মনে পড়ে আজ হেমন্তের অপরাহ্ন পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে বেড়াতে বেরুতাম–সবুজ ঘাসে-ঢাকা মাঠের মধ্য দিয়ে, কোনোদিন মেঘখালির পুলের উদ্দেশ্যে, কোনোদিন বা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সড়ক ধরে অনির্দেশের পানে। দু-ধারে প্রসারিত ছিল শ্যামল বঙ্গজননীর এক নয়নাভিরাম রূপ। মেঘশূন্য নীলাকাশের বুকে লাগত বিদায়ী অরুণের রক্তরাঙা অনুলেপন, ঘাটে-মাঠে-বাটে লাগত অস্তরাগের ছোঁয়া। হারিয়ে গেছে সে দিনগুলো, হারিয়ে গেছে চিরতরে। বন্ধুরাই বা কে কোথায় হারিয়ে গেল জীবনস্রোতের কুটিল আবর্তে, কে বলবে?
গ্রামের একটা প্রধান অংশ কালীবাড়ি। নদীর পাড়ের এই কালীমন্দিরটির কথা শুনে এসেছি ছোটোবেলা থেকেই। জাগ্রতা কালীমাতা। কত অলৌকিক কাহিনির জনশ্রুতি প্রচলিত এই কালীপ্রতিমা সম্বন্ধে। নিশুতি রাতে লালপেড়ে শাড়ি পরে ঘুরে বেড়াতে নাকি দেখা যেত তাঁকে এই কালীবাড়ির বাঁধানো চত্বরে, কিন্তু চরম দুর্দিনে পাষাণী মা পাষাণীই রয়ে গেল।
বেশিদিনের কথা নয়। বছর খানেক আগেও হরিসংকীর্তনে, যাত্রাগানে এই মন্দির-প্রাঙ্গণ হয়ে উঠত মুখরিত। তাতে কুণ্ঠিত হয়নি মুসলমান জনসাধারণ অংশগ্রহণ করতে। কৃষ্ণবিরহ বিধুরা রাধার দুঃখে তারাও হিন্দু শ্রোতাদের মতো সমানভাবে ফেলেছে সমবেদনার অশ্রুরাশি। পদ্মপুরাণের গানে, কথকতার আসরে, রামায়ণগানে, ত্রৈলোক্যঠাকুরের মেলায় এরাও নিয়েছে মুগ্ধ শ্রোতার অংশ। সমানভাবেই পদ্মপুরাণের গানে তারাও ধুয়া ধরেছে—’বেউলা বলে লখিন্দর, পূর্বকথা স্মরণ করো।’ সানন্দেই তারা গ্রহণ করেছে ত্রৈলোক্যঠাকুরের প্রসাদি গঞ্জিকার অংশ, উচ্চকণ্ঠে গান ধরেছে ভক্তবৃন্দের সঙ্গে—’ত্রৈলোকের মেলারে ভাই যে করিবে হেলা। হস্ত যাবে, পদ যাবে, চোখে বেরুবে ঢেলা।’ হস্তপদ যাওয়ার ভয়েই হোক বা হিন্দু ভাইদের সঙ্গে সম্প্রীতির ফলেই হোক ত্রৈলোক্যঠাকুরকে অবহেলা করেনি তারা। সেই দিনগুলোর কথা আজ মনে হয় বুঝি বা স্বপ্ন। কৈশোরের লীলানিকেতন পল্লিমায়ের বুকে যাদের সাহচর্যে শুরু হয়েছিল আমার জীবনের প্রথম পথচলা–তারা সবাই হারিয়ে গেছে আজ। দুর্যোগময়ী রজনীর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথমাঝে তারা ছিটকে দূরে গড়িয়ে পড়েছে শত যোজনের ব্যবধানে। কেউ বা তাদের পথ খুঁজে পেয়েছে–কেউ বা পথ খুঁজে মরছে এখনও।
মহেশদাকে মনে পড়ে। একমুখ দাড়িগোঁফে আচ্ছন্ন বেঁটে কালো লোকটি। সদাহাস্যময় মুখ। গ্রামের সব কাজে অগ্রণী। আমাদের সর্বজনীন ‘দাদা’–সকলেরই শ্রদ্ধেয়। বয়স প্রায় ঘাটের কোঠায় পোঁছেছে, দেহের বাঁধন অটুট। কালীবাড়ির বার্ষিক উৎসবে চাঁদা তোলার ব্যাপারে–রাত জেগে পাহারা দেওয়ার জন্যে শখের রক্ষীদলে আমরা মহেশদাকে পেতাম সর্বাগ্রে। খুবই উৎসাহ ছিল বৃদ্ধের। পাহারা দেবার সময় হাঁক দেওয়ার ব্যাপারে জুড়ি ছিল না তাঁর। লাঠিটা সোজা করে তার ওপর ঝুঁকে পড়ে উচ্চকণ্ঠে হাঁক দিতেন মহেশদা-–’বস্তিওয়ালা জা—গো–রে।’ আমরা বলে উঠতাম সব—‘হেঁ—ই–ও।’ এখনও আছেন মহেশদা। তবে নিশুতি রাতে গ্রামের বুকে তাঁর খড়মের শব্দ এখনও ধ্বনিত হয় কি না তা বলতে পারি না।
মনে পড়ে কালবৈশাখীর চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব মুখরিত দিনগুলোর কথা। রাত জেগে বাবার চোখ এড়িয়ে দেখতে যেতাম গাজনের মেলা। গ্রামের অশিক্ষিত জনসাধারণ সং সেজে করত কত উৎকট আনন্দের পরিবেশন। অনেক সময় শ্লীলতার সীমা যেত ছাড়িয়ে। তবু কী আনন্দই না পেতাম সেই গ্রাম্য উৎসবের মধ্যে। জিহ্বা ফুটো করে লোহার শিক ঢুকিয়ে উৎসব-প্রাঙ্গণে নৃত্য করত সেইসব পূজারির দল। সারারাত জেগে শ্মশানে গিয়ে দেখতাম কালী হাজরার ‘রাতের ভোগে’র উৎসব। ভোরবেলায় জাগরণক্লিষ্ট দেহে চুপি চুপি বাড়ি ফিরে শুয়ে পড়তাম বিছানায়। অবাক হয়ে যেতাম ‘কেতু সন্ন্যাসী’র দেহে দেবতার আবির্ভাবের উত্তেজনায়। কী মধুর, কী আনন্দময় মনে হত সে কালটা!
বিজয়া দশমীর কথা ভুলব কী করে? ফটিকজানির বুকে আশপাশের সমস্ত গ্রাম থেকে এসে জড়ো হত প্রতিমা। খেয়াঘাট থেকে শুরু করে এপারের জেলেপাড়ার ঘাট পর্যন্ত ভরে যেত নৌকায়-নৌকায়। তিলধারণের ঠাঁই থাকত না সারানদীতে। নৌকার ওপরে চলত নাচ গান, লাঠিখেলা, সংকীর্তন–আমোদ-উৎসবের হইহুল্লোড়। গাঙের বুক মথিত হয়ে উঠত বাইচ খেলার নৌকার তান্ডব নর্তনে। সে খেলায় বেশির ভাগ অংশই গ্রহণ করত মুসলমানরা।
আশপাশের গ্রামের প্রায় সমস্ত নিরীহ মুসলমান কৃষকদের সঙ্গেই ছিল আমাদের অকৃত্রিম হৃদ্যতা। তারি ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। অশীতিপর বৃদ্ধ তারি ভাইয়ের সঙ্গে যখনই দেখা হত, পথের মাঝে জিজ্ঞাসা করতাম–’কেমন আছ তারি ভাই?’ ভালো করে চোখে দেখত না সে। শব্দ লক্ষ করে কাছে এসে মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে ঠাহর করে নিয়ে বলে উঠত-–’কে ভাই? অ, নাতিঠাকুর! এই একরহম আছি। তা তুমি কুঠাই যাবার লাগছ?’ তারপর সেই রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়েই চলত এ গল্প, সে গল্প, তার ছেলেদের দুর্ব্যবহারের কথা। তারপর ঠকঠক করে আবার চলত সে গন্তব্যস্থলের দিকে। এখনও বেঁচে আছে তারি ভাই। গাঁয়ের বুকে এখনও বোধ হয় তার লাঠি ঠকঠক শব্দে ঘুরে বেড়ায়।
আর একজনের কথা মনে পড়ে। ফজু ঢুলি–গ্রামের চৌকিদার। রাস্তায় যখনই দেখা হত তার সঙ্গে আভূমি নত হয়ে বলে উঠত ‘সেলাম কর্তা সেলাম। হেসে জিজ্ঞাসা করতাম –’ভালো আছ?’ সে আবার সেলাম করে বলে উঠত—’আজ্ঞে, খোদায় রাখছে ভালো।’ মনে পড়ে কত রাত্রে ঘুম ভেঙে যেত তার পরিচিত কণ্ঠের আহ্বানে—’কর্তা, জাগেন।’ তারা তো আজও আছে, আজও বোধ হয় ফজু চৌকিদার তার টিমটিমে লণ্ঠনটি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় নিশুতি রাত্রে পল্লির রাস্তার রাস্তায়–নিশীথের নিস্তব্ধতা ভেদ করে তার কাংস্যকণ্ঠ ধ্বনিত হয়—’বস্তিওয়ালা জা—গো–রে।’ হঠাৎ ঘুম ভেঙে-যাওয়া এক শিশু হয়তো চিৎকার করে কেঁদে ওঠে কোনো বাড়িতে। উৎকট চিৎকারে বিরক্ত হয়ে একটা নিশাচর পাখি হয়তো উড়ে যায় এগাছ থেকে ওগাছে ডানার ঝটপটানিতে অনধিকার প্রবেশের প্রতিবাদ জানিয়ে।
