বিজয়ান্তে একবার হৃদয়ভরে গ্রহণ করা ছিল পূর্ববাংলার চিরাচরিত রীতি। আমার গাঁয়ের তেমনি পরিবেশ আর জীবনে কোনোদিন দেখতে পাব, তা যে কল্পনার অতীত।
আমাদের চন্ডীমন্ডপে প্রতিমা তৈরি হত। একমেটে, দো মেটে, মাজাঘষা–তারপরে রং। পুজোর কাছাকাছি তিনজন কুমোরের অনেক রাত অবধি লণ্ঠন জ্বেলে কাজ চলত। ঘুমের ঘোরে অবস্থা কাহিল হয়ে না পড়া পর্যন্ত ছেলে-মেয়েদের ভিড় কমত না। নানারকম বায়না নিয়ে তারা বসে থাকত।
যোগেন দা, এই যে দেখো, আমার পুরোনো পুতুলটায় একটু রং চড়িয়ে দেবে–তোমার ওই দুর্গার চুড়ার সোনালি রংটা?
আর এই যে আমার ঘোড়াটা যোগেনদা, ঠ্যাংটা ভেঙে গেছে, একটু জুড়ে দাও না ওই এঁটেল মাটি দিয়ে।
যোগেনের কোনোদিকে তাকাবার অবসর নেই, মুখে হু-হ্যাঁ চালিয়ে সে তুলি টানতে থাকত।
এই ছাওয়ালপান, কামের সময় প্যানপ্যান কইরো না।–উঠোনের ওধার থেকে ছেলেদের ধমক দিত ইয়াদ আলি। প্রতিমা-সজ্জা দেখার শখ ছেলেদের অপেক্ষা কিছুমাত্র কম নয় তার। মুসলমানপাড়ার দোর্দন্ড প্রতাপশালী সর্দার সে। পঞ্চাশের ওপরে বয়স। মাথায় কাঁচা-পাকা চুলের বাবরি। প্রচুর পান খেয়ে খেয়ে দাঁতগুলো সে করেছে পাকা তরমুজের বিচির মতো কুচকুচে কালো। চাষাবাদ আর দস্যুবৃত্তি তার উপজীবিকা। মানুষ খুনের ঐতিহ্যবাহী বংশের অধস্তন পুরুষ সে। দু-চারটে লাশ সে নিজেও যে মাটির নীচে পুঁতে দেয়নি এমন নয়।
তুমি চ্যাংড়াদের কথায় কান দিয়ো না পালমশায়, মন লাগিয়ে চিত্তির করো,-ই সব ভগমানের কাম।–যোগেনকে পরামর্শ দিত ইয়াদ আলি। কিন্তু গ্রামে থাকতেই দেখে এসেছি, সে ইয়াদ পালটে গেছে। আনসার বাহিনীর নায়ক সে। হিন্দুর দেবতার নাম মুখেও আনে না, ইসলামের চমৎকার ব্যাখ্যা করে।
চলতি রাজনীতির সঙ্গে এ গ্রামের বরাবরই যোগ ছিল। পোড়োভিটের গভীর জঙ্গলে বেশি রাতে গোপনে মিটিং হত। তারপরেই শুনতে পাওয়া যেত, আট-দশ মাইল দূরে সাহাদের পাটের আড়তের ক্যাশ লুঠ হয়েছে। মহকুমা শহর মানিকগঞ্জ অনুশীলন পার্টির নেতা বিপ্লবী পুলিন দাসের অন্যতম কর্মকেন্দ্র, আর ঢাকেশ্বরী কটন মিলের ভূতপূর্ব ম্যনেজিং ডিরেক্টর রজনী দাস ছিলেন মানিকগঞ্জ শাখার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এ গ্রামের কয়েকটি তরুণ সেখানে নিয়ত যাওয়া-আসা করতেন। সেই সূত্রে আমাদের বাড়ি পুলিশে সার্চ করেছে একাধিক বার; কাকাদের গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। সে-সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যায়াম এবং লাঠিচালনা শিক্ষার সমিতি স্থাপিত হয়েছিল অনুশীলন পার্টির নেতৃত্বে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত সারাবাংলার লাঠিয়ালদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ গ্রামের ছেলে সুধীর দত্ত অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করেছিলেন। দীর্ঘকাল পূর্বে তিনি মারা গেছেন। এ জন্যে আক্ষেপ করি না। সেকালের বিপ্লবীকে আজ শরণার্থীদের মধ্যে দেখতে হচ্ছে না–নিঃসন্দেহে এ সৌভাগ্য নয় কি? বিয়াল্লিশ সালের অগাস্ট মাসেও স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে ছিল এখানে। নিরুদবিগ্ন পল্লিজীবনের অনাবিল শান্তিতে লেগেছিল প্রচন্ড দোলা। গাঁয়ের কাঁচাসড়ক ধরে ভারী বুটের শব্দ করতে করতে আসতে দেখেছি সঙিনধারী পুলিশ।
গ্রামের লোকের, বিশেষত যুবকদের চেষ্টায় গড়ে উঠেছিল প্রকান্ড পাবলিক লাইব্রেরি, থিয়েটারের ‘এভার গ্রিন’ ক্লাব। ক্লাবের ছিল সম্পূর্ণ নিজস্ব ষ্টেজ। প্রতিবছর পুজোর সময় তিন রাত্রি অভিনয় বাঁধা ছিল, এবং অভিনেতারা প্রায় সকলেই ছিলেন ঢাকা কিংবা কলকাতার কলেজের ছাত্র। ক্লাব-লাইব্রেরি যাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁরা জীবনের জটিলতা আর জীবিকার ধাঁধায় জড়িয়ে পড়লে এর নায়কতা এসেছিল আমাদের হাতে। ভবিষ্যতে একদিন হয়তো আমাদের কাছ থেকে কনিষ্ঠদের হাতে উত্তীর্ণ হয়ে যেত এই নেতৃত্ব। কিন্তু তার আগেই যে গ্রাম ভেঙেছে, কে কোথায় ভেসে গিয়েছে জোয়ারের মুখে কে জানে!
গ্রীষ্মকালে চারদিক যখন শুকনো খটখটে, ক্লাবের সভ্যদের উৎসাহে প্রতিবছরই একবার করে সে-সময়ে গ্রামের স্বাস্থ্যোদ্ধার করা হত। পুকুর থেকে, নদী থেকে কচুরিপানা টেনে তুলে শুকিয়ে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিতাম আমরা। সমবেত আক্রমণের মুখে অবাঞ্ছিত ঝোঁপজঙ্গল নিঃশেষ হয়ে যেত। দুর্গম রাস্তা সংস্কারের উদ্দেশ্যে চুপড়ি-কোদাল নিয়ে অভিযান চলত–মাটির বোঝা বইতে গিয়ে টনটন করত আমাদের মাথার চাঁদি।
দু-বছর আগে এক অপরাহ্নে ইছামতী পাড়ি দিয়ে আমার জন্মভূমি খেরুপাড়া ছেড়ে চলে এসেছি। নিজের বাড়ি বিদেশ হয়েছে, ঘরে ফেরার পথে গজিয়েছে বিষাক্ত কাঁটা। এ জীবনে খেরুপাড়ার কালো মাটির পথে বুঝি আমার পায়ের চিহ্ন আর পড়বে না। কিন্তু যদি এ অনুমান ব্যর্থ হয়, কখনো যদি গঙ্গা-পদ্মা ফের নতুন রাখিবন্ধনে বাঁধা পড়ে, তা হলে কি আমি আবার তেমনিভাবে ফিরে পাব আমার সেই হারানো খেরুপাড়াকে?
অবিশ্বাস গাঢ় হয়ে আসে, সংশয়ে দুলতে থাকে মনটা। আশার সার্থকতায় ফিরে পাওয়া গ্রামে পৌঁছোল কেউ যদি হঠাৎ এসে খবর দেয়, ও পাড়ার যারা প্রাণের মায়ায় সীমান্তপারের দেশের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল, মাঝপথ থেকে তাদের আর খবর নেই কিংবা যদি কেউ বলে, পাশের গ্রামের এক অসহায় গৃহস্থ পরিবারের নতুন বউ কোনো উপায় না দেখে একগোলা আফিম মুখে পুরে ঠাকুরের পটের সামনে চুপচাপ মুখ বুজে শুয়েছিল, সে আর উঠে বসেনি–অথবা যদি শুনতে পাই, আমাদেরই প্রতিবেশীর এক কুমারী মেয়ে, আমাদের পুকুরধারের কৃষ্ণচূড়া গাছটা ফাল্গুন মাসে যখন অসংখ্য রক্তমঞ্জরিতে লালে লাল হয়ে ওঠে, তারই ডালে চূড়ান্ত অপমান থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলেছিল, তখন আমার চোখ ফেটে যে জল আসবে, সে কি পুনর্মিলনের আনন্দে? আমি যদি অসহ্য চাঞ্চল্যে পথের ধুলোয় লুটিয়ে পড়ি, তা কি অদৃষ্টের দেবতাকে সকৃতজ্ঞ প্রণাম জানাবার জন্যে? সময়ের গতি দুর্বার, জীবন অস্থির–পদ্মপাতায় জলবিন্দু টলমল। যা হারালাম, যা ফেলে এলাম, অনন্ত-অতীত তাকে গ্রাস করে নিল, কোথাও তার আর সন্ধান মিলবে না।
