যেখানে বারোমাসে তেরো পার্বণ লেগে থাকত সে গ্রাম আজ খাঁ খাঁ করছে মানুষের অভাবে। জঙ্গলে ভরতি হয়ে গেছে উঠোন, লক্ষ্মী আজ গ্রামছাড়া! শুনেছি দিনদুপুরে শেয়াল ডাকে আমাদের বাড়ির মধ্যে–নির্ভীক তাদের পদক্ষেপ, বিস্তৃত তাদের বিচরণভূমি। মনে পড়ছে অতীত আভিজাত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো তিনপুরুষের চকমিলানো দালান, পুজোমন্ডপ, দিগন্তপ্রসারী আম-কাঁঠালের বাগান,শান্তির নীড় হাতছানি দিয়ে ডাকলেও সেখানে যাবার উপায় নেই আজ। দুঃখ হয় নিজবাসভূমিতে আজ আমরা পরবাসী হয়ে পড়েছি ভেবে! হাসি পায় ভেবে যে, এই আমরাই বিজয়সিংহের বংশধর–আমরাই হেলায় লঙ্কা জয় করেছিলাম। একটা পাগলামিকে যাদের রোধ করার ক্ষমতা নেই তারা দেশজয়ের গর্ব করে কী করে?
মন ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে অতীত-বর্তমানের হিসেব-নিকেশে, কিন্তু কী পেয়েছি আর কী পাইনি তার হিসেব করতে মন আর রাজি নয়। সে চায় শান্তি, সে চায় আশ্রয়, সে চায় আশপাশে দরদি মানুষ। কোথায় গেল সেসব মানুষ যারা পরার্থে জীবন বিসর্জনেও পরা’খু ছিল না। নিজের স্বার্থ যাদের কাছে বড়ো ছিল না, বড়ো ছিল অন্যের নিরুপদ্রব জীবন, শ্বাপদসংকুল জনপদে তাই আমরা পদে পদে বিপর্যস্ত, প্রাণ বাঁচালেও মান বাঁচানো চলছে না আর!
সিরাজগঞ্জের ঘাটে নেমে যমুনা নদী পাড়ি দিতে হত ফেরিতে, তারপর নৌকাযোগে যেতে হত আমাদের গ্রামে। নদীর বুকে সূর্যোদয়ের জীবন্ত ছবি আজ অন্ধকারেও স্পষ্ট মনে পড়ে। রাঙাবরণ তরুণ তপন আশা নিয়ে আকাশের গায়ে যখন দেখা দিত তখন আমার মাথা আপনি তার পায়ে লুটিয়ে পড়েছে। নদীর জলে পেয়েছি জীবনকে আর যৌবনকে পেয়েছি। সূর্যের মধ্যে,জীবনযৌবন সেদিন আমাকে অশ্বমেধের বেপরোয়া ঘোড়ার গতি জুগিয়েছে –অশান্ত মন লাগামহীন হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে যত্রতত্র। আজও তো সবাই আছে, কিন্তু সে গতি শ্লথ হল কেন? ছ্যাকরাগাড়ির মতো ক্লান্ত পায়ে কতদূর এগিয়ে যেতে পারব? তরুণ সূর্যের আলোতে সেদিন মাঝিমাল্লারাও মনের খুশিতে গান ধরত দাঁড় বাইতে বাইতে। সে ভাটিয়ালি গান দেহতত্ত্বের রসে সঞ্জীবিত ছিল। গানের তালে তালে ছোটো ছোটো ঢেউ কেটে বাড়ির দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা মনে করলে নিজেকে আর সামলাতে পারি না।
সিরাজগঞ্জের হোটেলে ইলিশমাছের ঝোল-ভাত সেদিন যা খেয়েছি তার স্বাদ যেন আজও মুখে অমৃতের মতো রয়েছে লেগে। হোটেলওয়ালাদের দুষ্টুমির কথা মনে পড়লে হাসি পায়। যাত্রীরা খেতে বসলেই তারা স্টিমার ছেড়ে যাচ্ছে বলে ভয় দেখাত, ফলে কম খরচে তাদের হত বেশি লাভ। মনে পড়ছে সেবার এক যাত্রীকে ওই ধরনের ধাপ্পা দিতে গিয়ে হোটেলওয়ালাই ভীষণ জব্দ হয়ে যায়। সে শেষপর্যন্ত হোটেল ফাঁক করে তবে হোটেল ছাড়ে! কত খুঁটিনাটি কথাই মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে আজ।
দেশে পৌঁছে ছোটো ভাইবোনদের সঙ্গে পুকুরে মাতামাতি করার দৃশ্যটি পর্যন্ত আজ ভুলে থাকবার উপায় নেই। চোখ লাল না হওয়া পর্যন্ত জল থেকে উঠতাম না–কাদাঘোলা জলে পানকৌড়ির মতো ডুব দিয়ে চোর-পুলিশ খেলতাম জলের মধ্যে। সে দিনগুলোই ছিল স্বতন্ত্র ধরনের। আমাদের জীবন থেকে সে দিনগুলি কোথায় গেল?
পুজোর ছুটিতে বাড়ি যাবার তোড়জোড় চলত মাস দুয়েক আগে থেকেই। প্রতিজনের নতুন জামাকাপড় জুতো কিনে বাড়ি যাবার কথা মনে পড়লে আজও রোমাঞ্চ লাগে শরীরে। রাস্তায় ট্রেন-স্টিমারের পথকষ্ট এবং ক্লান্তি নিমেষেই কেটে যেত ঠাকুমা, মা, জেঠিমা, পিসিমা এবং ছোটো ভাইবোনদের মধ্যে গিয়ে হাজির হলে। মাকে ছেড়ে বিদেশে থাকতে পারতাম না বেশিদিন, মাও পারতেন না। বাড়ির স্নেহবঞ্চিত হয়ে সেদিনকার কষ্ট সীমা অতিক্রম করত, কিন্তু আজ? মাকে ছেড়ে, আত্মীয়স্বজন থেকে দূরে সরে এসে, দেশত্যাগী উদবাস্তু হয়ে পথে ঘাটে আজ রাত্রি কাটাই। কোথায় গেল কষ্টবোধ, কোথায় গেল সেই সুখের জীবন? সেদিন যা পারিনি আজ তো বেশ মুখ বুজেই সেসব সহ্য করছি। যাদের দু-বেলা খাবার কষ্ট হবার কথা নয়, তাদেরই উপবাসী থাকতে হচ্ছে আজ নিষ্ঠুর নিয়তির পরিহাসে। আজ অনাহারে অর্ধাহারে টুকরো কাপড়ের স্তূপ ঘাড়ে ফেলে দুয়ারে দুয়ারে ফিরি করতে হচ্ছে অন্নের আশায়। রাস্তার কলের তপ্ত জলে উদরভরতি করে ভিক্ষাবৃত্তি চালিয়ে যেতে হচ্ছে দিনের পর দিন। এই অসহ্য পরিহাসের শেষ কোথায় জানি না, ভবিষ্যতে আরও কী কষ্টের কবলে পড়ব তার খোঁজও রাখি না। মঙ্গলকাব্যে পড়েছি দেবতার কোপে পড়ে মানুষের নাস্তানাবুদ হওয়ার কাহিনি–আমাদের এই কাহিনিও সেই মনগড়া কাহিনির সমগোত্রীয় নয় কি? মঙ্গলকাব্যের কাহিনিশেষে দুঃখীরা ফিরে পেয়েছে সমস্ত হৃত সম্পত্তি ক্রুদ্ধ দেবতাদের তুষ্টিসাধন করে। আমাদের ভবিষ্যৎ কি তার সঙ্গে মিলবে না? কষ্ট করে বেঁচে থাকার পরেও কি সুখের মুখ দেখব না কোনোদিন?
দুঃখের মধ্যেও সুখের স্মৃতি এসে পড়ে মাঝে মাঝে। আমারও মনে পড়ছে আমাদের বাড়ির দুর্গা পুজোর কথা। প্রতিমা সাজানো, প্রতিমায় রং দেওয়া, প্রতিমার আঁচলে জরি-চুমকি লাগানোর কাজে নাইবার-খাবার সময় থাকত না আমার! মহাব্যস্ততা এবং হইচই-এর মধ্যে কাটত দিনগুলো। লক্ষ করেছিলাম প্রতিমার রং লাগানোর সময় গ্রামের হিন্দু-মুসলমানেরা আসত আগ্রহভরে হাত ধরাধরি করে। মুসলমান বলে আমার গ্রামবাসীরা দূরে সরে থাকত না কখনো। রং দেওয়ার ব্যাপারে তারাও মাঝে মাঝে পরামর্শ দিত পটুয়াদের! কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল সাধারণ মানুষ ধরতে পারল না, কিন্তু যখন বুঝতে পারল তখন সর্বনাশসাধন হয়ে গেছে। তখন মনের অপমৃত্যু ঘটেছে, বনস্পতিঘন বৃহদারণ্য দাবানল জ্বলছে দাউ দাউ করে।
