জলে ছলছল চোখ-দুটির সামনে কেবলি ভেসে উঠছে গ্রাম্য স্কুলের শান্ত মধুর চিত্র। আমগাছের ছায়ায় জটলা করছে ছেলের দল, কেউ বা ঢিল দিয়ে কচি আম পাড়তেই ব্যস্ত, হঠাৎ শোরগোল উঠল–”হেডমাস্টার আসছেন রে।’ মুহূর্তে সমস্ত লোভ সংবরণ করে ছেলেরা দৌড় মারল যে যেদিকে পারে। হেডমাস্টারমশাইকে বড়ো ভয় করত ছেলেরা তাঁর ব্যক্তিত্বের জন্য–ইংরেজিতে তাঁর জ্ঞানও ছিল অসাধারণ। চমৎকার ইংরেজি বলতে পারতেন তিনি। শুধু বরদাবাবুই নন, এ স্কুলের কথা উঠলেই মনে পড়ে গঙ্গাচরণবাবু, উমেশবাবু প্রভৃতির সহৃদয়তার কথা। পাশের গ্রাম বারহাট্টায় উচ্চ ইংরেজি স্কুল হবার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের গ্রামের স্কুলের আকর্ষণ কমে আসে। কোনোরকমে আরও কিছুদিন চলার পর এতদিনের ঐতিহ্যময় স্কুলটি শূন্যে মিলিয়ে গেল।
বারহাট্টা স্কুলের নামের সঙ্গে আর দুটি নাম জড়িয়ে রয়েছে। তাঁরা হচ্ছেন তার প্রতিষ্ঠাতা মোহিনী গুণ আর শশী বাগচি। বহুশক্তিক্ষয় করে, অর্থব্যয় করে স্কুলের প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা। কতবার কত দুর্যোগ এসে স্কুলটিকে বিপন্ন করে তুলেও উঠিয়ে দিতে পারেনি, জানি না আজ স্কুলের প্রাণশক্তি আর কতটুকু অবশিষ্ট আছে। একদিনের ভয়াবহ ঘটনা মনে পড়ে। রাত্রে হঠাৎ শত্রুপক্ষীয় কেউ স্কুলের খোঁড়া ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়–সে দৃশ্য ভাবলে আজকে এতদূরে থেকেও রোমাঞ্চ লাগে। শিক্ষাসংস্কৃতির মুখাগ্নি করেই তো দেশব্যাপী সূত্রপাত হয় বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের! সুকুমার বৃত্তির এই নির্বাসন কেমন করে কার উস্কানিতে সম্ভবপর হল তা জেনেও আমরা মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে অগ্রসর হইনি সেই অশুভ শক্তিকে।
বিদ্যালয়-ভবনে ওই অগ্নিকান্ডের স্মৃতি কতৃপক্ষকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি,–জিদ এবং উদ্যম আরও যেন বেড়ে গিয়েছিল এরপর থেকে। আমাদের গ্রামে শিক্ষার প্রচলন দেরিতে শুরু হলেও তার অগ্রগতি হয়েছিল খুব দ্রুত। সংস্কারাচ্ছন্ন ব্রাহ্মণ-প্রধান গ্রামে মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজন কেউ অনুভব করেননি প্রথমে, কিন্তু হঠাৎ অমূল্যদা, সুধীরকাকা প্রভৃতির চেষ্টায় মেয়েদের স্কুল স্থাপনের প্রস্তাব হল। তখন গ্রামে সে কী প্রাণস্পন্দন! ছোটো ছোটো বঞ্চিত মেয়েদের মুখে সে কী অফুরন্ত হাসি! মহকুমা হাকিম স্বয়ং এসে স্কুল উদ্বোধন করলেন। আর এসেছিলেন শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। গ্রামের মেয়েরা শিক্ষা ও প্রেরণা পেলে কত ভালো কাজ করতে পারে, তার কথা সেদিনের সভায় অনেকেই শুনিয়েছিলেন। গ্রামের লোকেরা সমস্ত গ্রামটিকে ঝকঝকে তকতকে করে ভদ্রমন্ডলীর প্রশংসার্জনে সক্ষম হয়েছিল। আজ আর সে স্কুলে ছাত্রী নেই, তবুও পূর্ব সুখস্মৃতি মুছে যায়নি মন থেকে।
বিপিনের রামায়ণগান আর হেমুর ঢপযাত্রার কথা আমাদের গ্রামের প্রত্যেকটি লোকের মনে থাকার কথা। এদের অনুষ্ঠান সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় ছিল গ্রামে। সমস্ত ময়মনসিংহ জেলায় বিপিনের মতো গাইয়ে ছিল না বললেই হয়। সেই সত্তর বছরের বুড়ো কী করে হনুমানের ভূমিকায় অত জোরে লাফ দিত তা আজ ভেবে পাই না। একাই সব ভূমিকায় অভিনয় করার তার ছিল বিশেষত্ব–একবার হনুমান হয়ে ল্যাজ নাড়িয়ে আকাশ লক্ষ করে লাফ দেয়, পরক্ষণেই প্রভু রাম হয়ে তীরধনুক নিয়ে করে সমুদ্রশাসন, আবার পরমুহূর্তেই মিত্র বিভীষণ সেজে গান শোনায় বিপিন। তার গান লোকদের একাধারে হাসাত এবং কাঁদাত। পাতাল-অধিপতি দুষ্ট মহীরাবণ নানা ছদ্মবেশে প্রতারণা করতে আসছে হনুমানকে, কিন্তু তীক্ষ্ণবুদ্ধি হনুমানের কাছে বারবার মহীরাবণ হচ্ছে পরাজিত। অবশেষে বিভীষণের রূপ ধরে সে দুর্গে ঢুকে রাম-লক্ষ্মণকে চুরি করে পালায় পাতালে। হনুমান প্রকৃত বিভীষণের গলা ল্যাজে বেঁধে চিৎকার করে বলে—’ওরে পাপিষ্ঠ রাক্ষস, তুই মোর প্রভুরে করেছিস হরণ! মারি তোয় দূরিব প্রাণের জ্বালা!’ আবার পরক্ষণেই বিলাপবিধুর সুর শোনা যায়–’ওরে ভক্ত হনুমান, এরই জন্যে কি দাদার সাথে করেছিস কলহ?’ এসব অভিনয় দেখে এমন কোনো শ্রোতা থাকত না, যারা শুকনো চোখে বসে থাকতে পারত। বিশ্বাসঘাতক মহীরাবণ আজ সারাপৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে, বিপিনের মতো গলাধাক্কা দিয়ে আজ তাদের কে সরিয়ে দেবে? কে তাদের স্বরূপ প্রকাশ করে সমস্ত মানুষকে সাবধান করে দেবে বিপিনের মতো? সিনেমা-থিয়েটারের চেয়েও আকর্ষণীয় সেই গ্রাম্য যাত্রা শোনা আর কি কোনোদিন ভাগ্যে জুটবে–যেতে পারব কোনোদিন ছেড়ে-আসা গ্রামে, বিপিনের আসরে!
মনে পড়ে যোগেন্দ্রকে–পাগল ভবঘুরে হলেও আজ তাকেই বেশি করে মনে পড়ছে। ব্রাহ্মণ-সন্তান হয়েও ঘুরে বেড়াত চাষিপল্লির প্রতিটি ঘরে। তাদের সুখদুঃখের খবর নিত, তামাক খেত, গল্প করত প্রাণভরে। এই অমার্জনীয় অপরাধের জন্যে বেচারিকে মাতব্বররা একঘরে করে গ্রামছাড়া করেছিলেন।
আর একটা ঘটনা ভাবলে এখনও হাসি চাপতে পারা যায় না।
যোগেন্দ্রের পাশের বাড়িতে থাকত প্রসন্ন। একদিন প্রসন্ন চুপিচুপি যোগেন্দ্রের খিড়কি বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটছে, টের পেয়ে যোগেন্দ্র বাধা দিতে গেল, ফলে শুরু হল হাতাহাতি। রাগ সামলাতে না পেরে প্রসন্ন হাতের কুড়োলের হাতলি দিয়ে আঘাত করল যোগেন্দ্রের মাথায়, যোগেন্দ্রও ছাড়বার পাত্র নয়, সেও বসিয়ে দিল প্রসন্নের পায়ে এক লাঠি। মামলা হল প্রসন্নের অভিযোগে। নেত্রকোণায় তখন মুন্সেফ ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। হাকিমের প্রশ্নের উত্তরে আসামি জবাব দেয়–”হুজুর, ব্যাপারটা এই যে, প্রসন্নবাবু আমার দাদা হন। দাদা হিসেবে তিনি আমাকে আশীর্বাদ করতে পারেন সে কথা এক-শো বার স্বীকার করব। তাই দাদা যখন ভাইয়ের মাথায় অমানুষিকভাবে আশীর্বাদ করলেন তখন বাধ্য হয়েই আমাকেও দাদার শ্রীচরণে প্রণাম জানাতে হল। তবে সাধারণ নিয়মানুযায়ী প্রণামটা আগে হওয়াই উচিত ছিল! মনে পড়ে সে-দিন সমস্ত কোর্ট ঝলমলিয়ে উঠেছিল হাসির গমকে।
