অনেকের বাড়িতে বেলবরণ হত পুজোর একমাস আগে, কিন্তু আমাদের বাড়িতে হত। ষষ্ঠীর দিন সন্ধেবেলায়। বাজনদাররা এসে হইচই করে ঢাকঢোল সানাই কাঁসির বাজনায় মাতিয়ে তুলত চারদিক, বাজনার সঙ্গে চলত নাচ। হইহুল্লোড়ে কানের পর্দা ফাটবার উপক্রম হত। আমরা সবাই ছুটে এসে বাজনার তালে তালে কোমর দুলিয়ে আরম্ভ করে দিতাম খেয়াল নৃত্য–সেদিনকার নাচ যে প্রলয় নৃত্যের বেশে জীবনে দেখা দেবে তা কে ভেবেছিল? নাচের মুদ্রা ঠিক কি না জানি না, তবে সে উদ্দাম নাচ যে স্বতঃস্ফুর্ত ছিল সে কথা হলপ করেই বলতে পারি। গুরুজনরা পুজোমন্ডপে সমবেত হতেন। কতরকম বাজি যে পোড়ানো হত তার সীমাসংখ্যা ছিল না। এইরকম ধুমধামের মধ্যে মা দুর্গা উঠতেন বেদিতে।
পরদিন সপ্তমী পুজোর প্রত্যূষেই সানাই-এর সুর দিত ঘুম ভাঙিয়ে, চোখ মেলে দেখতাম খুশির প্রস্রবণ। চারদিকে প্রাণের মেলা,-আনন্দের ঢেউ। সেই ভোরবেলাতেই বেরিয়ে পড়তাম শিউলিফুল আহরণে। ফুল কুড়োনোর মধ্যেও ছিল তীব্র প্রতিযোগিতা–কার সঞ্চয় কত বেশি তার হিসেব নিয়ে কথা কাটাকাটি থেকে সময় সময় যে হুটোপুটির পর্যায়ে পৌঁছোত না তাই বা বলি কী করে! কে পদ্মফুল পেল, কে পেল না, কার ডালায় রকমারি ফুল কত বেশি তা দেখে বাবা-মা পয়সা দিতেন পুরস্কার হিসেবে। সে পয়সা সামান্য হোক তবু তা আমাদের শিশুমনের কাছে ছিল অমূল্য।
মহাস্নানের পর মহাসপ্তমী পুজো হত শুরু। পুরোহিত ঠাকুর চিৎকার করে ডাক দিতেন–‘এসো তোমরা সব্বাই, অঞ্জলি দেবে এসো।’ অঞ্জলি দেওয়ার পর প্রসাদ গ্রহণের পালা। সেদিন দশপ্রহরণধারিণী, সিদ্ধিদাতা গণেশজননী, শত্ৰুবিজয়িনী মা দুর্গার ভক্তিভরেই অঞ্জলি দিয়েছি, প্রণাম করে শত্ৰুদলনের মন্ত্র চেয়ে নিয়েছিলাম ভক্তিভরে, কিন্তু তিনি তো শত্রুবল থেকে রক্ষা করতে পারলেন না আমাদের!
ঠাকুরমার প্রসাদ বিতরণের চিত্রটি জ্বলজ্বল করছে আজও। চারদিকে আমরা ঘিরে ধরতাম তাঁকে,–তিনি নির্বিকারচিত্তে প্রসাদ বিলিয়ে যেতেন। মুসলমান ভাইবোনেরাও সেদিন উদগ্রীব হয়ে থাকত প্রসাদ নেবার জন্যে। সে পুজো ছিল মানবতার পুজো-জাতিধর্মনির্বিশেষে সবাই ভক্তিসহকারে পুজোয় অংশগ্রহণ করত বলেই সেদিন সার্থক হয়ে উঠেছিল শক্তিপুজো। রাত্রে আরতির সময় বাজি ফোঁটানোর ধুম ছিল দেখবার মতো। মা ছিলেন বাজি পোড়ানোর বিপক্ষে, সামান্য শব্দও সহ্য করতে পারতেন না। তাই তাঁকে উদব্যস্ত করার দিকেই ছিল সকলের লক্ষ্য। প্রতিটি বাজির শব্দেই তিনি চমকে উঠতেন। সেদিনকার সেই শব্দ আজ আমাদেরও চমকিত করেছে–সেই বাজির শব্দই আজ প্রাণঘাতী বোমার শব্দে পরিবর্তিত হয়েছে। এখন কোথাও সামান্যতম শব্দ হলেই ভীত হয়ে পড়ি মানব-মারণ অস্ত্রের কথা ভেবে! মায়ের চমক আজ বুঝতে পারছি মনেপ্রাণে।
দশমীর দিন ভোরবেলায় বিদায়বাজনা শুনে মনটা হয়ে উঠত ভারী। বড়ো খারাপ লাগত সমস্ত দিনটা। ফুলতোলা, অঞ্জলি দেওয়া, প্রসাদ খাওয়া, ভাইবোনদের সঙ্গে হুটোপাটি করার দিন শেষ হয়ে গেল ভেবে অস্থির হয়ে উঠত মন। প্রতিমা বিসর্জন দেখে বাড়ি আসতে আর পা উঠত না। প্রণম্যদের প্রণাম সেরে নারকেল নাড়, মোয়া খেয়ে বাড়ি যখন ফিরতাম তখন বেশ রাত। শূন্য মন্ডপের সামনে আসতেই মনটা হু-হুঁ করে উঠত–যেখানে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল কিছুক্ষণ আগেও এখন সেখানে বিরাজ করছে প্রশান্তি। উঃ! সেসব কথা মনে করতেই আজকের শোচনীয় অবস্থার কথা মনে পড়ে যায়। যেখানে প্রাণের সুখে বসবাস করেছি, আনন্দের কোলে বড় হয়েছি, আজ সেখানে মৃত্যুশীতল স্তব্ধতা। জীবনে বিজয়া দেখা দিয়েছে যেন। বছরের পর বছর পুজো আসে, কিন্তু দেশে যাবার কোনো পথ আর নেই।
মনে পড়ে বিজয়ার দিন দুর্গামায়ের কানে কানে আবার আসতে অনুরোধ জানাতাম আগামী বৎসর, কিন্তু আমাদের বিসর্জনের সময় কোনো প্রতিবেশী তো আবার ফেরার অনুরোধ জানায়নি আমাদের! এতদিনের স্নেহভালোবাসার বন্ধন এক নিমেষেই ছিঁড়ে গেল কেন? মানুষ মানুষের সঙ্গ চায় না এমন অশুভ কল্পনা তো আগে কোনোদিন করতে পারিনি আমরা। বাংলা মায়ের তরুণদল আজ দেশে দেশে শতধা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তাদের একত্র হবার দিন এসেছে, কিন্তু কোথায় তারুণ্য? আজ যে আমরা দেশে দেশান্তরে সতীদেহের মতো ছিন্ন হয়ে ছিটিয়ে পড়েছি, এর থেকে কোন পীঠস্থানের জন্ম হবে ভবিষ্যতে? কী লজ্জার ইতিহাসই না গড়ে তুলব আমরা! সংকটের ইতিবৃত্ত সমগ্র জাতিকে আবার মনুষ্যপদবাচ্য করে তুলুক এই শুভকামনাই করি।
আজ আর পুজোয় কোনো আন্তরিক টানই অনুভব করি না। ভোরবেলা ঘুমিয়ে আছি। কাছেই কোনো বাড়িতে রেডিয়ো খুলে দিয়েছে, ঘুমের মধ্যেই কানে বাজছে দেশের পুজোর বাজনা। চন্ডীপাঠ হচ্ছে, সুর করে স্তোত্র পড়ছেন বিরূপাক্ষ। হঠাৎ শুনি মা চিৎকার করে বলছেন—’ওরে ওঠ, আজ যে মহালয়া!’
ফুল তোলার কথা মনে পড়তেই ধড়মড়িয়ে উঠে বুঝতে পারি এ বাজনা রেডিয়োর, এ বাজনা যন্ত্রের! আমার গ্রামের পুজোর পাঠ শেষ হয়ে গেছে–হতাশায় আবার শুয়ে পড়ি। রেডিয়ো তখনও চেঁচাচ্ছে–যা দেবী সর্বভূতেষু…
সত্যি কি দেবী আবার সর্বভূতে বিরাজিতা হবেন? সকলের দুর্মতি ঘুচিয়ে দিয়ে আবার মানুষকে তিনি সুখী সচ্ছল করবেন না? সেদিনেরই প্রতীক্ষা করছি। আজ বেশি করে স্বামী বিবেকানন্দের বাণী মনে পড়ছে, তিনি বলছেন, নিজের ওপর, ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস হারিয়ো না। পুণ্যের জয় হবেই, আর যা পাপ তাকে হাজার চেষ্টাতেও বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। তাই হোক, পাপের মৃত্যু হোক, নিষ্পাপ মানুষ আবার প্রাণ ফিরে পাক।
