মাটি আমার স্বামী-পুত,
মাটি আমার প্রাণ;
মাটির দৌলতে এবার
গড়িয়ে নিব কান।
এই চাষিদের জন্যে ধান বিলিয়ে দিতেন মহাজন মহেশ কুন্ডু। হিন্দু-মুসলমান কৃষক। সকলেই তাঁকে ডাকত ‘ধানিদাদা বলে।
পাশের গ্রাম ছুটিপুরে পুজোর সময় বসত মেলা। দূর-দূরান্তর থেকে গ্রামবাসীরা আসত এই মেলায়। বিজয়ার দিন নদীতে নৌকাবাইচ দেখতেও বহু দর্শনার্থীর সমাবেশ হত।
গ্রামে শখের যাত্রার দল ও নাট্য-সমিতি গঠিত হয়েছিল। পুজো-পার্বণে গ্রামবাসীদের আনন্দানুষ্ঠানের সময় এদের ডাক পড়ত।
গ্রামের উত্তরে পলুয়া মহম্মদপুর, মুসলমানপ্রধান গ্রাম। ধীরে ধীরে সে-গ্রামের অনেকেই এসে অমৃতবাজারে বসতি স্থাপন করেছিল। নদীর ওপারে ‘বোধখানা’ ও ‘গঙ্গানন্দপুর’। গঙ্গানন্দপুর একটি শিক্ষিত উন্নতিশীল গ্রাম। এ গ্রামের মদনমোহনের মন্দির বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
সব কিছু মিলিয়েই একটি সুন্দর গ্রাম অমৃতবাজার। এ গ্রামের নামাঙ্কিত সংবাদপত্র আজ বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে। তুলসীতলার প্রদীপের মৃদু আলোয় ঘেরা সেই গ্রাম তেমনই নীরবে নিভৃতে তার অধিবাসীদের মনে শান্তি ও আশা সঞ্চার করে আসছিল। গ্রাম নিয়েই তাদের সুখ, দুঃখের দিনে গ্রামই ছিল তাদের সান্ত্বনা। আমিও সেই হাজার হাজার গ্রামবাসীরই একজন। রাজনীতির পাকচক্রে কেমন করে যে সে-গ্রামকে ছেড়ে আসতে হল জানি না, জানলেও সে মর্মন্তুদ কাহিনি বর্ণনার ভাষা আমার নেই। গ্রাম ছাড়ব, একথা ভাবতে মন চায়নি। তবু ছেড়ে আসতে হল। বিদায়ের দিন তুলসীতলায়, ঠাকুরঘরে, এমনকী গোয়ালদোরে শেষপ্রণাম জানাল সবাই। বৃদ্ধা পিসিমা ঠাকুরঘরের দোর ছাড়তে চাইলেন না, পিসিমার চোখের জলে সজল ও করুণ মুহূর্তে আমারও মন ভিজে গেল। পূর্বপুরুষদের বহুস্মৃতিবিজড়িত যে গ্রাম আমার কাছে তীর্থস্বরূপ, সেই গ্রামজননীর উদ্দেশ্যে শেষসন্ধ্যায় একটি সশ্রদ্ধ প্রণাম রেখে যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হলাম। পায়ে-হাঁটা পথে এগিয়ে চলেছি, মন পড়ে রয়েছে পেছনে। সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, তবু জন্মভূমির আশা লোপ পায়নি। মন বলছে, এ মেঘের অন্তরালেই রয়েছে সূর্যকরোজ্জ্বল উদার নীলাকাশ। কিন্তু সে-দিগন্ত আর কতদূর?
.
সিঙ্গিয়া
ছায়াচ্ছন্ন সমুদ্রের মতোই সীমান্ত-ছোঁয়া রাত্রির মায়া ঘনিয়ে আসে নিঃশব্দে। নিঃসীম নিস্তব্ধতা চারিদিকে–সৃষ্টি যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে আছে অনাগতের অবগুণ্ঠন উন্মোচনের ব্যাকুলতা নিয়ে। প্রতীক্ষা-ক্লান্ত মুহূর্তগুলি আপনা হতেই ভারী হয়ে ওঠে। দিগন্তপ্রসারী এই অচঞ্চল স্তব্ধতার মাঝে, অন্ধকারের বুক চিরে পুরী এক্সপ্রেস ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলে তীর্যক গতিতে–গোটা পৃথিবীর জীবন-শক্তিকে যেন ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে সে।
ধূলি ধূসর কাঁচের জানালার ভেতর দিয়ে তাকিয়ে আছি বাইরে–কত গ্রাম, কত প্রান্তর, কত বনছায়া একে একে সরে যায় চোখের সমুখ দিয়ে, কিছুই দাগ কাটে না মনে। অজানা শঙ্কায়, দুর্নিবার সংশয়ে মন আন্দোলিত হতে থাকে। আজন্মের চেনা পরিবেশ ছেড়ে গৃহহারা আমরা বেরিয়েছি পথে–নতুন ঘরের সন্ধানে, ঠাঁই খুঁজে নিতে দেশ-দেশান্তরে। বাস্তুহারা জীবনে সুদূরের আহ্বান, চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছায়া–দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে।
সহসা আলোর শিখায় কাঁপন লাগে। স্টেশন অতিক্রমের সাংকেতিক ধ্বনি মুখর হয়ে ওঠে –শূন্য মন্দিরে বাঁশির তীক্ষ্ণ সুর বড়ো বেসুরে বাজে। গতির আনন্দ ভুলে যাই। পুঞ্জীভূত চিন্তারাশির জটলা জটিল হয়ে ওঠে। ভীরু মন পিছনপানে ফিরে চায় নিতান্তই অসহায়ের মতো।
বনানীর অন্তরালে অপসৃয়মান অচেনা গ্রামগুলির মতোই ফেলে-আসা জীবনের বিস্মৃত কাহিনি ছায়া ফেলে মনের পাতায়, সুখ-দুঃখের স্মৃতিবিজড়িত ছিন্ন-বন্ধন গ্রামখানি তাজা ফুলের হাসির মতোই ভেসে ওঠে চোখের তারায়। অতীতের পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ ম্লান হয়ে আসে, একটা অনিশ্চয়তা মিয়মাণ করে তোলে মনকে–জীবনের জয় প্রতিষ্ঠার অহংকার নিষ্প্রভ হয়ে আসে।
আমাদের নতুন পরিচয়–এপারে শরণার্থী, ওপারে পরবাসী। স্বাধীনতার সৈনিকদের জীবনে এ এক মর্মান্তিক পরিহাস। শরণার্থী হিসাবে অনুকম্পার পাত্র হতে ঘৃণা জাগে, ব্যথা ঘনায় মনে। আর পরবাসী? সে-কথা ভাবতেও মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে–নিষ্ফল আক্রোশে গুমরে গুমরে মরে। স্বার্থোদ্ধত অবিচার বেদনাকে পরিহাস করে। প্রশ্ন জাগে, কেন এমন হয়?
সেদিনও তো দ্বন্দ্ব ছিল, কলহ ছিল, বিরোধ ছিল, কিন্তু পুঞ্জীভূত মালিন্য তো আবহাওয়াকে এমন বিষিয়ে তোলেনি, এমন অব্যক্ত বেদনার সৃষ্টি করেনি। স্বার্থে স্বার্থে অপরিহার্য সংঘাত কোনোদিন যৌথ পরিবারের পারিপার্শ্বিকতা অতিক্রম করেনি। বিরোধ বিসংবাদে আত্মীয়তার সীমা লঙ্ঘিত হয়নি। বাংলার আর পাঁচখানা গ্রামের মতোই আমাদের গ্রামেও হিন্দু-মুসলমান পরস্পরকে আপন জেনে সদ্ভাবে বসবাস করেছে। শরতের স্বচ্ছ আকাশে কাজলকালো মেঘের আবিলতা স্থায়ী হতে পারে নি–ক্ষণিকের বর্ষণেই মলিনতা ধুয়ে গেছে।
খরস্রোতা ‘চিত্রা’ ও ‘নবগঙ্গা’র মোহনায় যশোহরের বিশিষ্ট ব্যাবসাকেন্দ্র নলদির প্রান্তবর্তী আমাদের এই ছায়া-ঢাকা গ্রামখানি, প্রকৃতির মায়া-মালঞ্চ যেন। বাইরে থেকে বোঝাই যায় না –ঘরবাড়ি আছে, রাস্তাঘাট আছে, না হাজার লোকের বসতি আছে। কবে কোন এক অজ্ঞাত প্রভাতে কে যে এর নাম দিয়েছিল ‘সিঙ্গা’ সে-কথা কেউ মনে করতে পারে না। ব্রিটিশ আমলে ডাকঘর প্রতিষ্ঠাকালে গ্রামের নতুন নামকরণ হল ‘সিঙ্গিয়া’, এই কথাই শুধু মনে পড়ে।
