মতি সাধুকে ভুলব না। কীর্তনীয়া মতি সাধু। সারাতল্লাটে বিদেশে তার নামডাক। অমন মধুর কণ্ঠ, অমন ভাবানুভূতির তুলনা খুঁজে পাইনে–আজও যেন মনে লেগে আছে। অমন প্রাণ দিয়ে গান গাওয়া আর কি শুনতে পাব?
গোপাল আখড়া, হরি আখড়া, বড় আখড়া। গাঁয়ের এক-একটি কেন্দ্র এ আখড়া গুলোতে কতদিন মতির গান শুনেছি। জলকেলি, মাথুর প্রভৃতি পালা! হাতে চামর নিয়ে হেলেদুলে গান করেছে মতি সাধু। গলায় ঝোলানো গাঁদা ফুলের মালা এদিক-ওদিক গড়িয়ে পড়েছে। মাথুর পালায় গান ধরেছে সে এই বলে,
সর্ব অঙ্গ খেয়ো রে কাক
না রাখিয়ো বাকি,
কৃষ্ণ দরশন লাগি
রেখো দুটি আঁখি।
দোহারিরা সুর ধরেছে, তাল রেখেছে। তন্ময় হয়ে মতি সাধু শুরু করেছে কথকতা: ওরে কাক, ওরে তমাল-ডালে বসে থাকা কাক! তুমি আমার সর্বাঙ্গ নষ্ট করো। কিন্তু যে কৃষ্ণের বিরহ-ব্যথায় আমি জ্বলে জ্বলে পুড়ে পুড়ে মরছি, সেই নিঠুর কৃষ্ণের দর্শন-অভিলাষী আমার এই আঁখিযুগল কেবল তোমার কাছে ভিক্ষে চাইছি। এ দুটো তুমি বাকি রেখো।
কথকতার পর আবার সুর ধরেছে মতি সাধু,
বাকি রাখিয়ো,
কৃষ্ণ দরশন লাগি
বাকি রাখিয়ো।
খোল বেজেছে। মাথা নেচেছে। তালে তালে পড়েছে করতালি। কিন্তু মনের অজান্তে। আঁখিপল্লব দুটি কখন যে একেবারে ভিজে উঠেছে–কেউ হয়তো টেরও পায়নি।
বাংলা লোকসংস্কৃতির এক বিশিষ্ট অবদান এই কীর্তনগান–শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পল্লির গৃহকোণে বেজে চলেছে এর সুর, এর আবেদন। বাংলার সাধারণ মানুষের উপলব্ধিতেও এ গান সাড়া জাগিয়েছে। কেবলমাত্র রাধাকৃষ্ণের কথা নয়, রামমঙ্গল, নিমাই সন্ন্যাস, এমনি আরও কত গানের মাধ্যমেই না পল্লির জনমানস রস সংগ্রহ করেছে। কত দিন, কত সন্ধ্যায় এরই আবেদনে কুসীদজীবী অধর ঘোষকেও কৈবর্তপাড়ার ভোলানাথের সঙ্গে কোলাকুলি, গলাগলি করতে দেখেছি। হিসেবি মানুষ অখিল সাহাও কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে।
সে-গ্রাম আজ কত দূরে! পদ্মা-মেঘনা পেরিয়ে কোথায় সে ধলেশ্বরী! এত স্মৃতি, এত স্বপ্ন-রঙিন সে-মোহন পরিবেশ থেকে আজ আমি নির্বাসিত। দেশবিভাগের পাপে আমার মতো ছিন্নমূল আরও অনেকে দিগবিদিকে ছড়িয়ে গেছে। ভেঙেছে সমাজ, ভেঙেছে ঘর সংসার। শান্ত সুনিবিড় আমার সে-গাঁখানি আজ বুঝি নির্বাক হয়ে গেছে। পুঁটি পিসিরা কোথায়? অমন অনাবিল স্নেহের উৎসটি আজ কত দূরে! কাজ না-থাকা অলস দুপুরবেলা আজ তো আর কেউ তেমন দরদ দিয়ে ডাকে না, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আজ তো আর কেউ কাছে এসে বসে না। আজ আমি যেন আকাশ থেকে ছিটকেপড়া তারা–স্মৃতির জ্বালায় তিল তিল করে পুড়ে মরছি।
নিশ্চয়ই আমাদের তুলসীতলাটি আজ একেবারে নির্জন। আজ আর সেখানে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে না, কাঁসর-ঘণ্টা বাজে না, সদিবোনের রাধাকৃষ্ণের গানে সান্ধ্য হাওয়াও আর তো সজল হয়ে ওঠে না! পূর্ববাংলার নিভৃতে থাকা আমার সে-গাঁখানি রাতের আঁধারে আজ বুঝি কেবল থমথম-ই করতে থাকে!
ধলেশ্বরী তেমন করেই বয়ে যায় কি? কাশফুলগুলো আজও কি তেমন করেই ফোটে? জ্যোৎস্নাস্নাত বালুচরে রাখালিয়া বাঁশি আজও কি তেমন করেই বেজে ওঠে? গভীর রাতে ঘুম ভেঙে এমনি কত প্রশ্নই না মনে জাগে! চোখের সামনে ভিড় করে আসে ছবির পর ছবি। ব্রহ্মচারীর মাঠ, রজনি সা’র মশান–আরও কত কিছুর কথাই না মনে পড়ে যায়! স্মৃতির জ্বালায় আঁখিপল্লব দুটি বারে বারে ভিজে ওঠে। মনে হয় সে যেন হারিয়ে গেছে। যে ছিল প্রিয়, যে ছিল শ্রেয়, সে যেন আর আমার নয়। আমার স্বপ্নে-থাকা মাটির মাকে মা বলে ডাকবার অধিকারও যেন আজ আমি হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু তার আহ্বানের তো শেষ নেই! আজও যেন সে আমায় ঠিক আগের মতোই ডাকে। স্বপ্ন-শিয়রে ধলেশ্বরী আজও যেন আছড়ে পড়ে হাতছানি দিয়ে ডেকে বলে বার বার–আয়, আয়, ওরে আয়!
.
ধামরাই
আবর্তিত হয়ে চলেছে মহাকালের রথচক্র। সেই রথচক্রের আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রথিত হয়ে আছে মানুষের জীবন। এমনি এক মহাকালের ত্রিকালবিধৃত বিগ্রহরূপের সঙ্গে শৈশবেই পরিচিত হয়েছিলাম আমাদের গ্রামে। ধামরাই-এর মাধব ঠাকুরের রথের সেই ঘূর্ণমান চক্র দেখে মহাকালের চিরপ্রবহমান গতিস্রোতের যে বিশাল ব্যাপ্তি উপলব্ধি করেছিলাম ছোটোবেলায়, সে-স্মৃতি আজও অবিস্মরণীয়। প্রথম দৃষ্টি মেলেই যে গ্রামের মাটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে শৈশব ও যৌবনের দিনগুলো অতিবাহিত করেছিলাম, এক অভাবনীয় ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সে-জন্মভূমি গ্রাম-জননীর মাটি থেকে ছিন্ন হয়ে দূরান্তরের এই জনারণ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেললেও সেদিনের স্মৃতি আজও আমার লক্ষ্যহীন যাযাবর জীবনের ধূলিধূসর মুহূর্তগুলোকে আশার আলোকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। সে-গ্রাম যে আমার জননী।
বংশাই নদীর এক তীরে ধু-ধু করছে প্রান্তর–যতদূর দৃষ্টি যায়, শ্যামল সবুজ। ধান্যশীর্ষগুলো দু-হাত বাড়িয়ে আকাশের দিকে কীসের প্রত্যাশী যেন–মধ্যাহ্ন-সন্ধ্যায় বাতাসে দুলে দুলে শোঁ শোঁ শব্দে কেন যেন বাঁশি বাজায় ওরা। এপারে মল্লিকঘাটের সামনে ঠক-ঠক হাতুড়ি পেটানোর শব্দ-বড়ো বড়ো মালবাহী নৌকো তৈরি চলছে সেখানে। ঘাট থেকে একটি রাস্তা এঁকে-বেঁকে কিছুদূর গিয়ে দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে–একটি গিয়ে মিশেছে বাজারে যাওয়ার সড়কে, আর একটি চলে গেছে তাঁতিপাড়ার দিকে। দ্বিতীয় পথটি ধরে কিছুদূর গেলেই পাঁচিল-ঘেরা বাগান, পেছন দিকে মস্তবড়ো পাকা দোতলা বাড়ি। এ রাস্তার ওপরেই বাড়ির খিড়কি-দোর। সদর দোর বড়ো সড়ক থেকে পুবদিকে বেরিয়ে-আসা একটা গলির ওপর। তামাম দুনিয়ায় এইটেই ছিল আমার মাথা গোঁজবার ঠাঁই। জীবনের এতটা বয়েস এখানেই কেটেছে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে। কোনোদিন দু-মুঠো অন্নের জন্যে কপালে চিন্তার রেখা ঘনিয়ে ওঠেনি। অতিথি এসেছে, কখনো সেবার ত্রুটি হয়নি। আজ আমরাই অতিথি হয়ে পরের অনুগ্রহপ্রার্থী। অদৃষ্টের এ নির্মম পরিহাস!
