প্রায় রোজ রাত্রেই বাউল গানের আসর বসত আমাদেরই বাড়িতে। এতে হিন্দু-মুসলমান সকলেই যোগ দিত। বঙ্গ-বিভাগের কিছুকাল পরেও চলেছিল এই আসর। গ্রাম্য জীবনের সেই বিমল আনন্দময় মুহূর্তগুলো আজ দুঃখের সঙ্গে মনে পড়ে। মনে পড়ে সকাল-বিকালের গল্পের আসরে তারাসুন্দরদার পান্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা, হুঁকো হাতে বিরাট গোঁফে চাড়া দিয়ে দ্বিজেন ডাক্তারের গল্প বলার অভিনব ভঙ্গি। তাস-পাশা-দাবার আসর–খেলাধুলার বৈকালিক আনন্দোৎসব, সেসব কি আর মন থেকে মুছে যেতে পারে?। আর সেই সঙ্গে মনে পড়ে ছিপ হাতে করে দল বেঁধে বঁড়শিতে মাছ ধরার অভিযানের কথা। ছোটোবেলায় আমরাও গিয়েছি বহুদিন। একালেও ছেলেরা যেত সেই বেতাই নদীতে, গাঁয়ের এ-পুকুর সে-পুকুরে বা ‘বগাউড়া’ বিলে কিংবা জোঁকার হাওরে। এই বগাউড়া বিলের সঙ্গে রায়বংশের একটি কিংবদন্তি জড়িত। বাড়ির ঠিক পিছনের সীমানা থেকেই এ বিল আরম্ভ হয়েছে বলা চলে। অতীতে এই বংশের লোকেরা নাকি অতিকায় ছিলেন–এত বিরাট বলিষ্ঠ চেহারা এ অঞ্চলে নাকি আর ছিল না। কয়েক পুরুষ পূর্বে মুকুন্দ রায়ের সুপ্রশস্ত বক্ষপটের মাপে একখানা ‘পদ্মপুরাণ’ পুস্তকের মলাট তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় পৌনে একহাত লম্বা এই মলাটখানি এখনও তাঁর বিরাট চেহারার সাক্ষ্যস্বরূপ বিদ্যমান। মধ্যাহ্নভোজনের পর রায়েদের সেঁকুরের শব্দে বিশ্রামরত বকগুলো নাকি বিল থেকে যেত উড়ে এবং তাই থেকেই নাকি এর নাম হয়েছে বগাউড়া (বগা = বক) বিল। আর জোঁকার হাওর-বৈশিষ্ট্যে এ বিল বোধ হয় বাংলাদেশে অদ্বিতীয়। এ বিলে অসংখ্য জোঁক সর্বদা কিলবিল করে বেড়ায়-বর্ষায় নতুন জল যখন আসে তখন সেখানে পা দিলে একমিনিটেই জলের নীচের সমস্ত অংশটি জোঁকে ভরে যায়। এই জোঁকের জন্যেই বোধ হয় এরূপ নামকরণ হয়ে থাকবে এ জলাশয়ের। কিন্তু আসল বৈশিষ্ট্য এর মাটিতে। এত এঁটেল মাটি অন্য কোনো স্থানে পাওয়া দুষ্কর। বর্ষায় এ মাটি পায়ে এমনভাবে জড়িয়ে যাবে যে, সহজে ধুয়ে তোলা যায় না। গ্রীষ্মে পাথরের মতো শক্ত, কোদাল দিয়ে কাটা যায় না। বজ্ৰাদপি কঠোরানি মৃদুনি কুসুমাদপি’ কথাটা যদি মাটির বেলায় প্রয়োগ করা যায়, তাহলে এই জোঁকার হাওর সম্বন্ধেও প্রয়োগ করা চলে। গ্রীষ্মকালে সমস্ত বিলটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। তখন এর মাটি কাটার মজুরও পাওয়া যায় না! মজুররা বলে জীবনে তারা এমন মাটি দেখেনি। ফাটলের ভেতর কোদাল চালিয়ে পাথরের টুকরোর মতো এক-একটি টুকরো বার করতে হয়। এ সবই এখনও তেমনি আছে, শুধু নেই আমরা।
.
বারোঘর
বহুদুঃখের মধ্যেও স্মৃতিঘেরা অতীতকে মনে পড়ে। বিগত দিনের সুখ, আনন্দ উৎসব আজ লাঞ্ছিত জীবনেও কেন মাথা ছুঁড়ে বড়ো হয়ে দেখা দিচ্ছে জানি না। কলকাতা মহানগরীর প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে কেন যেন কেবলই আমার গ্রামের চাষিদের ছোটো ছোটো শান্তিনীড় খড়ের ঘরের ছবিই ভেসে উঠছে বারবার। সেই খাল, কে কবে কেটেছিল জানি না, কিন্তু বর্ষার নতুন জলে খালের প্রাণে যে জোয়ার জাগত আজও তা স্পষ্ট মনে রয়েছে। নতুন বর্ষার জলনিকাশের খাল দিয়ে যে দেশের মধ্যে রাজনৈতিক কুমির এসে মানুষকে ঘরছাড়া করবে তা আগে কে ভাবতে পেরেছে! স্বস্তিতে ভরা আমাদের জীবনের দিনগুলোকে এমনভাবে এলোমেলো করে দিয়ে কোন মহাপ্রভু কতটুকু বাজি জিতলেন তার হিসেব আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষরা পাব না। তবে আমাদের রক্তে জয়তিলক কেটে আজ অনেকেই স্ফীত হয়ে উঠেছে তা চোখের সামনেই দেখছি। কিন্তু গরিব হিন্দু বা মুসলমান কতটুকু লাভবান হয়েছেন এই হানাহানিতে?
আমাদের গ্রামের নাম ‘বারোঘর’। এ নামের উৎপত্তি হল কোথা থেকে তার স্পষ্ট কোনো ইতিহাস না থাকলেও যতদূর জানা যায়, পূর্বকালে বারোজন প্রসিদ্ধ মহাপন্ডিতের বাস ছিল এই গ্রামটিতে। মুক্তাগাছা, গৌরীপুর, রামগোপালপুর, কালীপুর প্রভৃতি ময়মনসিং জেলার নামকরা জমিদারদের টোলের পন্ডিত ছিলেন এই বারোজন ব্রাহ্মণ। তাঁদের পান্ডিত্যে নেত্রকোণা মহকুমা এই গ্রামের সম্মান বৃদ্ধি করেছে নানাদিক থেকে। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সকলেই তাই আমাদের গ্রামটিকে সম্মান এবং সমীহ করে চলত। এই বারোজন ব্রাহ্মণকে কেন্দ্র করেই ‘বারোঘর’ গ্রামের সূচনা। পাশ্চাত্য শিক্ষা যখন অন্য সব গ্রামকে কবলিত করেছে, তখনও এই গ্রাম সযত্নে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে এড়িয়ে চলে আসছিল, কিন্তু কালের কুটিল গতিতে সবই একদিন ভেসে গেল। টোল ছেড়ে ছেলেরা স্কুল-কলেজে ঢুকতে লাগল। ছোটোবেলায় দেখেছি কত দূর দূর থেকে লোক আসত আমাদের গ্রামে বিধান বা ব্যবস্থা নেবার জন্যে–কেউ শ্রাদ্ধের, কেউ বিয়ের, আর কেউ বা প্রায়শ্চিত্তের।
‘বাবোঘর’ প্রাইমারি স্কুল, কাশতলা মাইনর স্কুল’ এ দুটি বিদ্যায়তন এ অঞ্চলে বহু প্রাচীন। বৃদ্ধদের মুখে শুনেছি এখানে পড়েনি এমন বড়ো কাউকে পাওয়া যাবে না। প্রায় সকলের বাপ-ঠাকুরদাই এই স্কুল দুটির ছাত্র ছিলেন। দূর গ্রাম থেকে খালি গায়ে খালি পায়ে হেঁটে ছেলেরা আসত বিদ্যার্জন করতে। শিক্ষক ছিলেন মাত্র দুজন। বেড়াছাড়া, চালা-দেওয়া ঘরের মাঝখানে বসতেন মাস্টারমশাই আর তাঁকে বেষ্টন করে বসত ছাত্রবৃন্দ। স্কুলের চারপাশের ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে সাদা হয়ে ফুটে রয়েছে গন্ধহীন কত শেতকড়ি ফুল। পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ায় স্কুলকে কুঞ্জবন বলে ভুল হলেও কোনো দোষ দেখি না! ভাবতেও বুক ফেটে যায় আজ যে, সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা গ্রামটির কী কদর্য রূপই না হয়েছে। সেই নীরব কুঞ্জ আজ জঙ্গলাকীর্ণ, গ্রামবাসী দেশছাড়া, নির্জন নিভৃত গ্রামে সকাল-সন্ধে আজ কেবলি শেয়াল ডাকছে। সাপের ভয়ও নাকি খুব বেড়ে গেছে শুনেছি। কালসাপের ছোবলে লখিন্দরের মতো আমরাও মৃত্যুপথযাত্রী, এ ছোবল থেকে মুক্তি দেবার মতো শক্ত জবরদস্ত রোজার সন্ধান পাইনি। লখিন্দর শেষে প্রাণ পেয়েছিলেন, সম্পত্তি পেয়েছিলেন বলে জানি, কিন্তু আমরাও কি পাব সেসব কোনোদিন? বিষে বিষে নীলকণ্ঠ হয়ে উঠেছি! বিষয়ের পন্থা কী তা আমাদের অজানা থেকে যাবে সারাজীবন? ভবিষ্যৎ বংশধরেরা আমাদের মূর্খতাকে ক্ষমা করবে কী করে, জানি না।
