লক্ষ লক্ষ গ্রামে গাঁথা এই বঙ্গভূমি। এরই শতকরা নিরানব্বইটা গ্রামের মতো অতি সাধারণ–অতিনগণ্য আমার পল্লিজননী। ইতিহাসের স্থায়ী আসন করে নেবার মতো মূলধন নেই তার–পারেনি কোনো মহামানবের জন্ম দিয়ে প্রসিদ্ধি অর্জন করতে। তবু তাকে ভালোবাসি–শত দোষত্রুটি, শত দীনতা সত্ত্বেও প্রাণের চাইতে ভালোবাসি আমার পল্লিজননীকে। এর আম্রবীথি-ঘেরা ঝিঁঝি ডাকা ধূলিধূসর পথের প্রত্যেকটি ধূলিকণা আমার পরিচিত, আমার অতীত স্মৃতি রয়েছে বিজড়িত হয়ে পথিপার্শ্বস্থ প্রত্যেকটি বৃক্ষের পত্রপল্লবে। তাই আমার পল্লিমায়ের কথা স্মরণ করে শতযোজন দূরে বসেও আমার হৃদয় হয়ে ওঠে এক অপূর্ব মধুর রসে আপ্লুত।
গ্রামের দু-দিক বেষ্টন করে রেখেছে সমকোণীভাবে ক্ষীণকায়া একটি ছোটো নদী। নদী। বলা চলে না ঠিক–একটা বড়ো খাল বললেই যথেষ্ট। তবু আমরা একে বলে এসেছি নদী। ফটিকজানি। চৈত্র মাসে জল শুকিয়ে যায় হাঁটুজলের বেশি থাকে না। নদীর নামকরণ নিয়ে মাথা ঘামাইনি, ফটিকের মতো স্বচ্ছ জলের অভাবে অনুযোগও করিনি কোনোদিন। বর্ষার দিনে দু-কূলপ্লাবী স্রোতস্বিনীর কর্দমাক্ত জলের বুকেই ঝাঁপিয়েছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গা ভাসিয়ে দিয়ে ভেসে উঠেছি গিয়ে শ্মশানঘাটে, কালীবাড়িতে, কোনোদিন বা খেয়াঘাটে।
উত্তরপাড়ার সেনেদের বাঁধানো ঘাটে দুপুরবেলায় ভিড় জমত পাড়ার মেয়েদের। সত্তর বছরের বুড়ি ঠাকুমা থেকে শুরু করে পাঁচ বছরের নাতিনাতনি খেদি, পটলা, খুকি পর্যন্ত। স্নান করতে করতে চলত কত হাসি, কত গল্প, কত রং-তামাশা। মায়েরা বাচ্চাদের ধরে ধরে জোর করে সাবান মাখাতে বসত–আর সেই সব ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের সমবেত কান্নায় ঘাটের আকাশ-বাতাস উঠত মুখরিত হয়ে। তারই মধ্যে যত রাজ্যের চলত গল্প। ‘অ দিদি, কী রান্না হল আজ?’ ‘কী যে করি ভাই, ছোটো খুকিটার ক-দিন থেকে জ্বর হচ্ছে। ছাড়ছে না কিছুতেই।’ ‘ও মা! তাই নাকি! পোড়ামুখো কী আবার ষাট বছরে বিয়ে করতে যাচ্ছে নাকি?’ এমনি আরও কত শত কথা।
বর্ষায় স্ফীত ফটিকজানি দুকূল ভাসিয়ে দিত মাঝে মাঝে। মনে পড়ে কী অপরূপ পরিবেশের সৃষ্টি করত জ্যোৎস্নাস্নাত তটিনীর অতুলনীয় রূপমাধুরী। অপূর্ব মোহাবেশের বিস্তার করত ফটিকজানির সেই নৈশ রূপমাধুর্য। কত চাঁদিনি রাতে ডিঙি ভাসিয়ে দিয়েছি আমরা ফটিকজানির সেই শান্ত সমাহিত বুকের পরে! বাঁশির সুরে ভরে দিয়েছি নিশীথ রাত্রির আকাশ-বাতাস। জ্যোৎস্নাবিধৌত পল্লির অপরূপ রূপের তুলনা নেই কোথাও। রূপকথায় শোনা স্বপনপুরীর রূপমাধুর্যও হার মানে তার কাছে। গাঁয়ের মধ্যে আমরা কয়েকজন ছিলাম ডানপিটে। কত নিশুতি রাতে দলবেঁধে আমরা মৎস্যশিকারের উদ্দেশ্যে অভিযান করেছি খ্যাতনামা সাতবিলের দিকে। কত কিংবদন্তি প্রচলিত ছিল এই বিলের নামে! অভিশপ্ত প্রেতাত্মা, অশরীরী কত আত্মা নাকি ঘুরে বেড়ায় সাতবিলের ওপর দিয়ে। প্রত্যক্ষদর্শী কত মৎস্যশিকারির মুখে শুনেছি এসব কাহিনি–অবাক হয়ে গিয়েছি রামনামের অত্যাশ্চর্য মহিমায়–তখন বিশ্বাস করেছি তাদের সে সমস্ত অতিরঞ্জিত কল্পিত ভয়-কাহিনি। মনে পড়ে রামকান্ত মাঝির কথা। আমাদের প্রজা ছিল সে। আমাদের বাড়ির পাশেই বাড়ি। কত রাত্রি জেগে যে রামকান্তদার কাছে বসে এই সমস্ত মৎস্যলোভী অশরীরীদের গল্প শুনেছি তার হিসেব নেই। জাল বুনতে বুনতে গল্প বলত রামকান্তদা। তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা নাকি সেসব। আমার শিশুমনের ওপর সে কাহিনিগুলো বিস্তার করত এক অপূর্ব মায়াজাল। তারপর বড়া হয়ে কতদিন অভিযান করেছি অপদেবতা অধ্যুষিত সাতবিলে–যোগীমারা দহের স্থির স্তব্ধ জলরাশির ওপর দিয়ে। কিন্তু কোনোদিনই সৌভাগ্য হল না সেই অশরীরী আত্মাদের দর্শন লাভের; কোনো অবগুণ্ঠনবতী রমণী কোনোদিন আমার কাছে এসে আনুনাসিক সুরে প্রার্থনা করল না মাছ। মধুর সে সমস্ত দিনগুলোর স্মৃতি কী করে ভুলব?
গ্রামের প্রধান অংশ মুনশিপাড়া। বনেদি জমিদার এ পাড়ার প্রধানরা। বাড়িগুলো এদের পড়ে আছে আজ পরিত্যক্ত মরুভূমির মতো। আগাছার ঝোঁপঝাড়ে ভরে আছে গ্রামের রাস্তাঘাট। দিনের বেলায়ই ভয় হয় পথ চলতে। এমনটি কিন্তু ছিল না কোনোদিন।
মুনশিদের উদ্যানের ভগ্নাবশেষের পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়েই পৌঁছোতে হয় ভাঙা-পুলের বুকে। সাহাপাড়ার মধ্যে অবস্থিত সে পুলটি। সংকীর্ণ একটি খালের মধ্য দিয়ে গাঙের জলরাশি এসে আছাড়ি-বিছাড়ি পড়ে ওই পুলের তলদেশে। শত শত আবর্তের সৃষ্টি করে বয়ে যায় বাঁশঝাড়ে রচিত তোরণের মধ্য দিয়ে কর্মকার পাড়ার দিকে। আপরাহের পড়ন্ত রোদে গাঁয়ের ছেলেদের আড্ডা বসত পুলের ওপর–গল্পে, উচ্চহাসিতে, হইচইতে কেটে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পৃথিবীর বুকে নেমে আসত ক্রমে রাত্রির যবনিকা।
কামারপাড়ার বাঁশঝাড়ে ঢাকা গতিপথে গিয়ে খালটি মোড় ফিরেছে পদ্মিনী বুড়ির বাড়ির কাছে। ফিরে বইতে শুরু করেছে সাতুটিয়ার পুলের দিকে। মনে পড়ে পদ্মিনী বুড়ির কথা। কতদিন স্কুল পালিয়ে হানা দিয়েছি বুড়ির কাশীর কুলগাছে-কাঁচা-মিঠে আম গাছে। কাংস্যকন্ঠ সপ্তমে চড়িয়ে মুড়ো ঝাঁটা নিয়ে দৌড়ে এসেছে বুড়ি-ভগবানের কাছে আবেদন করেছে আমাদের চোদ্দো পুরুষের কায়েমি নরকবাসের জন্যে। পঞ্চাশ সালে গলেপচে মারা গেল পদ্মিনী বুড়ি অশেষ কষ্ট পেয়ে।
