আমাদের গ্রামটি ছিল হিন্দুপ্রধান। দুরে মুসলমানপাড়া থেকে তারা আসত ধান কিনতে, কিংবা দেনাপাওনার ব্যাপার নিয়ে। কিন্তু যার সঙ্গে আন্তরিকতা ছিল সারা গ্রামের সে হচ্ছে দাসু ফকির। মুসলমান হয়েও হিন্দুর আচার-ব্যবহারে সে শ্রদ্ধাশীল। তন্ত্রমন্ত্র, ভূত-তাড়ানো ইত্যাদি ব্যাপারে তার হাত ছিল পাকা। তেলপড়া, জলপড়া দিতে নিত্যই তাকে আসতে হত আমাদের গ্রামে। তার দেওয়া মাদুলি আমার শরীরেও শোভাবর্ধন করছে। ফকিরের অবাধ যাতায়াত ছিল সব বাড়িতেই। ছেলে কেমন আছে গো’ বলে ঢুকত সে বাড়ির মধ্যে–তারপর চলত তুকতাকের মহড়া! বিড়বিড় করে মন্ত্রপাঠ করে ফুঁ দিয়েই সে রোগ তাড়াত; দেখে অবাক হয়ে যেতাম। তার কান্ডকারখানা আজকেও বিস্ময় জাগায়। জিন গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে সে আমাদের বাড়িমুখো এগুতেই তাকে সেবার প্রশ্ন করেছিলাম—’এ বছরটা কেমন যাবে রে দাসু ফকির?’ অসংকোচে গম্ভীর হয়ে সে জবাব দিয়েছিল—’খুব দুর্বছর! তুফান হবে, কলেরা-বসন্তে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। মহামারি লাগবে দেখো কীরকম জোর।‘ অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়। সেবারেই গাঁ উজাড় হয়ে গেল–বাংলাদেশে মানুষ পশুর পর্যায়ে নেমে এসে মৃত্যু-বন্যায় ভেসে গেল! তখন ভাবিনি এমনভাবে দেশ ভাগ হয়ে দাসু ফকিরের কথা সত্যি প্রমাণিত হবে।
গ্রামের সবচেয়ে আনন্দের দিন ছিল দুটি–একটি শ্রাবণী সংক্রান্তি, অপরটি চৈত্র সংক্রান্তি। সাপের ভয়ে পূর্ববাংলার গ্রামবাসীরা সর্বদাই ভীত। প্রতিবছর সাপের কামড়ে মারা যায় বহুলোক। তাই মা মনসাকে তুষ্ট করার জন্যেই প্রতিবাড়িতে ব্যবস্থা হয় মনসা পুজোর। সামর্থ্যানুযায়ী পুজোর আয়োজন। হাঁস, পাঁঠা, আর কবুতর বলি থেকে কুমড়ো পর্যন্ত বলি দেওয়া হত। অতিপ্রত্যূষেই ছেলেরা বিছানা ছেড়ে জমা হত খালের ধারে। সূর্যকিরণে খালের জলের ঢেউ চিকচিক করছে, দূরে দেখা যাচ্ছে ছোটো ছোটো নৌকা। ছেলে-বুড়ো খালের জলে ডুব দেয়, ডুব দিয়ে উঠে বসে। হাত চালিয়ে শাপলা ফুল তুলে নৌকো নেয় ভরে। ফিরে এসে সব বাড়িতে বাড়িতে সে ফুল ভাগ করে দেয় তারা। পুজোর ফুলের জন্যে ভাবতে হয় না কাউকেই। যে বাড়িতে পুজো নেই তারাও ফুলের ভাগ থেকে বাদ পড়ে না। শাঁখ, কাঁসর, ঘণ্টা বাজিয়ে আরম্ভ হয় মনসা পুজো। সন্ধ্যায় সন্ধ্যারতি। ছেলেরা মহা উৎসাহে বাজনার মহড়া দেয়, কাউকে ডাকার প্রয়োজন নেই, মান-সম্মানের কোনো বালাই নেই, সকলেই আসে স্বেচ্ছায়। ছেলেদের হাতে দেওয়া হয় না। এরই মধ্যে মিশে রয়েছে আন্তরিকতার সুর। চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষ্যেও সেই একই মিলনের সুর বেজে উঠত পল্লিজীবনে। কিন্তু আজ আর সে সুর নেই, বেসুরো জীবন অনির্দিষ্টের পথে এগিয়ে চলেছে।
অদূরে কংস নদীর কূলে কূলে কত প্রান্তর, কত অরণ্য–মাঝে মাঝে এক-একটি পল্লি প্রতিমা। নদীর তীরে নিত্য আসে তরুণ রাখালেরা গোরু-মোষ চরাতে। পাশে অরণ্য, ধু-ধু প্রান্তর–ভয় লাগে তাদের মনে। অজ্ঞাত প্রিয় বান্ধবীর গাওয়া গান সুর ধরে গাইত তারা,
মইষ রাখো মইষাল বন্ধুরে কংস নদীর কূলে,
(অরে) অরণ্য মইষে খাইব তোরে বাইন্ধা নিব মোরে।
নির্জনতা ভেঙে খানখান হয়ে যেত রাখালের সেই গানে, ভয়ডর সব দূর হয়ে যেত মন থেকে। বন্ধুর জন্যে কী আকুলতাই না ফুটে উঠত সে গানে, সে সুরে। আজ আমরা যারা দেশছাড়া হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি, তাদের জন্যে কোনো প্রতিবেশী বন্ধু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেছে জানতে পারলে এ দুঃখের মধ্যেও কত শান্তি পাওয়া যেত।
কত কথা, কত ব্যথা আজ মনকে ভারাক্রান্ত করছে–সমস্ত আন্তরিকতা, সহৃদয়তার এমন সলিলসমাধি হবে কে জানত! শ্রীদাম ধোপার অকালমৃত্যু বা অনিলদার আকস্মিক জীবনাবসান সমস্ত গ্রামের চোখে জল এনেছিল একদিন, আর আজ সমস্ত বাঙালি জাতির অপমৃত্যুতে কারও ভ্রূক্ষেপই নেই দেখে মন অবশ হয়ে আসছে।
.
কালীহাতী
প্রভাতের আরক্ত তপন পুব আকাশে উঁকি দেন–ধরণীর মুখের উপর হতে অন্ধকারের অবগুণ্ঠন উন্মোচিত হয়ে যায়। তন্দ্রাচ্ছন্ন মহানগরীর বুকে জাগরণের সাড়া পড়ে। শুরু হয় কর্মক্লান্ত জীবনের পথে দিবসের পথচলা। ছন্নছাড়া অভিশপ্ত মানুষের দল ভিড় করে রাস্তার মধ্যে খুঁজে বেড়ায় অন্তহীন তমিস্রার মাঝে সমুখের উদীয়মান পথরেখা।
কোলাহলমুখরিত নগরীর বুকে আমারও আত্মকেন্দ্রিক জীবনের শুরু হয় লক্ষ্যহীন পদক্ষেপে। প্রভাতের নবারুণ আমার জীবনে আনে না কোনো নতুন আশার আলো, শোনায় না কোনো উদ্দীপনার অগ্নিমন্ত্র। সে যে পথভ্রষ্ট জীবনপথে ছন্দহীন পথচলা। কর্মহীন বেকার জীবনে মনের খোরাক নিঃশেষ হয়ে আসে–জীবনীশক্তিও শেষ হতে চায় বুঝি! সীমাহীন দুঃখের মধ্যেও মনের কোণে ঝংকার তোলে শুধু অতীতের গর্ভে বিলীয়মান দিনগুলোর মধুময় স্মৃতি। পশ্চাতের অতিক্রান্ত পথের বুকে ছোটো-বড়ো পদচিহ্নগুলো আমার মিশে আছে সুদূর অতীতের পাতায় পাতায়–ফেলে বুকের পরে। তারা টানে–আমায় নিরন্তরই টানে।
লোকে বলে—’জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।‘ স্বর্গের অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ নই আমি। কিন্তু স্বর্গাদপি গরীয়সী পল্লিজননীর স্নেহের আস্বাদ পেয়েছি–খুব বেশি করেই পেয়েছি। তাই তাকে ভুলতে পারি না কল্পনাও করতে পারি না ভুলে যাবার। ভাবতে গিয়ে হৃদয় ব্যথাতুর হয়ে ওঠে–পল্লিমায়ের কোল হতে বিচ্যুত হয়ে যাবার কথায়। বেদনাবিধুর হৃদয়ের বেলায় বেলায় ‘আছাড়ি বিছাড়ি’ পড়ে শত সহস্র বিক্ষুব্ধ তরঙ্গরাশি।
