.
নাগেরগাতী
আজ আমরা সচেতনভাবে অনুভব করিব যে, বাংলার পূর্ব-পশ্চিমকে চিরকাল একই জাহ্নবী তাঁহার বহুপ্রসারিত বাহুপাশে বাঁধিয়াছেন। একই ব্ৰহ্মপুত্র তাঁহার প্রসারিত আলিঙ্গনে গ্রহণ করিয়াছেন এই পূর্ব-পশ্চিম; হৃদপিন্ডের দক্ষিণ-বাম অংশের ন্যায় একই পুরাতন রক্তস্রোত সমস্ত বঙ্গদেশের শিরায় উপশিরায় প্রাণ বিধান করিয়া আসিয়াছে, জননী বাম-দক্ষিণ স্তনের ন্যায় চিরদিন বাঙালির সন্তানকে পালন করিয়াছে।
প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগেকার কথা। বাংলা ১৩১২ সালের ৩০ শে আশ্বিন। রাখিবন্ধনের পুণ্যমন্ত্র রচনা করে বাংলার কবি বাঙালিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন এই বলে। কিন্তু রাখিবন্ধনের ফাঁস আজ আলগা হয়ে গেছে, মানুষকে মানবতাবোধ আর সংঘবদ্ধ করতে সক্ষম হচ্ছে না। আজ মানুষের কেন এত অধঃপতন? মহাপুরুষদের বাণীর মূল্য কেন আমাদের হৃদয় জয়ে অক্ষম হচ্ছে? আমরা একপ্রাণ, একমন হয়ে এক বাংলার অধিবাসী হতে কি আর পারব না? ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল–পুণ্য হউক, পুণ্য হইক, পুণ্য হইক, হে ভগবান!’–এ বাণী কি কথা হয়েই থাকবে?
বাংলার মাটি আর বাংলার জল তো আমাদের এক করে রাখতে পারল না! একই ব্রহ্মপুত্র জাহ্নবী আমাদের দৃঢ় আলিঙ্গনে বাঁধলেও আমরা তো মানুষকে সহ্য করতে পারলাম না, কোল দিতে পারলাম না ভাইকে স্বার্থসিদ্ধির কলুষ চক্রান্তে? বাপ-পিতামহের পুণ্যস্মৃতি বিজড়িত ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে আসতে হল কাদের ভয়ে? কাদের হাত থেকে মানসম্ভ্রম বাঁচাবার জন্যে আমরা ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে কলোনি আর ক্যাম্পে ঘুরে মরছি মা বোনদের হাত ধরে? কবে জাগবে এই যাযাবরদের ভেতর থেকে সেই মহান জ্যোতি যার আভায় আলোকিত হয়ে উঠবে দিগন্ত, কবে আবার আমরা ফিরে পাব নিজেদের দেশ-বাড়ি ঘর।
আমিও এসেছি গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া হয়ে। যারা পড়ে রয়েছে পেছনে তাদের জন্যে প্রাণ কাঁদে। কত লোক সম্ভ্রম বাঁচাতে পারেনি সামান্য গাড়িভাড়ার পয়সার অভাবে। আজ নির্জনে প্রায়ই মনে হয়, গাড়িভাড়ার পয়সা থাকলে তারাও তো আসত! বিয়োগ-ব্যথায় মন টনটন করে ওঠে সেইসব নিরুপায় মানুষের কথা ভেবে। কিন্তু গাড়িভাড়া সংগ্রহ করে আমরাই বা কী করতে পেরেছি? এ কি বাঁচা? দ্বারে দ্বারে, প্রদেশে প্রদেশে পরিব্রাজকবৃত্তি গ্রহণ করে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে–সংকটের মধ্যে পড়ে চোখের সামনে নিয়ত ভেসে উঠেছে শান্তিঘেরা পল্লিকুটিরের মায়াময় ছবিখানি। গ্রাম আমাদের ছোট্ট হোক, কিন্তু তার স্নেহ-নিবিড় সুশীতল নীড়ের তুলনা নেই। হিন্দু-মুসলমান যেখানে চিরদিন প্রতিবেশী হয়ে বসবাস করেছে তাদের মনকুসুমে কেন কীট প্রবেশ করল অকারণে?
বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে আমরাই একত্রে লড়েছিলাম, আমাদের সংঘবদ্ধ শক্তিই বণিকের রাজদন্ডকে বিপন্ন করে তুলেছে একদিন, অথচ আজ? ভ্রাতৃহত্যার নেশায় আমরা হীনবীর্য। আবার কি রাখিবন্ধন উৎসবে আমরা মেতে উঠতে পারব না কোনোদিন? রাষ্ট্রীয় জীবনে, পারিবারিক জীবনে দ্বন্দ্ব আসেই, তাকে জিইয়ে রেখেছে কোন জাতি কতদিন? আমরাই বা কেন সেই লজ্জাকর দিনের স্মৃতির জের অক্ষয় করে রাখব জীবনব্যাপী? কেন আমরা বলতে পারব না, ‘যা করেছি ভুল করেছি।’ একই জননীর স্তন্যসুধা কেন দুটি পৃথক ধারায় প্রবাহিত হবে বুঝতে পারি না।
আমরা তো কোনোদিন হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীর অধিবাসী ছিলাম না,মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনান্তের পরিশ্রমের পর সন্ধেবেলায় একত্রে জুটে সুখ-দুঃখের গল্প করেই কালাতিপাত করেছি, তবে কেন আজ পারব না সেই নিরুপদ্রব জীবন ফিরিয়ে আনতে? কেন পারব না আপনজনের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে? পারব, সেদিন বেশি দূরে নয়। আজকের অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়, ক্ষণস্থায়ী। আবার বাংলায় সূর্যের হাসি ফুটবে–বাংলার গ্লানি দূর হবে, বাঙালি আবার যোগ্য স্থান পাবে বিশ্বের দরবারে। রবীন্দ্রনাথের কথাতেই বলা যায়,
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন—
এক হউক, এক হউক, এক হউক, হে ভগবান।
মনে পড়ছে আমার ছোটো গ্রামটির কথা। ময়মনসিংহ জেলার উত্তর প্রান্তে, নাগেরগাতী আমার জন্মগ্রাম, তার বুকেই কেটেছে আমার শৈশব, আমার যৌবন। সে জননী আজ আমায় বিদায় দিয়েছেন তাঁর কোল থেকে। পূর্ববাংলার সব গ্রামই প্রায় একইরকম। নদী-নালা দিয়ে ঘেরা, গাছপালায় সবুজ, ফুলেফলে সাজানো ছবির মতো। এককালে সাপের উপদ্রব ছিল বলে আমাদের গ্রামের নাম হয়েছিল নাগেরগাতী। সাপের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা বেঁচেছিলাম, প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলাম, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ার ফলে কপালে জুটল নির্বাসন!
আমাদের পূর্বপুরুষ দু-শো বছরেরও আগে মোগলদের সময়ে এখানে এসে নাকি বসতি স্থাপন করেন। বারো জাতের গ্রাম এটা। কামার, তাঁতি, ধোপা, নাপিত, কুমোর ইত্যাদি কোনো জাতের অভাব নেই। সবার ওপরে মানুষ সত্য, তার ওপরে আর কিছু নেই– এই ছিল আমাদের আদর্শ। কুলপ্রধান ব্রাহ্মণদের লেখায়-পড়ায় স্থান ছিল অতি উচ্চে। তা হলেও গ্রামের সকলেরই সঙ্গে ছিল তাঁদের প্রাণের যোগ। গ্রামের ভেতর ছোটো বাজার–একটু দূরেই প্রধান হাট, ধান-চালের আড়ত। এখানকার সম্পদ ধান, চাল, পাট ও সর্ষে। দেশে এত শস্যসম্পদ থাকতেও আজ লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনাহারে থাকতে হচ্ছে ভেবে দুঃখই হয়।
