আকাশে বর্ষার মেঘ, বিচ্ছিন্ন কান্নার সুর। কিন্তু সে-সুরে তো হৃদয় ময়ূরের মতো পেখম বিস্তার করে নাচে না। প্রাসাদের শিখর থেকে কারও কালো চুলের ঢেউ আকাশ ঢেকে ফেলেছে–এ কল্পনাতেও মন তো এগোয় না। আমি দেখতে পাচ্ছি, এই মেঘেরই ছায়া পড়েছে ইছামতীর জলে। তারই তীরে দাঁড়িয়ে জনহীন বিপন্ন খেরুপাড়া গ্রাম। অহল্যার পাষাণ-জীবন তার। মুক্তির অপেক্ষায় চলছে অপমৃত্যুর প্রহর গণনা। তবু কেন জানি না, প্রবল প্রত্যয়ে কবিগুরুর সেই অমৃতময়ী আশার বাণী বার বার মনে আসে,
মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই
এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই।
তেমনি স্থান কি পাব না আমরা?
সংগ্রামের নায়ক নিয়তির সঙ্গে দ্বন্দ্বে পরাজিত হয়েছে। তার রথচক্র গ্রাস করেছে মেদিনী, অন্যায় চক্রান্তে বিপর্যস্ত সে। কিন্তু তার পৌরুষ লুপ্ত হয়নি, বীর্যের বিনাশ নেই, আদর্শ অমর। দিগন্তের নিকষ অন্ধকারে দৃষ্টি চলে, কিন্তু কার যেন পদধ্বনি শোনা যায়! অন্ধকারে যবনিকা থরথর করে কেঁপে ওঠে।
.
ধামগড়
‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে, জয় মা বলে ভাসা তরী’–গানটি কত উৎসবে কতবার যে গেয়েছি তার ঠিক নেই। কবিগুরুর মহাবাণী শুনে প্রাণে শক্তি পেয়েছি সত্য, কিন্তু আমাদেরও যে সর্বস্বত্যাগী হয়ে ‘জয় মা’ বলে এমনিভাবেই তরি ভাসাতে হবে অনির্দিষ্টতার পথে তা আগে কি কোনোদিন ভাবতে পেরেছিলাম? ভারত স্বাধীন হবে, আমরা সুখীসচ্ছল হব, বাঙালির ঘর ভরে উঠবে আবার ধন-ধান্যে, পুজো-পার্বণে–এই স্বপ্নই তো দেখেছি রাত জেগে জেগে! কিন্তু তার বদলে আমরা হলাম নির্বাসিত, অসহায় পাখির মতো বিপদগ্রস্ত।
মনে পড়ছে প্রায় বারোবছর আগে আমাদের গ্রামের এক বাড়িতে একমাত্র পুত্র দেবেন মারা গেলে আমার ঠাকুমা দুঃখ করে বলেছিলেন,–‘আহা, সারদার ভিটেয় আর প্রদীপ দেবার কেউ রইল না!’ কিন্তু আজ সমস্ত পূর্ববাংলার প্রতি হিন্দু-পরিবারে ছেলে থাকতেও প্রায় ভিটেতেই প্রদীপ দেওয়ার কেউ নেই।
নারায়ণগঞ্জ থেকে মাইল তিনেক দূরে আমাদের গ্রাম ধামগড়। স্টিমার বা নৌকো যাতে খুশি যাওয়া যায়। তবে নৌকোতে গেলে দেড় ঘণ্টা আর স্টিমারে গেলে লাগে আধঘণ্টা। ছাত্রাবস্থায় এ দুটোর কোনোটাতেই মন সরত না–সামান্য সময় অপচয়ও ছিল তখন প্রবাসীমনের পক্ষে অসহ্য। বাঁধনছেঁড়া মন মুহূর্তে বাড়ি পৌঁছোবার জন্যে পাগল হয়ে উঠত। স্টিমারে গেলে সারং, সুখানী, ড্রাইভার কর্মচারীদের দেওয়া খাবার জুটত প্রচুর। এ-উপহার জুটত বাবার সম্মানে, তিনি তখন সোনাচোরা ডকের ডাক্তার। তাই ছোটোবাবু (আমি) তাদের আপনার জন, তাকে আদর করার অর্থ তার পিতাকে সম্মান দেখানো। নৌকোতে গেলে যেতাম চারার গোপে। আমাকে দেখামাত্রই জনদশেক মাঝি হুমড়ি খেয়ে এসে দাঁড়াত চারপাশে। তারা সবাই প্রায় মুসলমান। কার নৌকোয় উঠব ভেবে ঠিক করতে পারা যেত না। যাকে প্রত্যাখ্যান করব তারি তো হবে অভিমান! তবুও কেউ কেউ আমার শোচনীয় অবস্থাকে আরও সঙিন করার জন্যেই ছোঁ মেরে নিয়ে যেত বাক্স–বিছানা-সুটকেস। তারপর সমস্বরে আহ্বান জানাত—’আইয়েন ছোড ডাক্তারবাবু আমার নায়ে, ছোত কইরা যাইতে পারবেন!’ পিতার খেতাব আমার কপালে যেন উত্তরাধিকার সূত্রেই জুটেছিল! এরপর কাঁচুমাচু মুখে একজনের নৌকোয় গিয়ে হয়তো উঠতাম–যারা সুটকেস ও বিছানা নিয়ে গিয়েছিল তখন তারা তা হাসিমুখেই ফিরিয়ে দিয়ে যেত সে-নৌকোতে। আমি সাধারণত যার নৌকোয় যেতাম, মনে পড়ে, সে গান গাইত চমৎকার। রসুল মাঝি বলেই সে পরিচিত ছিল। আমাদের কাছে। নৌকো ছেড়ে সে ডান হাতে দাঁড় টানত আর বাঁ-হাতে হুঁকো ধরে টানত কড়া তামাক। তামাক খাওয়া শেষ হলে ছোট্ট একটা কাশির পর উদাত্ত কণ্ঠে গান ধরত সে,
গুরু আর কতদিন থাকবা ফারাক, পাইনা তোমার দ্যাহা,
কত দুঃখ সইলাম দরায়, নাইকো ল্যাহ জোহা।
গুরুভজা রসুলমাঝি গান গেয়ে চলেছে আনমনে একটানা। অপূর্ব পরিবেশের মধ্যে দূরে দেখা যাচ্ছে শীতলক্ষ্যার পুবপাড়ে ঢাকেশ্বরী মিলের চিমনি, বসু গ্লাস ওয়ার্কসের কারখানা। পশ্চিম দিকে পাটের কল দু-নম্বর ঢাকেশ্বরী মিলের চোঙা, লক্ষ্মীনারায়ণ মিল আর চিত্তরঞ্জন মিলের খাড়া-উঠে-যাওয়া চিমনির শ্রেণি অবিরাম ধোঁয়া উদগিরণ করে চলেছে যেন মানুষের ইতিহাসকে কলঙ্কমলিন করার উদ্দেশ্যেই!
আজ বেশি করে মনে পড়ছে রসুল মাঝির ভারি খোলা গলার ভক্তিমূলক সেসব গান। শীতলক্ষ্যার জলে তার দাঁড়ের ছপছপ শব্দ আমাকে যেন অন্য কোনো জগতে নিয়ে যেত। সেদিনকার গোধূলিবেলায় বৈরাগীমন যেমন নিমেষে চলে যেত অন্য জগতে আজ রূঢ় বাস্তবময় পরিবেশে দেহও স্থানান্তরিত হয়েছে অন্যদেশে। চিরদিনের জন্যেই কি হারিয়েছি শীতলক্ষ্যার শান্ত করুণ মিনতিভরা রূপকে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা জননী জন্মভূমিকে!
মাতৃভূমিকে ছেড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফেলে এসেছি সমস্ত ঐশ্বর্য ও সম্পদকে। অকৃত্রিমভাবে বুঝতে পেরেছি স্বাধীনতা আমাদের দেশে পরাধীনতার অভিশাপ নিয়েই দেখা দিয়েছে। অমাবস্যার ঘোর কালরাত্রির মধ্যে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি বলেই জীবনেও দেখা দিয়েছে অমাবস্যার করাল ভয়াল মূর্তি! রাত্রি প্রভাতের কত দেরি কে বলে দেবে? মহামনীষীরা স্তোক দিয়েছেন wait for the morning owl! কিন্তু শীতলক্ষ্যার তীরে আবার পূর্বাকাশের সূর্যোদয়ের রক্তরাগরেখায় গোধূলির দেখা পাব কি না জীবনে কে জানে।
