কিংবদন্তি মতে বিশ্বকর্মা স্বয়ং ছদ্মবেশে এই বাড়িটি গড়ে তুলছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যাওয়ায় লাফ দিয়ে প্রাসাদ-শীর্ষ থেকে নীচে নেমে আসেন। সেই সময়েই নাকি বাড়িটি ভূতলে প্রবেশ করে। যে স্থানটিতে বিশ্বকর্মা পড়েছিলেন বলে প্রবাদ, সে স্থানটি একটি ছোটোখাটো জলাভূমিতে পরিণত হয়ে আছে এবং চলতি কথায় তাকে বলা হয় ‘কোর’।
অতীতের কথা থাক। সে দিনকাল তো অনেক আগেই গিয়েছে। কোনো এক ভূমিকম্পের পর থেকেই নাকি বেতাই নদীরও অন্তিম দশা দেখা দিয়েছে। যে ব্রহ্মপুত্র থেকে বেতাই নদীর উৎপত্তি, এখানে তার মতোই এই নদীটিও আজ একটি মরা নদী।
পাকিস্তানের বিপাকে পড়ে মুমূর্য গ্রামটিরও আজ অন্তিম অবস্থা। তবু তার কথা বলতে পারছি না। এই গ্রামখানিই যেন আমার সমস্ত সত্তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। বিষয় সম্পত্তির প্রলোভন বা তার ক্ষতির বেদনায় নয়–যে আবহাওয়ায় মানুষ হয়েছি, যে মধুর পরিবেশের মধ্যে আমার বিকাশ হয়েছে, তার মাধুর্যময় স্মৃতিটুকুই সে মাটির দিকে মনকে টেনে নেয়। বেতাইকে স্মরণ করে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘সতত হে নদ তুমি পড়ো মোর মনে কিংবা গ্রামখানিকে স্মরণ করে ‘মোদের পিতৃ-পিতামহের চরণধূলি কোথায় রে’ বলতে যেন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠি। মরা নদীর তেমন কোনো আকর্ষণ নেই–বৎসরের বেশির ভাগ সময়ই সে তার স্থির জলরাশি নিয়ে অসাড় হয়ে পড়ে থাকে। বৈশাখ মাসে অনেকটা তো শুকিয়েই যায়। তবে বর্ষায় আবার যৌবন-জোয়ার দেখা দেয়–দেখা দেয় নিস্তরঙ্গ জলরাশিতে স্রোতের প্রবল বেগ। কূল ছাপিয়ে জল বয়ে যায় ধানের খেতে খেতে। কচি ধানের পাতাগুলো যখন সোনালি রোদ্দুরে বাতাসে বাতাসে ঢেউ খেলে যায় তখন কতদিন আপন মনে আবৃত্তি করেছি–এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে।
নদীর তীরে হাট, তার পিছনে একটি পুকুর, তার উলটো দিক থেকেই গ্রামের আরম্ভ। একটি বটগাছ কোন অতীতকাল থেকে যে পারঘাটায় হাট-যাত্রীদের বিশ্রামের আয়োজন করে বসে আছে তা কেউ বলতে পারে না। এই বটবৃক্ষের নীচেই বর্ষাকালে ব্যাপারীদের নৌকাও এসে লাগে। গ্রামে সাড়া পড়ে যায়, চাঞ্চল্যের মরসুম পড়ে যায় পাট-ধান-মশলা ইত্যাদি বেচাকেনার। দূরদেশ থেকে আত্মীয়স্বজনের নৌকাও এসে লাগে। ছোটো ছেলের দল তামাশা দেখতে জড়ো হয়–যুবকের দল নিজেরা নৌকা চালিয়ে বেরিয়ে পড়ে আনন্দে। ছোটোবেলায় কতদিন যে নিজেরাও এমনি করে নৌকা নিয়ে মাতামাতি করেছি তার স্মৃতি মন থেকে এখনও মুছে যায়নি।
দীর্ঘকাল হিন্দু-মুসলমান সম্মিলিতভাবেই পাশাপাশি বসবাস করে আসছে এই গ্রামে। তাদের পরস্পরের মধ্যে একটা প্রীতির ভাবের আদান-প্রদান ছিল। খেলাধুলায়, ষাঁড়ের লড়াইয়ে, গানে-বাজনায় সকলে একসঙ্গে আনন্দ করেছে–কোনোদিন ধর্মের গোঁড়ামি কাউকে পেয়ে বসেনি। একবার গ্রামে দাঙ্গার সময় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন হিন্দু-মুসলমান মিলিত হয়ে ভ্রাতৃবিরোধ রোধ করেছিল। সে-কথা আজ বারবার মনে পড়ছে।
স্মৃতির প্রেক্ষাপটে অতীত আজ মুখর হয়ে উঠছে। অনেক ভুলে-যাওয়া পরিচিত মানুষকে ফিরে পাচ্ছি। মনে পড়ছে সহরালি মাতব্বরের কথা–এই দীর্ঘাবয়ব, লম্বা ও পাকা চুল-দাড়ি; লোকটির চেহারায় যেমনি একটা সৌষ্ঠব ছিল, তেমনি ছিল ব্যক্তিত্বের ছাপ। তার অমায়িক প্রকৃতি, তার বিনম্র ব্যবহার, তার সুমিষ্ট সদালাপ ভুলে যাবার নয়। মনে পড়ে মনোহর ব্যাপারীর কথা। লাঠিখেলায় সে ছিল ওস্তাদ এবং সাহসও ছিল প্রচুর। সর্বদাই একটি দীর্ঘ লাঠি হাতে নিয়ে চলাফেরা করত এই লোকটি এবং যৌবনের দুঃসাহসিক কাহিনি অভিনব ভঙ্গি সহকারে শুনিয়ে আসর মশগুল করে তুলত। তারপর মনে পড়ে আলম মুনশির কথা। মুনশি হিসেবে এ অঞ্চলে বহুদূর পর্যন্ত তার একটা প্রভাব গড়ে উঠেছিল এবং স্বাভাবিকভাবেই তা গড়ে উঠেছিল তার চরিত্রমাধুর্যে। আজ এরা কেউ আর জীবিত নেই। এদের উত্তরাধিকারীরাও সেসব সদগুণাবলির উত্তরাধিকার পায়নি কেউ। তা যদি পেত তবে এত সহজে গ্রামের এত পরিবর্তন হতে পারত না। মুনশির ভাইপো মুনশি হয়েছে বটে, কিন্তু এই জামু মুনশি তার চাচার ঠিক বিপরীত। তাকে লোকে সমীহ করে–শ্রদ্ধায় নয়, অন্তরের টানেও নয়–অনেকটা শনির সিন্নি-দেওয়া গোছের ব্যাপার। জামু মুনশিই এ অঞ্চলে লিগের পান্ডা, ইসলামের ধ্বজাবাহক এবং সাম্প্রতিক উস্কানির উৎস। সে কি যেমন তেমন মুনশি? গোটা পাঁচ-ছয় নিকে সে করেছে এবং তার চাচিকেও সে বাদ দেয়নি।
অবিনাশদারও সেদিন আর নেই। তিনি লাঠি হাতে নিলে একাই ছিলেন এক-শো। এত বড়ো শক্তিশালী পুরুষ এ অঞ্চলে আর ছিল না–এখন বৃদ্ধ স্থবির। আর সেই প্রসন্ন চক্রবর্তীর কথা। হাস্য-পরিহাসের জন্যে তিনি সকলের ছিলেন ঠাকুরদা। তাঁর বিরাট দাড়ি দেখে আমরা তাকে ডাকতাম ‘পশম ঠাকুরদা বলে। তারপর মনে পড়ে উল্লাস পন্ডিতের কথা। এই উল্লাস জাতিতে রজক দাস–লেখাপড়ার কোনো ধারই সে ধারেনি, নামটি পর্যন্ত সে লিখতে জানে না। তবুও সে পন্ডিত। লোকটির উপস্থিত বুদ্ধি ও হাস্যরস পরিবেশনের শক্তি অসাধারণ! যে কোনো স্থানে সে আসর জমিয়ে তুলতে পারে। তাকে ছাড়া কোনো গানের আসর জমে না। একদিন জিজ্ঞেস করলাম-‘কী রে উল্লাস, তুই লেখাপড়া জানিস না তো পন্ডিত হলি কি করে?’ সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—’বাবু! আমি কি লেখাপড়ার পন্ডিত? আমি কথার পন্ডিত, হাসি-তামাশার পন্ডিত।’
