পেছন থেকে মগরা নদী যেন আমার গ্রামটিকে সহসা ধরেছে সোহাগ করে চেপে। দুরন্ত ছোট্ট নদী যেন সাখুয়ার আঁচলের তলায় নির্ভয়ে থাকতে চায় দুরন্ত মেয়েটির মতো। তরতর করে তাই তার অমন নেমে চলা গতি! মগরা নদী আমাদের জীবনে এনেছিল স্নিগ্ধতা, গ্রামটিকে করেছিল উন্নত নানা দিক থেকে। মগরার স্রোতে আমাদের জীবনস্রোত একাত্ম হয়ে মিশে পেয়েছিল পরিপূর্ণতার স্বাদ।
আজ কত স্মৃতি এসে ভিড় করছে মনের কোণে–নির্জনতা পেলেই তারা আমাকে উতলা করে বারবার। ভুলতে পারি না, তার কথা না ভেবে শান্তি পাই না। যাকে প্রাণভরে ভালোবাসি তার স্মৃতিই লাগে মিষ্টি। ক্ষীণ স্মৃতি যে পুরোনো কত তথ্যকে উদঘাটিত করে তা ভুক্তভোগীরাই জানেন। মনে পড়ছে, শান্তিতে ঘেরা সাখুয়ার ভিন্ন ভিন্ন পাড়ার কথা। হিন্দু আর মুসলমান পাড়া। সামনেই বিরাট ফসলের জমি। মাঠের পশ্চিম সীমানায় হিন্দু মুসলমানের পাশাপাশি বসতি-সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাগত সেখানে প্রাণকণিকা, জ্বলজ্বল করত শিশিরভেজা ধানের শিষগুলো! ভোরবেলা দূর্বাদলের মাথায় টলমল করত মুক্তোর মতো স্বচ্ছ শিশিরকণা। মানসচক্ষে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি সেদিনের উধাও হওয়া মনের চেহারাখানি। ভোরে উঠেই বেরিয়ে পড়তাম ভিজে ঘাসের স্নিগ্ধ পরশ নেবার লোভে। চারদিক নিঝুম, আমি বেপরোয়াভাবে শুধু যেতাম এগিয়ে দূরের গ্রামের দিকে চলার নেশায়। সূর্য উঠেছে আর আমি উঠিনি এমন কোনোদিন হয়নি। একদিন মনে পড়ে, মহাবিপদের মধ্যে পড়েছিলাম আলে আলে চলতে গিয়ে। আমি তখন ছোটো, অভ্যাসমতো ভোরে বেড়াতে বেরিয়েছি ঠাকুরদার সঙ্গে। ঠাকুরদা বুড়োমানুষ, পারবেন কেন আমার চাপল্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে! ছুটে ছুটে এগিয়ে গেছি অনেক দূর-হঠাৎ একটা দৃশ্যে আমি হয়ে গেলাম হতভম্ভ। আলের ওপর আড়াআড়ি হয়ে শুয়ে আছে মস্ত এক সাপ। ভয়ে আমি গতিহীন,–নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমরা পূর্ববঙ্গের লোক, সাপ আমাদের ভয় দেখাতে পারে না। আমি ছোটো বলেই হয়তো ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। ঠাকুরদা আমার নির্দেশিত সাপটি দেখে একগাল হেসে শুধু বলেছিলেন–’বোকা কোথাকার, এখনও সাপ চিনিস না? ওটা সাপ নয় রে, সাপের খোলস, বুঝলি,–আসল সাপ বিশ্রাম করছে গর্তের ভেতর!’
সেদিনের ছোটো ছেলেটি আসল-নকলের পার্থক্য ধরতে পারেনি সাপের, আজকেও আমি কি ধরতে পেরেছি মানুষের আসল-নকল রূপ? বারবার প্রশ্ন করেছি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছি কিন্তু পদে পদে ব্যর্থ হয়েছি সমাধান খুঁজতে গিয়ে। তাই আজ সবচেয়ে বেশি করে মনে পড়ছে ঠাকুরদার কথা,–তিনি থাকলে ভাবতে হত না এত খুঁটিয়ে! মানুষ চেনা দেখছি সব চেয়ে কঠিন ব্যাপার! যে মানুষকে বিশ্বাস করেছি, যে মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তা করেছি, সুখে সুখী, দুঃখে দুঃখী হয়েছি, আজ কোথায় তারা? ছোটোবেলায় রূপকথা শুনে কতদিন আঁধার রাতে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখতে চেয়েছি তেপান্তরের মাঠে রূপকথার রাজপুত্তুরকে পক্ষীরাজ ঘোড়ার সোয়ারি বেশে, তারায় ভরা আকাশের নীচে ঝিল্লিমুখর প্রান্তরের বুকে কৈশোরের স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে গেছে বারবার, আজকের স্বপ্নেরই মতো।
আঁকাবাঁকা খেতের আলে ছোটো ছোটো পা ফেলে পাঠশালায় যাবার কথা মনে পড়ছে। শিক্ষক ছিলেন দুজন, দুজনই মুসলমান। আজও তাঁরা আছেন কি না জানি না। তাঁদের একজনের কথা আজ বিশেষ করে মনে পড়ে। আমার বি. এ. পাশের সংবাদ পেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন আমার শৈশবের সেই মাস সায়েব–আন্তরিকতায় পূর্ণ সে চিঠি। আমার কাছে তা অমূল্য সম্পদ, তাই সযত্নে রেখে দিয়েছি বাক্সে। বহুমূল্যবান জিনিস ছেড়ে এলেও সে চিঠি হাতছাড়া করিনি। ন্যূজ দেহ, ক্ষীণ দৃষ্টি, বার্ধক্যের ভারে ক্লান্ত, শুভ্র লম্বা দাড়ি নেড়ে তিনি আমাদের পড়াতেন। কত অমূল্য উপদেশ দিতেন গল্পচ্ছলে,-একদিনের পরিচয়েই জানতে পেরেছিলাম তিনি মানবধর্মের পূজারি। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারাতে তিনি বারবার বারণ করেছিলেন আমাকে। বলেছিলেন–”সমস্ত মানুষের শুভবুদ্ধি একদিন জাগবেই। শিহরন লেগেছিল শেষকথাটির ওপর জোর দেওয়াতে। মাস সায়েবে’র কথায় বিশ্বাস আমি হারাইনি, তাঁর কথাই সত্যি হোক এ প্রার্থনা করি। আশায় বুক বেঁধে রয়েছি সেই সুদিনের নবপ্রভাতের জন্যে। জানি না সে সূর্যোদয়ের বিলম্ব কত!
ছোটোবেলাকার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল রউফ। একসঙ্গে পড়তাম, স্কুলে যেতাম, খেলাধুলো, স্নান, সাঁতার ছিল সবই একসঙ্গে। আমাদের দুটিকে একত্রে সর্বদা সব জায়গায় দেখা যেত বলে অনেকে উপহাস করে বলতেন ‘মানিকজোড়’–আর যাঁরা আরও তীব্র রসিকতাপ্রিয় ছিলেন তাঁরা বলতেন রাম-রহিম’। আমরা কান দিতাম না সে-কথায়, বন্ধুত্বে চিড় খাওয়াতে রাজি ছিলাম না। আমাদের বাড়িও ছিল পাশাপাশি, বাড়ির মাঝখানে শুধু একটা ধানখেতের ব্যবধান। তখন তাই মনে হত যেন কত দীর্ঘ। কিন্তু আজকের এই দীর্ঘ ব্যবধান তো কারও মনে তেমন করে দোলা দিতে পারছে না। আমি রউফের কথা ভাবছি। রউফও কি ভাবছে আমার কথা পাকিস্তান থেকে আমারই সুরে সুর মিলিয়ে?
একদিনের এক হাস্যকর ব্যাপার মনে পড়ে! রউফ একদিন আবিষ্কার করে ফেলল হঠাৎ যে, আমাদের সঙ্গে ওদের বাড়ির একটা প্রভেদ আছে মুরগি পোষা নিয়ে। এইজন্যেই হয়তো আমাদের দু-বাড়ির ব্যবধানও একটু বেশি! বাড়ি গিয়েই সে সেই রাত্রেই সব কটি মুরগি চুপি চুপি চালান করে দিয়ে এল আর এক বাড়িতে। সে মুরগি অবশ্য ফিরে এসেছিল রউফদের বাড়িতেই আর তার কীর্তির কথাও রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বন্ধুর সঙ্গে সমস্ত প্রভেদ ঘুচিয়ে নিকটতম হওয়ার এই যে ছেলেমানুষি বুদ্ধি এবং আন্তরিকতা তার তুলনা কোথায়? এই যে কাছের মানুষ করে নেবার প্রচেষ্টা, আজ সেই সরল মনের নির্বাসন হল কেন এতদিন একত্রে থাকার পরেও? মনের গড়ন কেন মানুষের বদলাল রাতারাতি! আজকেও সেইদিনকার মতোই ভাবি সময় সময়, রউফ আর আমার মধ্যে ব্যবধান কোথায়? আমরা দুজনে অভিন্নহৃদয় বন্ধু, আমরা মানুষ। তখন কি ভুলেও ভাবতে পেরেছি যে, রউফের সঙ্গে চিরকালের মতো হবে ছাড়াছাড়ি? যে সাখুয়াকে চোখের আড়াল করা দুঃসাধ্য ছিল তাকেও এমনি ছাড়তে হবে, ভেবেছি কি কোনোদিন? কোথায় গেল আমার প্রাণের বন্ধু, কেথায় গেল আমার গ্রাম! আকুল হয়ে ভাবি আর মাথা ঠুকি ভাঙা শান-বাঁধানো মেঝেতে না, এখানে মাটির স্পর্শ নেই। চোখ-ধাঁধানো নির্মম কলকাতা পল্লিমায়ের মধুমিষ্টি শান্তির প্রলেপ দিতে পারে না। যান্ত্রিক শহর, অত্যাশ্চর্য তার আকর্ষণী শক্তি মানুষকে অমানুষ করার দিকে। মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু দেখছি এখানে প্রত্যহ! তবু একে কত আদর, কত সোহাগ! এই প্রাসাদপুরীর ঐশ্বর্যের হিংস্র ঔদ্ধত্যের কাছে মানবতার দোহাই হাস্যকর!
