ঝড়ের বেগ শান্ত হয়ে এলে আসত বৃষ্টি-স্নিগ্ধ বড়ো বড়ো ফোঁটায় নামত বছরের প্রথম বর্ষণ। বৃষ্টিধারায় স্নান করতে করতে আমাদের সেই করমচার গানের কোরাস চলত-কচু পাতায় করমচা, যা বৃষ্টি উড়ে যা। ধূলিলিপ্ত গাছপালার প্রসাধন হত সেই জলে। ভেজামাটি থেকে সোঁদা গন্ধ উঠত। চাতকের পিপাসা বুঝি ওতেও মিটত না, কারণ একটু পরেই আবার শোনা যেত-‘ফটিক জল, ফটিক জল’!
প্রতিবছর বৈশাখ মাসে বাংলাদেশের মাঠেমাঠে কে এক রক্তচক্ষু, পিঙ্গলজটা, রুদ্র সন্ন্যাসী বহ্নিমান চিতাপের সম্মুখে বসে শান্তিপাঠ করে যান। তাঁর গম্ভীর উদাত্ত কণ্ঠধ্বনি শুষ্ক দগ্ধ তৃণ-প্রান্তরের ওপর দিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে যায়। তখন জনমানুষের সাড়া পাওয়া যায় না কোথাও, কেবল তন্দ্রাতুর কপোতের ক্লান্তস্বর কোথা থেকে ভেসে এসে যেন সেই গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে মিশে যায়। গ্রীষ্মের মধ্যাহ্নে শান্তিনিকেতনের শুষ্ক মাঠে এই শান্তিপাঠরত সন্ন্যাসীকে একজন দেখেছিলেন–সিদ্ধকবির দিব্যদৃষ্টি ছিল তাঁর। কিন্তু আমিও দেখেছি এঁকে, আমাদের বাড়ির সীমান্তবর্তী দিগন্ত-ছোঁয়া বিস্তীর্ণ বাল্লার মাঠে।
তখন আমার বয়স কত বলতে পারব না। তবে এটুকু বলা চলে, ‘পথের পাঁচালী’-র অপুর মতো তখন আমি, আমার নিজের জগতে একজন মস্ত বড়ো কবি, একজন আবিষ্কারক। কাজেই সেই শিশু আমি, যাকে সিদ্ধকবির সঙ্গে বিনাদ্বিধায় এক-আসনে বসানো চলে।…হ্যাঁ, সেই সন্ন্যাসীর অস্পষ্ট স্মৃতি আমার মনে আছে। দুপুর বেলা বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, মায়ের বুকের ওপর থেকে কাশীরাম দাসের মোটা মহাভারতখানা একপাশে কাত হয়ে নেমে এলে, পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তাম। খেজুর গাছের তলায় দাঁড়িয়ে, সভয় দৃষ্টিতে মাঠের দিকে তাকিয়ে মনে হত, ওই দূরে মাঠের ঠিক মধ্যিখানে কীসের যেন ধোঁয়া–আবছা, অস্পষ্ট–শীতের দিনের কুয়াশার ধূসরতা। কী একটা উধ্বমুখী হয়ে কাঁপছে– ছোটো ছোটো ঢেউ–আগুনের শিখা বুঝি! রোদের মধ্যে মিশে গেছে তা, ভালো করে বোঝা যায় না। তার ও-পাশে বসে কে যেন একজন–ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মূর্তি, দেখা যায় না, চেনা যায় না, কিন্তু অনুমান করতে গিয়ে নিঃসংশয়ে মনে আসে, সে-এক উগ্রদর্শন সন্ন্যাসী, দু চোখে আগুন তাঁর, দয়া নেই, মায়া নেই, ইচ্ছে করলে এই মুহূর্তে যেন ওই চিতার আগুন একলাথি মেরে সমস্ত গ্রামের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে নিমেষে তিনি সব ধ্বংস করে ফেলতে পারেন… ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে থাকতাম, মাথার মধ্যে ঝিমঝিম করত, শরীর শিউরে উঠত মাঝে মাঝে, কিন্তু এক পা নড়তে সাহস পেতাম না। মনে হত, নড়বার চেষ্টা করলেই তিনি টের পেয়ে যাবেন, আর একবার টের পেলে–!
একদিন অমনি দাঁড়িয়ে থাকার সময়ে ঝড় উঠেছিল, কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, সন্ন্যাসী বুঝি খেপে গেছেন কোনো কারণে। বাতাসে শুকনো মাঠের রাঙা ধুলো উড়ছিল। আমি দেখছিলাম চিতার আগুন পা দিয়ে তিনি লন্ডভন্ড করে দিচ্ছেন। চিৎকার করে বারমুখো ছুটতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে বাঁশের কঞ্চির স্থূপের ওপর পড়ে গিয়েছিলাম জ্ঞান হারিয়ে। গলার বাঁ-পাশে অনেকখানি কেটে গিয়েছিল, ক্ষতচিহ্নটা এখনও আছে।
সেসব দিনের ভয়ের কথা মনে পড়লে চোখ সজল হয়ে আসে কেন? ঝাপসা দৃষ্টির সামনে বিস্তীর্ণ বাল্লার মাঠ জলভরা অথই বিলের মতো ছলছলিয়ে ওঠে। আমার ছোটোবেলায় রোজ সন্ধ্যায় আমার গাঁয়ের পোড়োমাঠে আলেয়া জ্বলেছে, ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছটা আগাগোড়া ভয়ের কাঁথা মুড়ি দিয়ে চিরকাল দাঁড়িয়ে থেকেছে, অমাবস্যার রাত্রে কেউ কেউ নাকি নাড়দের পতিত ভিটেয় মেয়েমানুষের হাসি শুনতে পেয়েছে–এসব ভয়-কাহিনি-স্মৃতির দেশে আর একবার যেতে ইচ্ছে করে; মনে হয়, আর একবার বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে হিজলগাছের মাথায় সন্ধের প্রথম তারাটা দেখি, ঝিঁঝির ডাক শুনি বেতের জঙ্গলে।
বর্ষার মেঘান্ধকার বিষণ্ণ দিন কেটে গেলে এসেছে শরৎ। কাস্পিয়ান সাগরের ঘন নীল জল দিয়ে কে যেন ধুয়ে দিত আকাশ। সকাল-বিকেলের রাঙা রোদ তার ওপরে সোনা ছড়াত। মাঠেমাঠে পাকা ধান, সোনালি রং, বৈকুণ্ঠ-লক্ষ্মীর অঙ্গ-আভা যেন। ফসল ভালো হলে মুসলমানরাও বলত, মা লক্ষ্মী এবার ভালো দেছেন গোয়
আমার গাঁয়ে বিলের জলকে ঢেকে রাখত পদ্ম আর শাপলা। খালের পারে, নদীর চরে উচ্ছ্বসিত কাশের বন–সাদা ফেনার সমুদ্র যেন। আশ্বিনের ছুটির বাঁশি বাজত জলে-স্থলে স্টিমারঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে একটির-পর-একটি নৌকো এসে ভিড়ত ইছামতীর পারে। গ্রামভরা লোকজন, ঘরে-ঘরে প্রবাস প্রত্যাগতের আনন্দ কলরব। বাংলাদেশের গ্রাম যে চিররূপময়ী কাব্যের নায়িকা নয় তা জানি। সবুজ মাঠ, সোনালি রোদ, পাখির ডাক, পূর্ণিমা রাত্রির জ্যোৎস্নার জলে ধোয়া আকাশের আড়ালে তার যে ঈর্ষা-নিন্দা-দলাদলি, ক্ষুধা-দারিদ্র অকালমৃত্যু পীড়িত বিকৃত বিকারগ্রস্ত রূপ রয়েছে, তাও মিথ্যে নয়। কিন্তু তবু এই পুজোর দিনে একান্ত নিঃস্বের দরজার সমুখেও আঁকা হয় আলপনা, উঠোনে দাঁড়ালে প্রাণখোলা হাসির সঙ্গে কেউ-না-কেউ এসে হাতে দিয়ে যায় দুটো নারকেল-নলেনগুড়ের মিষ্টি। বিজয়ার দিনে ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে বুকে জড়িয়ে সবাই সবাইকে করে আলিঙ্গন। প্রাত্যহিকতার অজস্র গ্লানি বিস্মৃত হয়ে, দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষের কালো চিহ্নগুলো মন থেকে মুছে ফেলে, সমস্ত পৃথিবীকে
