সন্ধেবেলায় দেখতাম একহাতে প্রদীপ আর অন্যহাতে ধুনুচি নিয়ে প্রাঙ্গণপাশে তুলসীমঞ্চে মা গলায় আঁচল দিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করছেন। দেবতার কাছে তিনি কী প্রার্থনা করতেন জানি না, কিন্তু আজকের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে স্বচ্ছন্দে বলতে পারি, তাঁর ভীরু হৃদয়ের উজাড় করা প্রণাম এবং প্রার্থনা পূর্ণ হয়নি। জীবনকে বিপদমুক্ত করার সব আবেদনই ব্যর্থ হয়েছে আমাদের। একা একা থাকলেই মনে পড়ে যায়, গ্রামের নিস্তব্ধ দুপুরে জামের ডালের ওপর বসা ঘুঘু দম্পতির একটানা সুর, আজও হয়তো শুনতে পাওয়া যায় সে-সুর, কিন্তু সে ডাকে কটা মানুষের মন সাড়া দেয় এখন?
দুরন্ত দুপুরের ছবি যেন ক্রমাগত চোখের সামনে ভেসে উঠছে আজ। মনে হচ্ছে যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, সামনে সবুজ মাঠের বিস্তীর্ণ ফসল ফলার ছবি। কোনো জমিতে ধানগাছ বাতাসের সঙ্গে মাথা দুলিয়ে নড়ছে সবুজ যৌবনকে চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে, আবার কোনো মাঠে অজস্র পাটচারার সমারোহ। সব খেতে উবু হয়ে বসে মাথায় টোকা দিয়ে খেত নিড়িয়ে দিচ্ছে অখন্ড মনোযোগ সহকারে কৃষকের দল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আবার গানও হচ্ছে–কোহিল ডাইক্কো না ডাইক্কো না এই কদম্ব ডালে। জমি থেকে উঠছে কুন্ডলী কেটে ধোঁয়া, খড় পাকিয়ে লম্বা দড়ি করে গোড়ায় আগুন দেওয়া হয়েছে তামাক খাওয়ার জন্যে। সংকীর্ণ আল দিয়ে হেঁটে চলেছে ক্লান্ত ‘বি’ শিফটে ছুটি পাওয়া শ্রমিকদল। কারুর মাথায় ছাতা, কারুর মাথায় বড়ো বড়ো কচুপাতা! কেউ যাবে রানিঝি, কেউ জাঙাল, কেউ বা পুবদিকের নমশূদ্র পাড়ায়। কারুর গন্তব্যস্থল মালিবাগ কারুর বা আরও দূরে লাঙলবন্ধ। ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমপাড়ে হিন্দুতীর্থ লাঙলবন্ধ খুব কাছে নয়।
ছোটোবেলায় মায়ের সঙ্গে অষ্টমীস্নান করতে কতবার এই লাঙলবন্ধে গিয়েছি। দূরত্ব ছিল মাইল-দুই পথ। গ্রামের গৃহিণীরা যেতেন পাল্কি চেপে, কিন্তু মাকে কোনোদিন পাল্কিতে যেতে দেখিনি। তিনি বলতেন, “এইটুকু পথ চলতে না পেরে পাল্কিতে চড়ে তীর্থ করতে হয় যদি, তাহলে সে-তীর্থের ফল কী? ওরকম তীর্থ করার চেয়ে না করাই ভালো। তাই মুখ কালো করে আমাকেও হাঁটতে হত তাঁর সঙ্গে। মায়ের হাঁটা বড়ো আস্তে, ভোর চারটের সময় যাত্রা করেও তাই আমরা পৌঁছোতাম রোদ উঠে যাওয়ার পরে। আমাকে হাঁটতে হত না বড়ো একটা, কেননা সঙ্গে থাকত দুজন প্রজা। একজন মামুদ আলি আর একজন কালীচরণ। চলার মাঝখানেই হঠাৎ থেমে বিষণ্ণ মুখে মায়ের আঁচল চেপে কাঁদো কাঁদ স্বরে বলতাম—’মা, পা বড্ড কনকন করছে!’ মা জবাব দেওয়ার পূর্বেই চতুর মামুদ আলি বুঝে ফেলত আমার চালাকি। আকর্ণ হাসিকে বিস্তৃত করে মায়ের হয়ে সে-ই বলত—’আইয়ো আইয়ো, তোমার চালাকি বুঝি বুজি না ছোট্টবাবু!’ এই বলে স্বচ্ছন্দে সে তুলে নিত ঘাড়ে।
মাঠে মাঠে রাস্তা কিছু কম, তাই আমরা আল ধরে এগিয়ে যেতাম। দেখতাম অজস্র ভক্ত তীর্থযাত্রী ভক্তির অর্ঘ্য নিয়ে ছুটে চলেছে তীর্থসলিল স্পর্শ করতে। পুণ্যকামী বাঙালির এই চিত্র সর্বত্রই এক। চলতে চলতে চোখে পড়ত শস্যশ্যামলা মাতৃভূমির লুকোনো সম্পদ। ধান-পাট-মেঠোকুমড়োয় মাঠ পরিপূর্ণ, কোথাও লাল লঙ্কায় লালে লাল। মেলার পথে দোকানদাররা নিয়ে চলেছে ধনে-জিরে-তেজপাতার তৈজসপত্র। আবার কারুর মাথায় খই মুড়কি-ডবল বাতাসার গুরুভার। যাত্রীরা এইসব জিনিস কিনে আনবে বাড়ি ফেরার পথে। মামুদের কাঁধে গদিয়ান হয়ে মনটা বেশ স্ফুর্তি-স্ফুর্তিই ঠেকত।
ভোরের বাতাসে ভেসে আসছে মেলার হট্টগোল, খোলের মিঠে আওয়াজ, কীর্তনের অসমাপ্ত কলি। হঠাৎ শুনতে পেলাম দূর থেকে কে যেন হাঁকছে ‘বিশু বাই’ করে। চকিতে ঘাড় ফিরিয়ে দেখি উজ্জ্বল দাঁত বের করে হাসছে গঙ্গা। বাল্যবন্ধু গঙ্গা, সহপাঠী গঙ্গা অবাঙালি গঙ্গা। জন্মেছে আমাদের গ্রামে, বাড়ি মুঙ্গের জেলার এক পল্লিতে। তার বাবা রঙ্গলাল চৌকিদার। গঙ্গার ভাগ্যে কোনোদিন জন্মভূমি দেখার সুযোগ হয়নি, সে আমার গাঁয়েরই ছেলে, তাকে দেখে কাঁধ থেকে নামতে চাইলাম, কিন্তু মামুদ ধমকে বলে উঠল–না ছোটোবাবু আরাইয়া জাইবা, বিরের মইদ্যে লামতে দিমু না– কী করি উঁচু থেকেই গঙ্গার সঙ্গে কথা বলতে বলতে এগিয়ে চললাম। মেলায় পৌঁছে দেখি স্নান সেরে মেয়েরা কাঁখে বা মাথায় নতুন হাঁড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছে। কৌতূহলী শিশু সেদিন জিজ্ঞেস করেছিল কাঁধের ওপর থেকে—’মামুদ ভাই, হাঁড়ির মধ্যে কী নিয়ে যাচ্ছে ওরা?’ মামুদ বিজ্ঞের মতো কমকথায় উত্তর দিয়েছিল—‘পুইন্যি!’
কলকাতার পথে চলতে চলতে শুনতে পাই বেতার শিল্পীদের ভাটিয়ালি, রামপ্রসাদি, বাউল, শ্যামাসংগীত এবং আরও কতরকম ভক্তিমূলক গান। এসব শুনলেই মনটা আকুলি বিকুলি করে ওঠে শৈশবে দেখা কিশোরী বাউলের কথা ভেবে। কিশোরী বাউলের সেই টানাটানা চোখ দুটো, আজও আমাকে সম্মোহিত করে রেখেছে যেন! ভুলতে পারিনি তার সৌম্য-সুন্দর ঢলঢলে মুখখানি। পরনে গেরুয়া, এককাঁধে ঝুলি আর এক কাঁধে সারেঙ্গি। মাসান্তে দেখা পেতাম তার ঠিক দুপুরবেলায়। তার গান শোনার জন্যে উদগ্র হয়ে থাকতাম নির্দিষ্ট দিনে। কিশোরী বাউল তার সারেঙ্গির ওপর ছড় ঘষতে ঘষতে ঢুকত লাল সুরকি-ঢালা পথ বেয়ে। বেরিয়ে বারান্দায় আসার সঙ্গে সঙ্গে কিশোরী প্রণাম করত আমাকে। তারপর একটুখানি বসে গান ধরত—’আলোকের পূর্ণ ছবি আর কতদিন রবে দূরে। আজ কিশোরী কোথায় জানি না, তবে তার সঙ্গে দেখা হতেও পারে একদিন।‘ কারণ কিশোরীই বলেছিল আমাকে—’বাবু, বাংলাদেশের যেখানেই থাকেন না কেন, এই কিশোরীর সঙ্গে আপনাদের দেখা হবেই।‘
