সাখুয়ার মাঠ হিন্দু-মুসলমানের বারোয়ারি সম্পত্তি। খেত চষা, বীজ বোনা থেকে আরম্ভ করে ফসলকাটার দিন পর্যন্ত বিশাল সেই মাঠের বুকে সম্মিলিত শ্রম চলত পাশাপাশি পরস্পরের সুখ-স্বপ্নের অংশীদার হয়ে। সবচেয়ে ভালো লাগত জারি গানের সুরে সুরে। খেতের বুকে অলৌকিক আনন্দের ঢেউ জাগাতে। গলা ছেড়ে তামাক খেতে খেতে গান ধরত তারা সমবেত গলায়,
ওরে অমর কেউ থাকবি না তো, মরতে হবে সবারে,
তবে সংসারে তোর এত ভেদ-জ্ঞান কীসেরি তরে।
এ গান যারা গাইতে পারে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্নেহ-প্রীতি, ভালোবাসা কত অকৃত্রিম ছিল সহজেই বোঝা যায়। এই পরিবেশে কোথা থেকে এল সর্বনাশা এই ভেদজ্ঞান?
সাখুয়ার ‘বড়োঘাট’ও সর্বজনীন। এখানেও গাঁয়ের সকলেরই সমান অধিকার। মনের খুশিতে সবাই স্নান করছে, সাঁতার কাটছে, জল নিচ্ছে বিনা দ্বিধায়। গরমের দিনে ঘাটের কোলে জেলাবোর্ডের রাস্তার পাশে সবুজ ঘাসের ওপর বসত মজলিশ-নিশুতি রাত্রি অবধি চলত আলোচনা। তর্ক হত, কিন্তু সহিষ্ণুতার কোনো অভাববোধ ঘটেনি কোনোদিন। আলোচনায় যোগদান করত তরুণ সমাজ। সেখানে চলত দুঃখের কথা, আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা, গ্রাম্য রাজনীতি থেকে শিক্ষাদীক্ষা এমনকী আজকের সংস্কৃতির গতি-প্রগতির কথাও বাদ যেত না। আলোচ্য বিষয় আলোচনার আবহাওয়ার ওপর ওঠানামা করত। বয়স্কদের সব বৈঠক হত মথুর মাস্টারের বৈঠকখানায়। ক্রমাগত তামাক পুড়ত সেখানে, তিনটে হুঁকো হিমসিম খেয়ে যেত বক্তাদের শোষণের ঠেলায়! কল্কে পুড়ে লাল হয়ে উঠত, ফাটবার উপক্রম! মথুর ঠাকুর ছিলেন ভিনগাঁয়ের স্কুল মাস্টার, জ্ঞান ছিল গভীর, মানুষ হিসেবে ছিলেন একেবারে ভোলানাথ। লোকের দুঃখে তিনি বিচলিত হতেন বলেই সকলেই ছুটে আসত পরামর্শ নিত। পরামর্শ বা সাহায্য দিতে কোনোদিন দ্বিধা করতে দেখিনি তাঁকে। গোলমালে পড়লে পাড়ার মাতব্বরেরাও লজ্জা করতেন না তাঁর কাছে আসতে। শুনেছি আজও তিনি দেশ ত্যাগ করেননি,–আঁকড়ে পড়ে আছেন দেশের বাড়িতে। তিনিও আশা করেন একদিন না একদিন জাতীয় কলঙ্কের অবসান হবেই, আবার উন্মত্ত মানুষ দুর্যোগের রাত্রি কাটিয়ে প্রকৃতিস্থ হবে নতুন জীবন-প্রভাতে। ঘুচে যাবে আজকের সংকট, মুছে যাবে লজ্জার ইতিহাস।
প্রতিরবিবার হাট বসত মগরা নদীর তীরে। একদিকে জেলাবোর্ডের বড়ো রাস্তা, অন্যদিকে মগরা নদী। একদিকে গোরুর গাড়ির ভিড়, অন্যদিকে সারি সারি পালতোলা নৌকা। কোলাহলমুখর হাট এনে দিত সপ্তাহান্তে কল্লোলিত প্রাণের আনন্দোচ্ছাসের ঢেউ। প্রতীক্ষা করে থাকতাম রবিবারের জন্যে-লক্ষ করেছি সেদিনকার মানুষে মানুষে সম্প্রীতির সম্বন্ধ। ইসমাইল চাচার চালের গোলার পাশেই ছিল রজনীমামার কাপড়ের দোকান। আমরা হাটে গেলে উত্যক্ত করে ব্যস্ত করে তুলতাম ইসমাইল চাচাকে! খরিদ্দারের সঙ্গে কথা বললে আমরা জোর করে তাঁর মুখ ঘুরিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য করতাম। আমাদের শয়তানি থেকে মুক্তি পাবার জন্যেই হয়তো চাচা বড়ো বড়ো মাছ-লজেঞ্চুস রাখতেন লুকিয়ে,–একটা একটা পেলে তবেই নিষ্কৃতি দিতাম তাঁকে! সেদিনকার এই দুষ্টুমির কথা ভেবে একটু একটু লজ্জা হলেও আনন্দটাই হয় বেশি। আজ রজনীমামা কলকাতার পথে পথে ফিরি করে বেড়ান, অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটে তাঁর।
পুজো-পার্বণ, ইদ-মহরমেই পেতাম মানুষের মনের আসল পরিচয়। বিজয়া দশমী এবং ইদ আমাদের গ্রামে ছিল মিলনের প্রতীক। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রীতি-বিনিময়ের সঙ্গে সঙ্গে করতে হত মিষ্টিমুখ। সেই আনন্দমুখর দিন কি আর ফিরে পাব না আমরা। সেদিনকার মানুষরা আজ কোথায়?
আজ মনের পর্দায় ভেসে ওঠে মহুয়ার গান, গুনাইবিবির পালা, বাউল গান, জারি গান, কবির লড়াই, মনসার ভাসন, গাজির গানের আসরের জনবহুল দৃশ্যের টুকরো টুকরো ছবি। জাতিধর্মনির্বিশেষে নির্বাক শ্রোতার দল গ্রহণ করেছে এসব সংগীতরস। ব্রাহ্মণের ছেলে নদের চাঁদ, আর মুসলমানের মেয়ে মহুয়া; মুসলমান গায়ক ও সাধক গাজি আর হিন্দুর মেয়ে চম্পাবতী–অবাক হয়ে দেখেছি নদের চাঁদ আর মহুয়ার দুঃখে, গাজি আর চম্পার ব্যথায় সমভাবে অশ্রু বিসর্জন করছে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নর-নারীই। সকলেই নাটকবর্ণিত দুঃখকে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের দুঃখ বলে গ্রহণ করেনি, করেছে সমস্ত মানুষের দুঃখ হিসেবেই। তাই তো সহজেই তারা হতে পারত সবাকার সুখ-দুঃখের অংশীদার।
পৌষ সংক্রান্তিতে আমাদের হাটে বসত মেলা। ঘরে ঘরে তখন চলত নবান্নের উৎসব, সকলের মুখে হাসির ছোঁয়াচ। গ্রামের ওস্তাদ মেঘু শেখ ছিলেন বিখ্যাত কুস্তিগির, তাঁর সুযোগ্য শিষ্য ছিলেন আমার জ্যাঠামশায়। জ্যাঠার অকালমৃত্যুতে দেখেছি অমন জোয়ান মেঘু শেখও হয়েছিলেন পাগলের মতো। পুত্রশোক পেয়েছিলেন যেন জ্যাঠামশায়ের মৃত্যুতে। সেইদিন থেকে আর কেউ তাঁকে কুস্তি লড়তে দেখেনি। সব কিছু ছেড়ে দিয়ে নিঃসন্তান ওস্তাদ আজও বেঁচে আছেন। আমাদের সঙ্গে দেখা হলে অবিশ্রান্তভাবে তিনি শুধু জ্যাঠামশায়ের গল্পই বলে যেতেন, আর অশ্রুধারায় তাঁর গন্ডদেশ যেত ভিজে। তেমন স্নেহ আজ পর্যন্ত দেখিনি। আজ সেই স্নেহপ্রবণ মন কোথায় গেল মানুষের!
এই প্রসঙ্গে আর একজনের কথা না বললে আমার স্মৃতিকথা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সে আমাদের গ্রামের চারণ কবি-কবীর পাগল। জাতিতে সে মুসলমান হলেও কোনো ধর্মের ওপরই বিরাগ ছিল না তার। সমস্ত ধর্মকেই বিশ্বাস করত কবীর পাগল। সেও আজ বৃদ্ধ। কিছুদিন আগে শুনেছি সে নাকি অন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামের এবং জাতির জন্যে একটি ইতিহাসের মালা গেঁথে রেখেছে কবীর গানের সুরের সূত্র দিয়ে। ছোটোবেলা থেকেই দেখেছি ধর্মের সমন্বয়ের দিকেই তার ঝোঁক। ভিক্ষের অজুহাতে বাড়ি বাড়ি গান গেয়ে বেড়াত সে। রামায়ণ-মহাভারত-কোরান-বাইবেলের গল্প শুনেছি তারই মুখে প্রথম। তাকে কেউ বলত বৈষ্ণব, কেউ বা ভাবত ফকির। আমার সঙ্গে রউফের একবার ঝগড়া হয়ে কথা বন্ধ হয়ে যায়। মনে পড়ে কবীরই করে দিয়েছিল তার মীমাংসা। তার সামনে মনে পড়ে প্রতিজ্ঞাও করেছিলাম-বন্ধুতে বন্ধুতে, ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া হতে দেব না কোনোদিন। আমাদের ঝগড়া মেটাতে গিয়ে সে কেঁদেছিল সেদিন। ছোট্ট ছেলে বলেই সে কান্নার অর্থ বুঝিনি তখন। আজ এক-একদিন রাত্রে কার ডাকে ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ে যায় যেন; সকলের আগে মনে পড়ে কবীরের মুখখানি। কবীর নিশ্চয় আমাদের দুঃখ নিয়েও গান রচনা করেছে। আজ সে অন্ধ, কিন্তু মানসচক্ষে তো মানুষের বেদনা দেখতে পাচ্ছে সে। আজ চমকে চমকে উঠি গানের রেশ শুনলে, বাউল-ভাটিয়ালি হলেই কবীর মনের সামনে এসে দাঁড়ায়। মনে পড়ে যায় তার ‘ফিরে আয়, ওরে ফিরে আয়’ গানখানি। মনে পড়ে যায় সে-ই বলেছিল মাস্টার সায়েবের মতো দৃঢ়কণ্ঠে–’ভাইয়ে ভাইয়ে, বন্ধুতে বন্ধুতে আবার মিলন ঘটবেই, পৃথিবী হবে সুন্দর। আমরা তোমার কথা বিশ্বাস করি কবীর, আমাদের দেশ আবার সকলের হবে, সমস্ত শয়তানের মৃত্যু হবে একদিন। তবে সেদিন তোমায় পাব কি না জানি না!
যশোহর – অমৃতবাজার সিঙ্গিয়া
নিজের গ্রাম সম্পর্কে কিছু বলতে হলে প্রথমেই কী মনে আসে আপনার? মাটি আর মানুষ দুই-ই। দেশের মাটিতে ফলে ফসল, আর সে-ফসলের অংশীদার মানুষ গড়ে তোলে গ্রামের সম্মান ও সমৃদ্ধি। আজ নিজের গ্রামকে বিশেষভাবে লক্ষজনের সানুরাগ দৃষ্টির সম্মুখে তুলে ধরবার এই প্রচেষ্টা উত্তর-কাল কীভাবে গ্রহণ করবে কে জানে? ছেড়ে এসেছি যে গ্রাম, এ কি তার জন্যে অশ্রুবিসর্জন? না কি ছায়াসুনিবিড় সেই জন্মভূমির প্রিয় সযত্নলালিত স্মৃতি নিয়ে এ এক ঐতিহ্যবিলাস? এ প্রশ্নের জবাব আজ নাই-বা দেওয়া হল। তবু গ্রামের কথা বলতে বসে প্রথমেই মনে পড়ছে, দেশব্দলের পালায় শরণার্থীর অশ্রু দিয়ে জন্মভূমির এ অর্ঘ্য হয়তো একেবারে ব্যর্থ হবে না। হয়তো গ্রামের মানুষ আবার তার গ্রামকে গভীরতর মমতায় ফিরে পাবে শান্তি ও মৈত্রীর মধ্য দিয়ে।
