সন্ধের ঝিরঝিরে হাওয়ায় নোঙর খুলে পাল তুলেছে মাঝিমাল্লারা। তাদের কলকন্ঠে খিলখিল করে হেসে উঠেছে যেন জ্যোৎস্নাস্নাত নিবিড় আকাশ। দিগন্ত তুলেছে প্রতিধ্বনি। কিশোর মন সন্ধান করেছে মধুমতীর দেশের, ওই বাঁক পেরিয়ে মাঠ ছাড়িয়ে।
কেষ্ট বৈরাগীকে ভুলতে পারি? কত ভোরেই না ঘুম ভেঙেছে তার সুললিত গানের সুরে। মায়ের আঁচল ধরে কতদিনই না বাইরে এসে দাঁড়িয়েছি। ভোরের হাওয়া আমার সর্বাঙ্গ বুলিয়ে গেছে মায়ের স্নেহের মতো। আমার আঁখির আবেদনে আবার নতুন করে গান ধরেছে কেষ্ট,
সখিগো…ওগো প্রাণসখি! এই করিয়ে তোমরা সকলে, না পুড়াইয়ো রাধা অঙ্গ না ভাসাইয়ো জলে, মরিলে বান্ধিয়া রেইখো তমালেরি ডালে…গো।
বিরহিণীর অশ্রুভেজা এ অন্তিম আবেদনে কৈশোরের অবুঝ মনও কেঁদে উঠেছে। কেষ্ট বৈরাগীর মরমি সুর ধলেশ্বরীর পলিমাটির মতোই নরম।
এমনি কত টুকরো টুকরো স্মৃতি আর স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা আমার গ্রাম সাভার, ঢাকা জেলার একটি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। বুকে তার কত শতাব্দীর অক্ষয় ইতিহাস, অতীত সভ্যতার বিলীয়মান কঙ্কাল। এখানে রাজ্য ছিল, রাজা ছিল একদিন, ছিল শিক্ষা আর সংস্কৃতির প্রাণবান প্রবাহ। এ দেশের বাণী সেদিন পৌঁছোত দূরদূরান্তে…হিমালয়ের শিখরচূড়া পেরিয়ে। দীপংকরের জ্ঞানের প্রদীপ এখানেই প্রথম জ্বলেছিল–গুরুগৃহে তাঁর শিক্ষা শুরু হয়েছিল এখানে। সেদিনের সাভার ছিল সর্বেশ্বর নগরী, রাজা হরিশ্চন্দ্র পালের রাজধানী, সর্ব-ঐশ্বর্যে মন্ডিত। বৌদ্ধধর্মের বন্যা নেমেছিল এর দিকে দিকে। ধর্মরাজিকা কত বিহার মাথা তুলেছিল এ অঞ্চল ঘিরে। কত ভক্তমনের অন্দরমহলে ঠাঁই করে নিয়েছিল সর্বেশ্বর নগরী…আমার সাভার।
সেদিনের স্মৃতি আজও নিঃশেষ হয়নি। বাজাসনে’ আজ রাজার আসন না থাকলেও সে গৌরবময় দিনের কত স্বপ্ন-কথা এর মাটির অঙ্কে অঙ্কিত রয়েছে। সেদিনের কত অস্পষ্ট স্বাক্ষর দিকে দিকে আজও বর্তমান। কর্ণপাড়ার ভগ্নস্তূপ, ‘বাজাসন’ রাজপ্রাসাদের শেষচিহ্ন কোটবাড়ি আজও তো পথচারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আমরাও কি আর কম ঘুরেছি? কতদিন, কত কাঠফাটা রোদ্দুরে বাড়ি থেকে পালিয়েছি দল বেঁধে। একটা নতুন কিছু যেন আবিষ্কারের ইচ্ছে। দুধসাগর, নিরেমিষ, লালদিঘি এমনি কত পুকুরের ধারে ধারেই না সারাটাবেলা কেটেছে। রবীন্দ্রনাথের সেই খ্যাপার মতো আমরা যেন করে ফিরেছি সেই পরশমণির অনুসন্ধান। আমগাছের ছায়ায় বসে বসে ডাক দিয়েছি রমজানকে, আজমত শেখকে। বাজাসনের এখানে-ওখানে আজ ওদেরই উপনিবেশ। দুধে ধোয়া সাদা-বাবরি নেড়ে রমজান বলেছে কত গল্প, কত পুকুরের ইতিবৃত্ত; ‘নিরামিষ্যিতে মাছ থাহে না কর্তা, ওডা রাজার মা’র পুকৈর।–অবাক হয়েছি। বোবার মতো চেয়ে রয়েছি রমজানের দিকে। কোদাল ধোয়ার ইতিহাস বলেছে রমজান, কোটরাগত চোখ দুটো টেনে টেনে। ওটাই নাকি রাজা হরিশের শেষ পুকুর। শত পুকুর শেষ করে ওখানেই নাকি কর্মীরা কোদাল ধুয়ে উঠেছিল–রমজান তার নানার কাছে থেকে শুনেছে সেসব কথা। সেদিন রমজানের কোনো কথাই অবিশ্বাস করিনি। সাভারের এপাশে-ওপাশে ছড়িয়ে থাকা শত শত পুকুর দেখে বুড়ো রমজানের কথা সত্যি বলেই মনে হয়েছে।
আজ আরও কত কথাই না মনে পড়ে। স্মৃতির মণিকোঠায় বিগত দিনের কত ছবিই না। জ্বলজ্বল করে ওঠে। যখন ভাবি, কিশোরবেলার স্বপ্ন-ছাওয়া সে গ্রামখানি থেকে কত দূরে সরে এসেছি, যখন মনে হয় দেশবিভাগের পাপে আত্মার আত্মীয় সে-গাঁখানি আমার আজকে বুঝি পর হয়ে গেল, তখন সজল চোখের আরশি দু-খানি কত বিচিত্রতর ছবিতেই না ভরে ওঠে! গত দিনের কত কথা ও কাহিনি মনের দোরে এসে বারে বারে ঘা মেরে যায়।
মনে পড়ে নববর্ষের কথা। বৈশাখের রুদ্রদূত নতুনের জয়পত্র নিয়ে আসে। সারাগাঁয়ে পড়ে যায় সাড়া। দোকানিদের দোকানগুলো ফুলেপাতায় সেজেগুজে নতুনকে জানায় অভ্যর্থনা। গাঁয়ের মেঠোপথ মুখর হয়ে ওঠে আনন্দপাগল ছেলে-ছোকরাদের কলকন্ঠে। অপূর্ব হয়ে ওঠে সারা গাঁখানি! অপূর্ব মনে হয় জীবনের স্বাদ।
বিকেলের দিকে মেলা বসে। পাঠানবাড়ির বটের ছায়ায়। নমপাড়ার হীরু সর্দার, বক্তারপুরের জনব আলিরা শুরু করে ছড়ি খেলা। আগ্রহাকুল দর্শকেরা ভিড় করে থাকে চারপাশে। প্রতি বছর প্রতি বৈশাখের প্রথম দিনটি এমনি কত সর্দারের ছড়ির প্যাঁচেই না হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত! বিজয়ীর সর্বাঙ্গে কতজনেরই না উৎসুক দৃষ্টি পিছলে পড়ে!
হীরু সর্দারের নাম আছে। ঝাঁকড়া চুলে ঝাঁকুনি মেরে সে যখন ছড়ি নিয়ে দাঁড়ায় তখন তাকে নতুন মানুষ বলে মনে হয়। দিঘল দুটি চোখ থেকে ঠিকরে পড়ে আগুনে দৃষ্টি। নিশ্বাসের তালে তালে বুকের পাটাও যেন ফুলে ফুলে ওঠে। হেই…হেই…সামাল..সামাল..শব্দ করে তিড়িং করে লাফ দিয়ে ওঠে হীরু সর্দার। পায়ের তলায় মাটি যেন একেবারে কেঁপে ওঠে। উৎসুক জনতার অজস্র করতালির ভেতর খেলা শেষ করে কোমরের গামছা খুলে হীরু বাতাস করতে থাকে। গাঁয়ের মেয়েরা আড়চোখে দেখে যায়।
বর্ষা নেমে আসে। শাওনের ঢল নামে গাঙে। নবযৌবনা ধলেশ্বরী আপন গরবে ফুলে ওঠে। ওপারের কাশবন ডুবে যায়। মজেযাওয়া খালগুলো ছল ছল করে ছোটে; চাষিপাড়ার এক একটি কুটিরকে এক-একটি দ্বীপের মতো দেখায়।
