আসামের গারোপাহাড়ের পাদদেশে আমার গ্রামখানি যেন সৌন্দর্যের মূর্তিমতী প্রতীক–আজ জনাকীর্ণ শহরে বসে সেই ছবির কথা ভেবে চোখে জল আসছে আমার। সামনে দিয়ে পাহাড়িয়া নদী কুলুকুলু শব্দে বয়ে যাচ্ছে অবিশ্রান্ত অনাবিল গতিতে। এই নদীটিই এ দেশের প্রাণ, এ দেশের সম্পদ। গারোপাহাড় থেকে হিন্দুস্থান হয়ে পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে বিজয়িনীর মতো চলেছে সে। স্থানে স্থানে কূল ভেঙে শতধা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে জলদান করতে করতে। অগভীর এই নদীর পূর্ণযৌবন আসে বর্ষাকালে। তখন তার ভয়ংকর রুদ্ররোষ চারদিকে প্লাবিত করে দেশকে করে তোলে উর্বরা,–মাঠে মাঠে চলে ফসল ফলাবার ভূমিকা। শস্যপূর্ণা বসুন্ধরার মূর্তির মোহিনীরূপ আমরা দেখি হেমন্তে। ছোটো-বড়ো নৌকা দেশ-দেশান্তর থেকে জিনিসপত্র নিয়ে আসে, নিয়ে যায়–এইভাবেই দেশের সঙ্গে বিদেশের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ব্যাবসাবাণিজ্যের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সে সম্পর্ক আজ শিথিল। দেশের জিনিস সব দেশেই পড়ে আছে। পাকিস্তানের ধান-পাট হিন্দুস্থানের কোনো বাজারে নেই, হিন্দুস্থানের সর্ষের তেল, কয়লা, চিনি পাকিস্তানকে চলছে এড়িয়ে! এই লুকোচুরি খেলার শেষ কোথায়? কবে আমরা ফিরে পাব অবাধ বাণিজ্যের সুখকর আবহাওয়া? সেই শুভদিন আসুক এই উপমহাদেশে!
বর্ষাশেষে অগ্রহায়ণ মাস থেকেই চলে ধানকাটার আয়োজন। কামারের বাড়ি থেকে কাস্তে শান দিয়ে সবাই চলে যায় ধান কাটতে–বিস্তীর্ণ মাঠের সোনা এনে ঘরে তোলা হয় তখন। গরিব অনাথিনীরা ধানের শিষ কুড়োতে যায়। বিদেশিরা আসে কত তৈজসপত্র নিয়ে আমাদের দেশে যা পাওয়া যায় না তার বিনিময়ে নিয়ে যায় ধান সওদা করে। ধান দিয়ে মেয়েরা কেনে কাঁচের চুড়ি, গিল্টি সোনার হার, চুল বাঁধার রঙিন ফিতে! বছরের সমস্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্যসম্ভারই কেনাকাটা হয় ওই সময়।
আরম্ভ হয় চারদিকে ধান-চিড়ে কোটার আনন্দ-প্রস্রবণ। ভোর হতে-না-হতেই মেয়েরা শয্যাত্যাগ করে চেঁকিতে চিড়ে কুটছে; শব্দ হচ্ছে তালে তালে, নতুন ধানের ভুরভুর গন্ধ গ্রামকে তুলেছে মাতিয়ে। কতদিন ভেঁকির শব্দে ঘুম গেছে ভেঙে, আজও মাঝে মাঝে আচমকা জেগে উঠি আধাস্বপ্নের অস্পষ্ট শব্দ শুনে! সেসব আনন্দোচ্ছল দিন আবার জীবনে ফিরে আসবে এমন সম্ভাবনা কি নেই? আজও ভোরেই উঠতে হয়, কিন্তু সে ওঠা আর এ ওঠার মধ্যে পার্থক্য অনেক। আজ উঠতে হয় চাকরি অন্বেষণের জন্যে–দোরে দোরে উমেদারির জন্যে অমানুষিক শ্রমকে অভিশপ্ত জীবনে গ্রহণ করতে। যে সময়টা দেশে ব্যয় করতাম ফুল সঞ্চয়ের পেছনে সে সময়টা আজ যাচ্ছে ভিক্ষাবৃত্তিতে! তবুও আমরা বেঁচে আছি, আমরা তবু বেঁচে থাকব। আমরা আবার খুঁজে আনব সেই ফেলে-আসা দিনগুলোকে। প্রতিবেশীর মুখে হাসি না দেখে মরব কোন আনন্দ নিয়ে?
আমাদের গ্রামবাসীদের চেহারায় কোনোদিন মালিন্য দেখিনি। সুন্দর অটুট স্বাস্থ্য নিয়ে চাষিরা প্রত্যূষে চলে যেত মাঠে। আর মেয়েরা প্রস্তুত করত খাবার–গৃহস্থালি কাজের মধ্যে ঝরে পড়ত তাদের গৃহিণীপনার লালিত্য। জীবনে কি আবার ফিরে আসবে না সেসব দিন আবার কি সেসব মানুষ গান গাইতে গাইতে কাঁধে লাঙল নিয়ে যাবে না মাঠে? গৃহিণীরা তৈরি করবে না পিঠে-পুলি, করবে না গৃহস্থালির খুঁটিনাটি কাজ? জানি না আজ কেন এত করে মনে পড়ছে ছেড়ে-আসা গ্রামকে, নগরজীবনে গ্রামের কথা এত মাথা তুলে কেন দাঁড়াচ্ছে বারবার মনের আয়নায়?
যেসব রীতিনীতিকে কেন্দ্র করে সমাজজীবন গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে গেছে। সবার সঙ্গেই ছিল আমাদের আত্মীয়তা। কেউ কাউকে নাম ধরে ডাকত না-দাদা, মামা, চাচা যোগ না করলে সামাজিক জীবনে হত ক্ষমাহীন অপরাধ। আজ কোথায় সেসব সম্পর্ক তলিয়ে গেল ঘূর্ণির মধ্যে, কে কোথায় বিক্ষিপ্ত হয়ে স্নেহের শ্রদ্ধার সম্বন্ধ হারিয়ে তাচ্ছিল্যের মালা গলায় পরে জীবন বাঁচাচ্ছে কে জানে। শিশুরা মরছে দুধের অভাবে, মায়ের বুক থেকে আজ আর সুধাঁধারা ক্ষরিত হচ্ছে না–দেশজননী এবং মা জননী রক্ষা করতে পারছেন না তাঁদের সন্তানদের। এর চেয়ে দুর্দিন আর কী হতে পারে? কোন দেশের ইতিহাসে রয়েছে এমনি অমানুষিক বর্বরতার দৃষ্টান্ত? কবে মহামিলনের মন্ত্র কার্যকরী হবে তা না জানলেও এমন দুর্দিন মানুষের জীবনে বেশিদিন স্থায়ী হবে না তা জানি।
শারদীয় পুজোয় গ্রামের আনন্দ হত বল্গাহীন, ইতর-ভদ্র সবাই মেতে উঠত আনন্দময়ীর আগমনে। কী অপূর্ব মহামিলনের উৎসব! মনের সকল সংকীর্ণতা মুক্ত হয়ে সবাই যেন উদার মহান হয়ে উঠত। দেখেছি সে স্নেহ-প্রীতি-শ্রদ্ধার আসল চেহারা, দেখেছি সেদিনকার লোকখাওয়ানোর অনাবিল আনন্দ। পুজো, আরতির ধুম, ছেলে-মেয়েদের নাচ, ঢাক-ঢোল বাঁশির বাজনায় ফেটে পড়ত সন্তান গৌরবিনি আমার গ্রাম-জননী। পুজোর চারদিন উৎসব ছেড়ে কেউ কোথাও নড়ত না, ভাব-বিভোরতায় মাতোয়ারা হয়ে থাকত সবাই। বিজয়ার দৃশ্য আজও ভাসছে চোখে। আমাদের নদীর ঘাটেই নানা গ্রামের নানা প্রতিমার নৌকা গান-বাজনা করতে করতে এক জায়গায় এসে জড়ো হত। মাঝে মাঝে ধ্বনি উঠত : বন্দেমাতরম! ভারতমাতার সেইদিনকার বন্দনার প্রতিদানেই কি আমাদের আজকের এই সর্বহারা রূপ? এ কি মায়ের আশীর্বাদ, না জ্বলন্ত অভিশাপ? এ যে অভাবনীয়। সন্তান অন্যায় করলেও মা কী পারেন এমনি কঠোর হতে? হয়তো শক্তিপুজোয় ফাঁকি ছিল আমাদের, যতখানি ভক্তি অর্ঘ্যের প্রয়োজন ছিল তা আমরা দিইনি, তাই জাতীয় যুপকাষ্ঠে বলি হয়ে গেল দেশ।
