শাওনের অঝোরঝরা রাতের একটি ছবি মনে জেগে ওঠে। গাঙিনীর জলে হেলেদুলে একটি ভেলা ভেসে চলেছে। তালীবন শেষ হল। সমুখে শুধু জল আর জল। বেহুলার অকম্পিত বুক। মা কাঁদছে, ভাই কাঁদছে, কাঁদছে প্রতিবেশীরা। আর বেহুলার সংকল্পে পরিবর্তন নেই!
মনসা পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে আছে এই বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি। পল্লিকবি জিইয়ে রেখেছেন চাঁদবেনের কথা। ভাসান গানের সুরে সুরে বেহুলার অবাধ অশ্রু আজও উছলে ওঠে। সনকার অশ্রুজলে কত সন্ধ্যায় কত মায়ের বুকও ভিজে যায়।
এ অঞ্চলে বহুল প্রচলিত এই গান। রাতের পর রাত গান চলে। বেহুলা-লখিন্দরের প্রথম পরিচয় থেকে বিদ্রোহী চাঁদের অন্তিম পরাজয় পর্যন্ত। হিন্দু-মুসলমান সমান শরিক সে-গানের। মাখন দাঁ, এমনকী কেদার মুনশিও। বেহুলার অটল সংকল্পে ভাই-এর ব্যথা যখন মূর্ত হয়ে ওঠে এ গানে,
না যাইয়ো না যাইয়ো বইন
শুন লো মোর মানা;
তুমি গেলে বইন লো আমার
মায় যে বাঁচব না।
তখন কতদিন লুঙ্গির কোণে ছাবেদালী ব্যাপারীকে চোখের জল মুছতে দেখেছি। হিদুর ‘কেচ্ছা’ সেদিনও মুসলমানের ‘গুণাহ’ বলে বিবেচিত হয়নি। সনকার অশ্রুর আড়ালে তারা যেন তাদের ব্যক্তিক দুঃখেরই ছবি দেখতে পেয়েছে।
শরতের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। এই সময়টির জন্যে সারাবছর ধরে কী বিপুল প্রতীক্ষা! সে কী আয়োজন! প্রবাসীরা ঘরে ফিরছে। ধলেশ্বরীর কূলে রোজই এসে নতুন নতুন নৌকো লাগছে। আমরা ছেলেরা গিয়ে ভিড় করে দাঁড়িয়েছি। ক-দিনের জন্যে গাঙখালি লোকে ভরপুর। সবার সঙ্গে আবার নতুন করে পরিচয়।
হিন্দুপ্রধান গ্রাম সাভার। পুজো এখানে বেশ কয়েকখানিই হয়। তার মধ্যে দক্ষিণ ও উত্তর পাড়ার বারোয়ারি দুটি প্রধান। আগে উভয়ের মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা হত, প্রতিমা তৈরি থেকে আরম্ভ করে গান-বাজনা নিয়েও। দক্ষিণীরা ঢাকা থেকে কারিগর আনালে, উত্তরেরা বিক্রমপুর পর্যন্ত ছুটত। দক্ষিণীরা তিন রাত গানের ব্যবস্থা করলে, উত্তরেরা নট্ট কোম্পানির যাত্রদলের সঙ্গে পাঁচ রাতের চুক্তি করে বসত। সন্ধে থেকে শুরু করে সারারাত চলত গান। এপাড়া হরিশ্চন্দ্র’ বই নির্বাচন করলে ওপাড়ায় আরম্ভ হয়ে যেত রামচন্দ্র।
ছোটোবেলায় দেখেছি দুর্গা পুজোর মুসলমানের আনন্দ কম নয়। হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের ঘরেও আসত নতুন কাপড়। মুসলমান মেয়েরা পাড়ায় পাড়ায় প্রতিমা দেখে বেড়াত। রং বেরঙের লুঙ্গি পরে গলায় গামছা ঝুলিয়ে এগাঁয়ের সেগাঁয়ের মুসলমানেরা সকাল সকাল ঠাঁই করে নিত যাত্রার আসরে। রামচন্দ্র’ কিংবা হরিশ্চন্দ্র’ পালায় হিন্দুর সঙ্গে তারা সমান ভাবেই হেসেছে ও কেঁদেছে। পূর্ববাংলায় দুর্গাপুজো ঠিক এমনি করেই হয়ে উঠেছিল সর্বজনীন উৎসব।
কোকিল-ডাকা বসন্তে আর একটি উৎসবে এ অঞ্চল মেতে উঠত। এটা যেন সত্যিকারের গণউৎসব। এতে চাষিদেরই উৎসাহ বেশি। ষাট বছরের বুড়ো পাঁচু মন্ডল হলুদবরণ কাপড় পরে পা দুটিতে ঘুঙুর বেঁধে দুলে দুলে নাচতেও লজ্জা করেনি। সারাবছরের দৈন্যেভরা জীবনকে ভুলে তারা যেন কেবল মুঠো মুঠো আনন্দ কুড়িয়েছে।
শিব পুজো বা শিব খাটনাও সাধারণ মানুষের উৎসব। এ অঞ্চলে এর প্রাধান্য কম নয়। অন্তত দশ-বিশ দল তো প্রতিবছরই আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে। শিব ঠাকুরকে মাথায় নিয়ে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষে করেছে এরা। গলায় কয়েকখানি ‘মেডেল’ ঝোলানো ঢাকি হরকেষ্টার ঢাকের তালে তালে বুড়ো-কাঁচায় সমান হয়ে নেচেছে। নাচনার শেষে গান ধরেছে প্রেমানন্দ। উমার গান, নিমাই-সন্ন্যাসের গান। ডান হাতে মাথাটি রেখে প্রেমানন্দ যখন গেয়েছে,
সন্ন্যাসী হইয়ো রে নিমাই
বৈরাগী না হইয়ো,
(ওরে) ঘরে বইসে কৃষ্ণ নামটি
মায়েরে শুনাইয়ো।
তখন মায়ের চোখ দুটি কোন সে ব্যথার অনুভূতিতে যেন টলটল করে উঠেছে।
দিনে ‘খাটনা’, রাতে ‘কাছ’। ‘কাছ’ কথাটি এসময় সম্পূর্ণ এক নতুন অর্থে ব্যবহৃত হয়। নানাপ্রকার রঙ্গরসের ভেতর দিয়ে কাছ’ নাচের পরিসমাপ্তি ঘটে। এ যেন বাংলার আদিম নৃত্য। জনসাধারণের কাছে অসীম এর আবেদন। ছেলেবেলায় মায়ের বকুনি খেয়ে সারারাত্রি জেগে বাড়ি বাড়ি এ ‘কাছ’ দেখে ফিরেছি। মহাদেবঠাকুর যদি তার দীর্ঘ ত্রিশূলটি হাতে নিয়ে দু-একটি কথা বলেছে, তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করেছি। হিংসুটে রাধাবল্লভটা অনুতাপে জ্বলে জ্বলে মরেছে। সে-আনন্দ, সে-অনুভূতি আজও উপলব্ধিতে জাগে। ‘মুখা কাছ’ দুর্লভ শীল আজও মনের নিভৃতে অগোচরে উঁকি দিয়ে যায়। তাদের কি ভুলতে পারি?
কত মধুরই না ছিল সে সন্ধেগুলো। তাল-তমালের ফাঁকে ফাঁকে প্রদীপ জ্বলত, শাঁখ বাজত, কর্মক্লান্ত দিনের শেষে সারা-গাঁ-জুড়ে নেমে আসত একটা নিবিড় প্রশান্তির ছায়া। দোকানি ফিরত হাট থেকে, মাঠ থেকে ফিরত রাখালেরা। সন্ধের আঁধারে তলিয়ে যেত সকল বিচ্ছিন্নতা। নীরব নিথর গ্রামখানি দাঁড়িয়ে থাকত পূজারিনির মতো, একক–একনিষ্ঠ।
যেদিন চাঁদ উঠত আকাশে, সেদিনের আর এক ছবি। ফুলকেয়ারির ফাঁকে ফাঁকে শুরু হত আলো-আঁধারের খেলা। জুই ফুলের গন্ধে বাতাস হত মদির, স্বপ্নময় হয়ে উঠত আমার গাঁখানি।
মেয়েমহলে সেদিন যেন মহোৎসব। সকাল সকাল সান্ধ্য আয়োজন শেষ করে দুর্গাখুড়োর পাকা উঠানে সবাই এসে ভিড় করত। প্রিয়দার বউ আসত কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে, মেরুর মা আসত হাতের চেটোয় ‘সাদা’ গুঁড়ো নিয়ে। এমনকী ফুলী আর সুধী বোন, যারা সূর্যসাক্ষী করে পরস্পরের মুখদর্শন পর্যন্ত বন্ধ করেছিল, তারাও এসে পাশাপাশি মুখ ফিরিয়ে বসে থাকত। হায় রে! সে-নিবিড়তা, সে-মাখামাখি চিরকালের মতোই কি শেষ হল?
