ত্যাগের মধ্য দিয়েই ভোগের আস্বাদ নিবিড় করে পাওয়া যায়। আমরা আধ্যাত্মিক ভারতের অমৃতের পুত্র। তাই সুখ ত্যাগ করে আজ আমরা তামস তপস্যায় রত। এ তপস্যায় রত হয়েছে হিন্দু, এ তপস্যায় রত হয়েছে মুসলমান। শবসাধনায় শোধিত হয়ে দেশমাতৃকা জ্যোতির্ময়ীরূপে আবির্ভূত হন এ প্রার্থনা কার নয়? ভুক্তভোগী মানুষ মানুষের সপক্ষে; তারা শান্তি চায়, শুধু শান্তি চায়, আবার সুখী-সচ্ছল হয়ে বাঁচার মতো বাঁচতে চায়। সব মানুষের এক প্রার্থনা হলে মা বেশিদিন কিছুতেই থাকতে পারবেন না সন্তানদের পৃথক করে রেখে।
মনে পড়ছে বেশি করে চৈত্র সংক্রান্তির কথা। এই দিনটির কথা কোনোদিন ভোলা সম্ভব নয় নাগেরগাতীর ছেলে-বুড়োদের। ধনী-দরিদ্র, চাষি-জমিদার সবাই তাদের গৃহপালিত গোরু-ঘোড়াকে নদীর জলে স্নান করিয়ে এনে নানা রঙে বিচিত্রিত করে দিত তাদের সর্বশরীর। ধূপ-ধোঁয়া দিয়ে কামনা করা হত তাদের মঙ্গল। চাষিরা দিনে অনাহারে থেকে নতুন কাপড় পরে নতুন আনন্দে বর্ষশেষের এই দিনটিকে জানাত প্রাণের ভক্তি-শ্রদ্ধা। তাদের একমাত্র সম্বল বাঁচবার আশা-ভরসা, তাদের বলদ-গাভীর দীর্ঘজীবন কামনায় ছোটো ছোটো চাষি-বালক-বালিকারাও আনন্দে দিশাহারা হয়ে পথে পথে বেড়াত নৃত্য করে। কিছুদিন আগেও খবর পেয়েছি আর সেদিন নেই,–নিঃশব্দে বছর চলে যায়। লোকজনের অভাবে এখন আর কোনো আড়ম্বরেরই সাড়া নেই অত বড়ো গ্রামে।
চৈত্র সংক্রান্তির বিকেলবেলায় আমাদের গ্রামে হত ষাঁড়ের লড়াই। কী উৎসাহ কী উদ্দীপনা নিয়েই না এই লড়াই দেখেছি একদিন। দূর দূর গ্রাম থেকে হিন্দু-মুসলমান চাষিরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে তাদের ষাঁড়কে নানা রঙে সাজিয়ে, ফুলের মালা দিয়ে, শিং-এ রঙিন রুমাল বেঁধে জারিগান গাইতে গাইতে এসে জড়ো হত নির্দিষ্ট মাঠে। তারপর চলত সেই বহুপ্রতীক্ষিত লড়াই। যে দলের ষাঁড় জয়লাভ করত তারা যুদ্ধজয়ের পুরস্কার হিসেবে পেত জমিদারবাবুদের দেওয়া কত জিনিস। এইদিনের লোক সমাগম হত দেখার মতো–মোড়ল মাতব্বরেরা শান্তিরক্ষা করতে হিমসিম খেয়ে যেত সেদিন। লাঠির জোরে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হত। সেদিনকার সে দৃশ্য মনে পড়লে আজও গুমরে ওঠে মন। আমরা অনেক আগে থেকেই গাছে আশ্রয় নিয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে লড়াই-এর রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। এক বিচিত্র আশা-আকাঙ্ক্ষায়, উত্তেজনা-ঔৎসুক্যে ভরপুর হয়ে উঠত মন।
সেদিন গাছের দৃশ্যও যেত পালটে,–গাছে গাছে মানুষ ঝুলছে বাদুড়ের মতো! মাঝে মাঝে দুর্ঘটনাও যে ঘটত না তা নয়,–ভালো করে দেখবার জন্যে এক এক সময় হুটোপুটিও লেগে যেত জায়গা দখল নিয়ে! ডাল ভেঙে সেবার যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল তার কথা ভোলা যায় না। অবশ্য রক্তাক্ত প্রতিবেশীর অসাড় দেহ দেখে সেদিন যতটা উতলা হয়েছি, আজ আর তেমন হয় না। মানুষের মৃত্যুতে স্বাভাবিক বেদনাবোধের সে অনুভূতি গেল কোথায়? বিকৃত দেহ সম্বন্ধে সেদিন ধারণা স্পষ্ট ছিল না, আজ স্বচ্ছ হয়েছে। চোখের সামনে কত প্রিয়জনের মৃত্যু যে দেখেছি তা বর্ণনা করে লাভ নেই। ষাঁড়ের লড়াইকে আজ প্রতীক বলেই মনে হচ্ছে আমার, নিরাপদ দূরত্বে বসে নিশ্চয়ই কোনো দর্শক উপভোগ করছে এ দৃশ্য! তারও কি পতন ও মৃত্যু হবে না সমস্ত লাঞ্ছিত অপমানিত মানুষের অভিশাপে?
আজ আমরা যে অবস্থায় এসে পৌঁছেছি তাতে পূর্ববঙ্গ গীতিকার আয়না বিবির খেদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়,
যেই রে বিরক্কের তলে যাই আরে ছায়া পাওনের আশেরে।
পত্র ছেদ্যা রৌদ্র লাগে দেখ কপালের দোষে রে।।
দইরাতে ডুবিতে গেলে দেখ দইরা শুকায় রে।
গায়ের না বাতাস লাগলে আর ভালা আগুনি ঝিমায় রে।।
কতকাল আগেকার কোন সে অজ্ঞাত প্রাচীন কবি বাঙালি নর-নারীর চিরন্তন প্রেমকাহিনি রচনা করতে বসে দিব্যদৃষ্টিতে পূর্ববাংলার একালের অধিবাসীদের চরম অসহায়তা উপলব্ধি করেই হয়তো এমনি ছত্রে ছত্রে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ছেড়ে-আসা গ্রামের ভবিষ্যৎ বাঙালির মর্মবেদনা। স্বাধীন দেশের বৃক্ষতলায় শান্তির নীড় বাঁধব, শঙ্কাহীন মনে নবজীবনের বন্দনা গান গাইব, সে সুযোগ আমাদের কবে হবে?
.
সাখুয়া
মেঘে মেঘে আকাশ গেছে ছেয়ে, চারদিকে নিবিড় সন্ধ্যার অকালবোধন। ঘন অন্ধকার যেন গলা চেপে ধরেছে! এ মেঘ রাজনৈতিক মেঘ, এর বৃষ্টি আনে অশ্রুজলের বন্যা! একদিন যা ছিল আমার জন্মভূমি আজ নাম হয়েছে তার ‘ছেড়ে-আসা গ্রাম’। আকাশে কালো মেঘের সারি, পুব থেকে পাড়ি জমিয়েছে পশ্চিমের দিকে। হু-হুঁ করে ছুটে চলেছে দিকবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে দেশ-দেশান্তরে, দূর-দূরান্তরে অসহায় নিঃসহায়ের মতো। এত মেঘ পুবদিকে ছিল কোথায়? কোথা থেকে জন্ম নিল সর্বনাশা এই কালো মেঘ? মেঘের ডমরুর গুরু গুরু শব্দে আমরা ভীত হয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারিনি যে, তার বর্ষণ এত নির্মম হতে পারে, শোনা ছিল ‘যত গর্জে তত বর্ষে না। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে সে মেঘ যত গর্জিয়েছে তার চেয়েও বর্ষিয়েছে বেশি! আজ লজ্জায় মরে যাই সেদিনের সেই আত্মগ্লানির কথা ভেবে! কোথায় গেল আমার সেই জন্মভূমি, সোনার প্রতিমা ‘সাখুয়া গ্রাম? আমার সাখুয়া মা আমাকে চিরদিনের মতো ত্যাগ করেছে। আমার গাঁয়ের মাটি আমাকে ধরে রাখতে পারল না–অথচ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তো আমাকে বারবার বলেছে ‘যেতে নাহি দিব। উঠোনের মাধবীতলার ফুলগুলো, বাগানের মল্লিকা, জুই, বেলফুল আমাকে গন্ধে মতোয়ারা করে দিয়েছিল চলে আসার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্তও। যেদিকে তাকিয়েছি সেই দিকেই অনুভব করেছিলাম স্নেহের পরশ; তবু আসতে হল, ভিক্ষাপাত্র সম্বল করে মহানগরীর অবাঞ্ছিত নাগরিক সাজতে হল শত অনিচ্ছাতেও। কেন এমন হল, কেন আমার ওপর কূপিত হলেন আমার পল্লিমা?। কারণ পাই না,কারণ খুঁজতে ইচ্ছেও করে না। শুধু ইচ্ছে করে মায়ের রূপ ধ্যান করতে, চোখের সামনে আমার জীবন্ত গ্রামটিকে ধরে রাখতে। আশা আছে মায়ের কোলে আবার স্থান পাব–উত্তেজনার ঘোরে মায়ের করুণা হারিয়েছি ক্ষণিকের তরে, এটা দীর্ঘস্থায়ী নয়। হয়তো তিনি বলেছিলেন–’চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে’ অসতর্ক ক্ষণে, কিন্তু মায়ের এই কথা শুনে ভুল করলে চলে না,-এমন অলক্ষুণে কথা কোনোদিন মা বলতে পারেন না মনেপ্রাণে। কথাতেই তো আছে, কুপুত্র যদিও হয় কুমাতা কখনো নয়। আমার সাখুয়া মা আবার আমাকে কোলে স্থান দেবেন, আমি আবার গাইতে পারব—’এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।’
