদিনী
যেমন চাতকিনী পিপাসায়, তৃষিতা জল আশায়
কুঞ্জ সাজায় তেমনি কমলিনী।।
সাজাল রাই ফুলের বাসর, আসবে বলে রসিক নাগর,
আশাতে হয় যামিনী ভোর, হিতে হল বিপরীত।
ফুলের শয্যা সব বিফল হল, অসময়ে চিকণ কালা এল–
রঙ্গদেবী তায় ধারণ করে দ্বারে গিয়ে।
এর পরেই সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে ধুয়া,
ফিরে যাও হে নাগর, প্যারী বিচ্ছেদে হয়ে কাতর
আছে ঘুমাইয়ে।
ফিরে যাও শ্যাম তোমার সম্মান নিয়ে।
এমনি ভাষায় কৃষ্ণকে সতর্ক করে দিয়েই ক্ষান্ত হননি কবি। তিনি মুখের ওপর শ্যামকে আরও কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে তরুণী হত্যার দায়ে ফেলারও ভয় দেখিয়েছেন তিনি, বলেছেন শ্যামসুন্দরকে,
ছিলে কাল নিশীথে যার বাসরে।
বঁধু তারে কেন নিরাশ করে, নিশি শেষে এলে রসময়!
বঁধু প্রেমের অমন ধর্ম নয়।
তুমি জানতে পারো সব প্রত্যক্ষে, দুই প্রেমেতে যেজন দীক্ষে
এক নিশিতে প্রেমের পক্ষে, দুই-এর মন কি রক্ষা হয়।
প্যারী ভাগের প্রেম করবে না, রাগেতে প্রাণ রাখবে না,
এখন মরতে চায় যমুনায় প্রবেশিয়ে।
চাঁদোয়ার নীচে গাঁয়ের মাটিতে বসে এমনি সব কবিগান আর হয়তো শোনবার সুযোগ হবে না কোনোদিন!
‘চৈত্র-সংক্রান্তি’র আগের দিন হরগৌরী নৃত্য ও তার সঙ্গে নানাপ্রকার নাচগান হত। যখন ছোটো ছিলাম, স্কুলে পড়তাম–ওদের মতো আমরাও সং সেজে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াতাম –পয়সা সংগ্রহ করতাম। আর তার সদ্ব্যবহার করতাম চড়ক-পুজোর মেলায়। এ উপলক্ষে ‘চন্দ্রপিকারা’র মেলা কত নামকরাই না ছিল–দূর দূর গ্রাম থেকে কত লোকই না আসত এ মেলায়!
প্রখর গ্রীষ্মের ভীষণতা অসহ্য মনে হত। কিন্তু বর্ষাকালে আমাদের গাঁয়ের চেহারাই যেত পালটে। সমস্ত মাঠ, ঘাট, খেত-খামার জলে থই থই করতে থাকে বর্ষায়। দূর গাঁয়ের জলে ঘেরা পাড়গুলোকে ছোটো ছোটো দ্বীপ বলে ভুল হত। পায়ে-চলা পথ প্রায় সবটাই হয়ে যেত অদৃশ্য। নৌকোই তখন যাতায়াতের একমাত্র বাহন। ধান আর পাটগাছের সবুজ মাথার ওপর দিয়ে যখন মেঠো হাওয়া হুহু করে বয়ে যেত, সান্ধ্য পরিবেশে কী মনোরমই না লাগত সে দৃশ্য! বিকেলে নৌকো করে রোজ বেড়াতে যেতাম আমরা সে পরিবেশ, সে দৃশ্য উপভোগ করতে।
মনসা ভাসান উপলক্ষে শুভাঢ্যা খালের একপ্রান্তে হরির মঠ-সংলগ্ন বিরাট জলাভূমিতে ‘নৌকোবাইচ’ হত ও মেলা বসত। ছোটো-বড়ো সব ধরনের নৌকোই এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করত সুসজ্জিত হয়ে। মাঝি ও দাঁড়িরা তালে তালে বৈঠা ফেলত লোকসংগীতের ঝড় বইত সঙ্গে সঙ্গে। নৌকোয় নৌকোয় ভাসমান মেলাই যেন এক-একটি বসে যেত। তাদের কোনোটাতে থাকত নানা পণ্যসম্ভার, কোনোটাতে ক্রেতা, কোনোটাতে বা দর্শক।
