মন্বন্তর সর্বভুক সরীসৃপের মতো গ্রাস করে নিচ্ছিল গ্রাম-হৃদয় বাংলার জীবন। মনের টানে আমাদের সামান্য প্রচেষ্টা নিয়ে সেদিন গিয়েছিলাম গ্রামে। খবর শুনে এলেন এক মাস্টারমশাই। বললেন, মনে রেখেছ বাবা গ্রামকে? গ্রাম যে যায়। আমরা শিক্ষক। আমাদের আর কী আছে, তোমরা ছাত্ররাই আমাদের যা-কিছু সম্পদ। আনন্দে যেন উচ্ছল হয়ে উঠলেন তিনি। আমার স্কুলজীবনের উত্তর-তিরিশের আধা-প্রৌঢ় গুরুমশাইয়ের চোখে-মুখে বার্ধক্যের নামাবলি। সবগুলো চুল গেছে পেকে। সময় যে নিঃশব্দ চরণে এগিয়ে চলেছে এ তারই স্বাক্ষর।
তারপর চলে গেল আরও কত বছর। নাড়ির টানে বার বার ছুটে গিয়েছি গ্রামে। তার মায়ের মতো স্নেহস্পর্শে অবুঝ হয়ে উঠেছে মন। দূর গ্রামের মুসলমানদের এক মেয়ে, ডাকতাম তাকে মধুপিসি বলে। কেউ নাকি ছিল না তার। প্রায়ই আসত আমাদের বাড়ি। আমরাই তার সব, একথা যে কতবার সে আমাদের বলেছে তার লেখাজোখা নেই। কোনোদিন মনে হয়নি মধুপিসি মুসলমান। নিজের বাড়ির এটা-ওটা, মাঠের ফল-মূল-শাক প্রায়ই সে নিয়ে আসত আমাদের জন্যে। আগ্রহে পরমানন্দে মধুপিসির দেওয়া সেসব জিনিস গ্রহণ করতাম।
শুধু কি এই? একদল বিহারি দেহাতি মানুষ–প্রতিবছর পুববাংলার পল্লিতে পল্লিতে যারা এসে সাময়িক আস্তানা গাড়ে, তার একটা বড়ো অংশ একরকম পাকাপাকিভাবেই রয়ে গিয়েছিল এই গ্রামে; আমাদের গ্রামের মানুষই হয়ে গিয়েছিল তারা–আমাদের সঙ্গে একাত্মা। তারা ডুলি-পালকি বইত, অনেকে এমনি আর সব কাজকর্মে রুটি জোগাত নিজেদের। অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট রায়বাহাদুরের বাঁধা পালকি ছিল একটা। তাঁর চারজন বেহারাও ছিল নির্দিষ্ট। তারাই ছিল গ্রামের বিহারিদের মোড়ল। আজও কি তারা আমার গ্রামে আছে?
আমার সোনার গ্রাম! সিদ্ধা যোগিনী বরদার নাম-মহিমায় মহিমান্বিত এ গ্রাম। সংস্কৃত শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ছিল এক সময় এ জনপদ। গোবিন্দ বেদাধ্যায়ী, প্রসন্ন তর্করত্ন, শশিভূষণ স্মৃতিরত্ন, শ্রীনাথ শিরোমণি ও দ্বারিকানাথ তর্কভূষণ প্রমুখ ভারত-খ্যাত পন্ডিতেরা এ গ্রামেরই সন্তান। আমার গাঁয়েরই নাহাপাড়ায় জন্মেছিলেন লোককবি আনন্দচন্দ্র মিত্র। আনন্দচন্দ্রের হেলেনাকাব্য, মিত্ৰকাব্য, বিবিধ সংগীত প্রভৃতি রচনা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। বড়ো দুঃখেই কবি গেয়েছিলেন–
(এসব) দেখে শুনে এ দুর্দিনে বল মা তারা, যাই কোথা?
মিলে যত ভন্ড ষন্ড দেশটা করলে লন্ডভন্ড;
ধর্মকর্ম থোকার টাটি, (যত) বদমায়েসির ফাঁদ পাতা!
… … … … …
না জানি কি কপাল দোষে হতভাগ্য বঙ্গদেশে
পশুর বেশে অসুর সৃষ্টি কল্লে দারুণ বিধাতা!
দেশ হয়েছে আস্ত নরক! একদিনেতে এসে মড়ক,
গো-বসন্তে উজাড় করলে তবে যায় মনের ব্যথা!!
প্রায় এক-শো বছর আগের বাংলাদেশের অবস্থায় যে কবির কোমল প্রাণে দেখা দিয়েছিল এমনি মর্মপীড়া, আজকের হতভাগ্য বাঙালির অবস্থা দেখতে হলে কী করে তা সহ্য করতেন কবি, তা কি আমরা কল্পনাও করতে পারি?
‘জাতের নামে বজ্জাতি’ যারা করে, তীব্র কশাঘাতে তাদের সংশোধনের কত চেষ্টাই না করেছেন চারণ-সম্রাট মুকুন্দ দাস! তাঁর যাত্রাগানের কথা বাঙালি কি ভুলতে পারে কোনোদিন? ছোটোবেলায় আমাদের গাঁয়েই শুনেছি তাঁর কত পালাগান। বাঙালির অধঃপতনে তাঁরও খেদের অন্ত নেই। তিনিও গেয়েছেন–
মানুষ নাই দেশে
সকল মেকি সকল ফাঁকি, যে যার মজে আপন রসে।
আর তারই প্রতিফল আমরা আজ ভোগ করছি হাতে হাতে। চারণ-সম্রাট আজ আর বেঁচে নেই, তাঁর জন্মগ্রাম বিক্রমপুরের বানারিও কীর্তিনাশা পদ্মার গর্ভে। তার জন্যে দুঃখ করার আর কী আছে! সারা পুববাংলা ছাড়াই তো আমরা। রাজা রাজবল্লভের রাজনগর আর চাঁদ রায়-কেদার রায়ের রাজবাড়ি গ্রাস করেই তো পদ্মা নাম নিয়েছে কীর্তিনাশা পদ্মার কবল থেকে রক্ষা পেলেও পাকিস্তানের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার তো উপায় ছিল না। আজ তাই তো ভাবি, আমার গ্রাম যে থেকেও নেই। সে না-থাকার ব্যথা যে আরও দুঃসহ!।
যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন সারাভারতের মুক্তির সাধনায় সর্বত্যাগী, তাঁর পিতৃপুরুষের বাসভূমি আমার গাঁয়ের অদূরবর্তী তেলিরবাগ গ্রাম স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত নয়–সে পুণ্যক্ষেত্র আজ বিদেশে, বিদেশির শাসনাধিকারে, এ ভাবতেও শরীর শিউরে ওঠে। কিন্তু কী হবে ভেবে?
কে জানত এমনি করে ছেড়ে আসতে হবে গ্রামকে। শরণার্থী পরিজন পরিবেশে এই মহানগরীর এক প্রান্তে সংকোচে আজ দিন কাটাই। তবু আশা জাগে, আজ যে দেশ দূর, দুঃশাসনের হাত থেকে সে-দেশকে, সোনার বাংলার হৃৎপিন্ড সে-বিক্রমপুরকে একদিন ফিরে পাব আমার মনের কাছে।
.
সাভার
প্রতি অঙ্গে সে-গাঁয়ের স্পর্শ। বড়ো মিঠে. বড়ো মধুর। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ওখানেই তো চলতে শিখেছি। ওরই হিজলতলায়, পদ্মবিলে, ধলেশ্বরীর উচ্ছল স্রোতে সারাশৈশবটা কেটেছে। বুধু পন্ডিতের পাঠশালা, বুড়ো বটের দিঘল জটা কত স্মৃতির মাধুর্যেই না মধুময়!
ময়ূরপঙ্খির গল্প শুনতে কতদিনই না বসেছি ধলেশ্বরীর ধারে। সন্ধে নেমেছে। চাঁদ উঠেছে কালো গাঁয়ের মাথায়। শত মুক্তোর প্রাচুর্য নিয়ে মাতাল হয়েছে ধলেশ্বরী। এক চাঁদ শত চাঁদ হয়ে আছড়ে পড়েছে ঢেউয়ের দোলায়। চেয়ে রয়েছি, কেবল চেয়ে থেকেছি।
