এমনি আরও কত শত পরিচিত মুখ মনের দুয়ারে উঁকি মারে। এরা যে ছিল আমার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
এই আমার পল্লিজননী ময়মনসিংহ জেলার টাঙাইল মহকুমার কালীহাতী গ্রাম। পিতৃপিতামহের ভস্মাবশেষ মিশে রয়েছে ধূলিধূসর এ গাঁয়েরই মাটির সঙ্গে। সপ্তপুরুষ আমার এরই বুকের ওপর হয়েছে লালিত পালিত।
তাই তো এখনও ভালোবাসি, শত মাইল দূরে বসেও স্মরণ করি আমার সেই গ্রামকে, আমার সেই পল্লিজননীকে। পেছনে ফেলে-আসা সেই ধূলিধূসরিত আম্রবীথি-ঘেরা ছায়াসুশীতল বনপথকে কী করে ভুলব? সে পথের বুকে আমার পিতৃপিতামহের চরণধূলি মিশে আছে অণুতে অণুতে। সমুখের পথে পাই না কোনো আলোর হাতছানি, তাই তো পেছনের অতিক্রান্ত পথ আমায় ডাকে–কেবলই ডাকে। অমোঘ আকর্ষণ সেই আহ্বানের। স্বর্গাদপি গরীয়সী পল্লিমায়ের আকুল আহ্বান প্রতিহত হয়ে ফেরে ব্যবধানের প্রাচীন গাত্রে–ফিরে যায় ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে। ভুলতে পারি না তাকে-–ভুলতে পারবও না কোনোদিন! মনে পড়ে নিরন্তরই–‘সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া।’
.
সাঁকরাইল
সূর্যাস্তের পানে তাকিয়ে সূর্যোদয়ের কথা ভাবা ছাড়া আর কী করতে পারি আমরা আজ? জীবন থেকে সূর্যালোক চলে গিয়ে সমস্ত কিছুকে অন্ধকার ব্যর্থতার মধ্যে ঢেকে দিয়েছে। তবু আমরা আলোর পূজারি। আলোকের ঝরনাধারায় জীবনকে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াসী। জীবন মধুর হোক, আলোকময় হোক, আনন্দময় হোক, এ কে না চায়! মহামরণকে মহাজীবনে পরিণত করার মন্ত্র আপাতত আমরা ভুলে গেলেও হতাশ হব না। জীবন-যৌবন দিয়ে পূর্বসূরিদের মহামিলনের গান আমরা গেয়ে যাব। জানি না আত্মবিস্মৃত মানুষ কবে মিলনের গান গ্রহণ করতে পারবে আবার!
আমার গ্রামের কথা মনে পড়লেই কবি গোবিন্দদাসের ঘর ছাড়ার কথা মনে পড়ে। তাঁর গৃহত্যাগের কবিতা আমাদের জীবনকেও যথাযথ রূপ দিয়েছে যেন,
কোথা বাড়ি, কোথা ঘর কি শুধাও ভাই,
যে দেশে আমার বাড়ি আমি সে দেশের পর–
সত্যি, আমার যে দেশে বাড়ি আমি সে দেশের অনাত্মীয় আজকে। ঘর আছে, গ্রাম আছে, সম্পত্তি আছে অথচ আজ আমি উদবাস্তু। বাস্তুত্যাগীর দুঃখ হৃদয়বান না হলে উপলব্ধি করা
সহজ নয়। দুঃখের সমুদ্র মন্থন করে আজ যে বিষ উঠেছে দেশময়, আমরা তা পান করে নীলকণ্ঠ হয়েছি! অমৃতের পুত্রদের আর সুখ নেই–সুখ, স্বস্তি, শান্তি, প্রেম-ভালোবাসা দেশত্যাগী হয়েছে আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই। চারদিকে কুটিল চক্রান্তের কলুষিত ছবি,–সেই পূর্বদিনের সুখীসচ্ছল মানুষের এবং গ্রামের চিত্র কোথায় অন্তর্হিত হল? মানুষ সুসভ্য হয়েছে শুনতে পাই, কিন্তু এই কি সভ্যতার রূপ? এই জন্যেই কি এত সাধনার প্রয়োজন ঘটেছিল? কোথায় গেল সে প্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি, নির্লোভ, নিষ্কলুষতার প্রতীক? কে হরণ করল আমাদের সদগুণগুলো? এই সভ্যতার সংকট থেকে কবে আমরা পরিত্রাণ পাব?
জানি এসব সাময়িক বর্বরতা আমাদের জীবনযাত্রার পথে ছলনা নিয়ে এসে ক্ষণিকের জন্যে আমাদের অগ্রগতি রুদ্ধ করবার চেষ্টা করছে, কিন্তু আমরা সে মোহের জালে ধরা দিলাম কেন? মানুষের আদি নারী-পুরুষ ‘আদম-ইভের সংকট’ কি আবার দেখা দিল বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে? আবার কি শয়তান-কুটিল সাপের ছোবলে মানুষ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনল? কেন এই মতিভ্রম, কেন এই পদস্খলন, কেন এইভাবে মানুষ মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করছে পরের ধার করা পরামর্শ শুনে?
আমাদের গৈরিকধূসর বৈরাগ্যমন তো কখনো আক্রমণাত্মক ছিল না? লোভের হাতধরা হয়ে কখনো তো সে কোনো নিরীহের প্রাণহরণ করেনি! সামান্য তেঁতুলপাতার ঝোল খেয়েই দিনযাপন করেছেন আমাদের পুর্বপুরুষরা, তবুও প্রতিবেশী রাজার রাজত্বের দিকে লোভাত দৃষ্টি নিক্ষেপ করেননি–তবে সে স্বর্গ থেকে বিদায় নিতে হল কেন আমাদের? কোন পাপে মানুষ আজ হানাহানিতে মত্ত-ভ্রাতৃরক্তে তার কেন এত তৃপ্তি? কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো বলে গেছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। গুরুদেব যে মানুষের মধ্যে বাঁচতে চেয়েছিলেন সে মানুষ আজ কোথায়?
বহুদিন মাকে হারিয়েছি কিন্তু আজ হারালাম জননী জন্মভূমিকে। আমার জন্মভূমি আজ আর আমার নয়। তবু তাঁর স্মৃতি মনের মণিকোঠায় জড়িয়ে রয়েছে অচ্ছেদ্য বন্ধনে। মনের ভেতর একটি ছবিই সমস্ত জায়গা জুড়ে আছে–সে ছবি আমার তীর্থভূমির, আমার ছেড়ে আসা গ্রাম সাঁকরাইলের। ময়মনসিংহ জেলার টাঙাইল মহকুমার সাঁকরাইল গ্রামকে আমি কোনোদিন মন থেকে মুছে ফেলতে পারব না। তার সুখ-দুঃখ যে আমার সুখ-দুঃখের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। আমি তার কথা ভুলতে চাইলেও সে আমাকে ভুলবে না– নির্জনস্বাক্ষর উজ্জ্বল হয়ে মনকে সততই প্রশ্নজালে জর্জরিত করবে! শহর থেকে দূরে নির্জন গ্রামখানির এত মোহিনীশক্তি একথা আগে কে জানত?
রাত্রের অসতর্ক মন যখন কল্পনার ডানা বিস্তার করে, তখনই মনে পড়ে যায় আমার গ্রামখানির কথা। শয়নে-স্বপনে, নিদ্রায়-জাগরণে হায় হায় করে ওঠে মন তার কথা চিন্তা করে! ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই হলেও ছেলেরা মাকে ভাগ করতে পারে জানতাম না, আজ দেখছি সব কিছুই সম্ভব মানুষের স্বার্থের কাছে! মাকেও আজ মূর্খ আমরা ভাগের মা করে ছেড়েছি।
