কলকাতা-খুলনা রেললাইনে যশোহর জেলার ঝিকরগাছা স্টেশন কোনোদিন দেখেছেন? ঝিকরগাছা এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ স্টেশন। সুদীর্ঘ সুরকির প্ল্যাটফর্ম, সন্ধ্যার নরম অন্ধকারে ট্রেনটি গিয়ে পৌঁছেলেই গ্রামের গন্ধ পাওয়া যায়। পাশেই স্বচ্ছসলিল কপোতাক্ষ নদ। ঝিকরগাছা থেকে চার মাইল দূরে এনদের এপারে আমার গ্রাম অমৃতবাজার। অমৃতবাজারের পূর্বনাম পলুয়া-মাগুরা। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে নদিয়া জেলার হাঁসখালি গ্রাম থেকে মহাত্মা শিশিরকুমার ঘোষের পূর্বপুরুষরা এ গ্রামে চলে আসেন বসবাস করবার জন্যে।
বাংলায় তখন ইস্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য। এই সুযোগে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে যশোহর জেলায় নীলকুঠিয়াল সাহেবদের অবাধ অত্যাচারে বাংলার চাষি সম্প্রদায় মুমূর্ষুপ্রায়। কুঠিয়ালদের এই অত্যাচারের নিখুঁত চিত্র সাহিত্যে রূপায়িত করলেন নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র তাঁর নীলদর্পণ-এ। চাঞ্চল্য জাগল সারাদেশে। বাংলার অত্যাচারিত কৃষক-জনসাধারণের দুঃখদুর্দশার কথা স্মরণ করে তাদের দাবি জানাবার ভার গ্রহণ করলেন শিশিরকুমার। তিনি নিজের গ্রামের ক্ষুদ্র কুটির থেকে অমৃতবাজার পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। পলুয়া-মাগুরার নূতন নামকরণ হল ‘অমৃতবাজার’! আমার জন্মভূমি অমৃতবাজার। জনসাধারণের মুখপত্ররূপে অমৃতবাজার পত্রিকার সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকাটিকে জাতির প্রাণকেন্দ্র কলকাতায় স্থানান্তরিত করতে হল। কিন্তু বাংলার এক নিভৃত কোণে এই গ্রামে আজকের বিশ্ববিশ্রুত অমৃতবাজার পত্রিকার সূতিকাগৃহের প্রাচীন স্মৃতির সাক্ষ্য এখনও বর্তমান।
গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবহমান কপোতাক্ষ, তারই হাত ধরাধরি করে চলেছে চৌগাছা রোড। নদীর সমান্তরালে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে শিশিরকুমার দাঁতব্য চিকিৎসালয়, শ্ৰীশ্ৰীসিদ্ধেশ্বরী বাড়ি, হরিসভা-ভবন ইত্যাদি। মহাত্মা শিশিরকুমারের কৃতী সন্তান তুষারকান্তি ঘোষের প্রচেষ্টায় ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে এই দাঁতব্য চিকিৎসালয় স্থাপিত হয় আর্ত দরিদ্র জনসাধারণের সেবার জন্যে। চিকিৎসালয়ের অনতিদূরেই পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে ‘পীযূষ পয়োধি। সকাল, সন্ধ্যায় সে সরোবরের ঘাটে গ্রামবাসীদের ভিড় জমে।
প্রকৃতির মায়া-মালঞ্চ অমৃতবাজার গ্রাম। কপোতাক্ষের বুকে দেশ-বিদেশের পণ্যসম্ভার নিয়ে মাঝিমাল্লারা সারি গেয়ে চলেছে ‘হেইয়ে হেরো, হেইয়ে হেয়োলগি ঠেলে গুড় বোঝাই দু-হাজার মনি নৌকা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। সুরটা কানে এসে বাজছে। চৌগাছা সড়ক দিয়ে গোরুর গাড়ি চলেছে ক্যাঁচক্যাঁচ। রাস্তার দু-ধারে শাল, সেগুন, তাল, কৃষ্ণচূড়া, নিম, নিশুন্দি গাছের সারি। পীযূষ-পয়োধির তীরে গন্ধরাজ, চামেলি, হেনা আর ভাঁটফুলের গন্ধে বিভোর হাওয়া-বাতাস।
দক্ষিণে ধু-ধু করে ধান-কড়াইয়ের খেত। দূরে দেখা যায় দেওয়ানগঞ্জ, ঝিকরগাছা বন্দর আর তার ঝুলন-সেতু। পূর্ব দিকে বিশাল বিল ‘ডাইয়া’। ডাইয়া’ বিল সত্য সত্যই দর্শনীয়। তার গভীর জলে মৎস্যকন্যার রূপকথার দেশ। যশুরে কইমাছও মেলে প্রচুর। শিকারিদের প্রমোদস্থান এ বিল। ধান পাকার প্রাক্কালে অসংখ্য পাহাড় আর সামুদ্রিক পাখি আসে ঝাঁকে ঝাঁকে। কলকাতা থেকে ফিরিঙ্গি শিকারিরা ও পক্ষী ব্যাবসায়ীরা বন্দুক ও ফাঁদ নিয়ে আসে শিকারে। সাদা-কালো-ধূসর তাঁবুতে ছেয়ে যায় গাঁয়ের আশপাশ। সাহেব শিকারিরা খুবই দিলদরিয়া। শিকার সন্ধানে এসে বেশ দু-পয়সা খরচা করে যায় তারা। গ্রামবাসীদেরও কিছু অর্থাগম হয় এই মরশুমে।
গ্রামের মধ্যে শ্রীশ্রীকালীমাতার একটি বিগ্রহ আছে। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস তিনি নাকি জাগ্রত। জাতিধর্মনির্বিশেষে হিন্দু-মুসলমান সকলকেই এই কালীমাতার কাছে পুজো দিতে দেখেছি। আগে নাকি এই পীঠস্থান কপোতাক্ষের কূলে অবস্থিত ছিল। কালের গতিতে ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তনের ফলে এই নদী বর্তমানে অনেকখানি পশ্চিম দিকে সরে গেছে।
বহু জাতের বাস এই গ্রামে। কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ডাক্তার, কবিরাজ, কবিয়াল, লাঠিয়াল, কীর্তনীয়া, মৌলবি, পটুয়া, কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। গ্রামটি বহু পাড়ায় বিভক্ত। হিন্দু পল্লিতে মজুমদার, বিশ্বাস, সেন, মিত্র, ঘোষ ইত্যাদি; বহু পাড়ার মতন মুসলমান পল্লিতেও কাজী, বেহারা, সর্দার, মোল্লা, পাঠান ইত্যাদি পাড়া রয়েছে। হিন্দু মুসলমানে কোনোদিন বিদ্বেষের ভাব ছিল না। হিন্দুর পুজো-পার্বণে, তার দুর্গোৎসবে, চড়ক পুজোয় মুসলমান ভাইরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। ভাই-ভাই রূপেই বাস করেছে তারা। একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে হিন্দু-মুসলমান সকলেই গ্রামের উন্নতির জন্যে আত্মনিয়োগ করে এসেছে। হিন্দু চাষি ছিল মুসলমান চাষির দরদি ভাই, মুসলমানেরাও সুখে দুঃখে হিন্দুদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। গ্রামবাসী হিন্দু-মুসলমান দৃঢ়কণ্ঠে একটি সত্যই ঘোষণা করে এসেছে–
রাম রহিম না জুদা কর ভাই
দিলটা সাচ্চা রাখো জী।
কালচক্রে আজ রাম রহিম কী করে যে জুদা হয়ে গেল তাই ভাবি। মাটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িত ছিল যে মানুষ, যে চাষি, তারা আজ কোথায়, কোন দেশে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়েছে কে জানে? এই গ্রামেরই কৃষাণ-বধূদের গান গাইতে শুনেছি–
