গ্রামের বাজার ছিল একমাইল দূরে। মেঘনার তীরে সেই বাজারটি পূর্ববাংলার অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়স্থল ও বন্দর। স্থানীয় অধিবাসীদের চেষ্টায় সেখানে স্কুল ও কলেজ দুই-ই স্থাপিত হয়েছে। আজ জানি না সেখানে শিক্ষা ও সংস্কৃতির উত্তরসাধক কারা।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে জাপানি-অভিযানের আশঙ্কা ছিল পূর্ববাংলার প্রান্ত দিয়ে। চট্টগ্রামে প্রতিরোধের আয়োজন করেছিল সাউথ-ইস্ট এশিয়া কমাণ্ডের সৈন্যদল। রণসম্ভার ও সৈন্যবাহিনী চলাচলের জন্যে আমাদের গ্রামের স্টেশনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল। বিশেষ করে মেঘনার ওপরে যে সেতুটি আছে তা রক্ষা করবার জন্যে বিমানবিধ্বংসী কামানও সজ্জিত করে রাখা হয়েছিল সেখানে। সেই রণসজ্জার পাশে গ্রামটির নিরাভরণ শান্তশ্রী কী অপূর্বই না লাগত! নির্মেঘ আকাশে তখন সন্ধানী বিমানের আনাগোনা থরথর করে কাঁপিয়ে দিয়ে যেত গ্রামের মাটিকে, তার ভাঙা শিবমন্দির আর পঞ্চবটির ঘাটকে।
যুদ্ধের সমাপ্তিতে সে কাঁপনের অবসান ঘটল। আবার বারোয়ারিতলায় দুর্গাপুজোর উৎসবে বসল যাত্রার আসর। স্তব্ধ-কুতূহলী শ্রোতাদের চোখেমুখে তখন নিমাই সন্ন্যাসের করুণতার ছায়া এসে নেমেছে। ছলছল করছে সহস্র জোড়া চক্ষু। তাকিয়ে দেখলাম, কোণে-বসা। রহিমউদ্দিনের চোখেও জল। নিমাই সেদিন জাতিবর্ণনির্বিশেষে সকলকে কাঁদিয়ে দিয়েছিল।
এই ছিল গ্রামের স্বরূপ। এ গ্রামকে ভালোবেসেছি। তার সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি, অজ্ঞতা, কুসংস্কার নিয়েই ভালোবেসেছি। নিরক্ষর কৃষক, তন্তুবায় প্রভৃতি যেমন ছিল সেখানে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপ্রাপ্তদের সংখ্যাও কম ছিল না। আলো আর অন্ধকার পাশাপাশি হয়েই বাস করছিল সে গ্রামে। কে জানত অকস্মাৎ কালবৈশাখীর ঝড় এমনি করে আলোকে নিভিয়ে দিয়ে নিরন্ধ্র অন্ধকারের কালিমা ছড়িয়ে দেবে সারাআকাশময়। সেই অন্ধকার আকাশের নীচে দুঃস্বপ্নের মতো পড়ে আছে আমার ছেড়ে-আসা গ্রাম, ময়মনসিংহ জেলার দক্ষিণ প্রান্তে মেঘনা নদীর তীরবর্তী সোনার কমলপুর। তার এক মাইল দূরে ভৈরববাজার আর ষোলো মাইল দূরে আধা-শহর বাজিতপুর। হায় রে জন্মদুঃখিনী দেশ, শিশু-ভোলানো প্রবোধ দিয়ে সেদিন তোমাকে ছেড়ে চলে এলাম কলকাতার ফুটপাথকে আশ্রয় করে। কে জানে তোমার আকাশে এখনও চাঁদ আর তারা হাসছে কি না, কে জানে মেঘনার দোলনে কাঁপছে কি না তোমার ঝুমকোলতার দুল আর দোলনচাঁপার কণ্ঠহার।
স্টেশন থেকে বাড়ি আসবার পথে কতজন কুশল প্রশ্ন করত। আর আজ আমি হারিয়ে গেছি কলকাতার জনারণ্যে, হারিয়ে গেছি সুরেন ব্যানার্জি রোডের আস্তানায়। এখানে আমায় কেউ চেনে না, কেউ শুধোয় না–হে বন্ধু, আছ তত ভালো? আমি তো এখানকার অধিবাসী নই, আমি যে শরণার্থী, উদবাস্তু।
.
খালিয়াজুরি
গ্রামহৃদয়া বাংলাদেশ। এ দেশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার মতো লক্ষজনের আশৈশবের স্মৃতি। এর প্রতিটি ধূলিকণা, এর আকাশের রংফেরা, এর নদী-কল্লোলের পরিচিত সুর একান্ত করে ভালোবেসেছি, ভালোবেসে ধন্য হয়েছি। কতদিন মনে হয়েছে এ দেশের মাটি শুধু মাটি নয়, মায়ের মতোই এ মাটি স্নেহ-স্নিগ্ধ।
এ মাটির স্নেহ-দাক্ষিণ্যে প্রতিপালিত আমার সাতপুরুষ, হয়তো এই মাটিকেই আপন করে নিত আমাদের অনাগত উত্তর-পুরুষেরাও। কিন্তু আজ সে আশা স্বপ্ন বলেই মনে হয়। আমার জননী, আমার জন্মভূমি থেকে আজ আমি বিচ্ছিন্ন। আমি আজ প্রবাসী। কিন্তু দূরান্তরে থেকেও তো সে মাটির স্মৃতিকে ‘বিস্মৃতির মুক্তিপথ দিয়ে বিদায় করে দিতে পারছি না। গভীর রাত্রে যেমন করে ‘নিশি ডাকে’ বলে লোকপ্রসিদ্ধি আছে, তেমনি করে এই বিভুই-বিদেশে দেশের মাটি আমাকে নিশির ডাকের মতোই প্রতিদিন আকুল সুরে ডেকে বলছে, ওরে আয়, আয়, আয়।
গ্রামটি নেহাতই ছোটো। আকারে আয়তনে ছোটো হলেও শিক্ষায়-সংস্কৃতিতে, যশে গৌরবে, প্রভাব-প্রতিপত্তিতে পূর্ব-ময়মনসিংহের এই গ্রামটি কিন্তু কোনোক্রমেই নগণ্য নয়।
কবে যে এখানে বাসস্থান গড়ে উঠেছিল তার সঠিক স্মৃতি বা ইতিবৃত্ত নেই। পন্ডিতেরাও এর সাল-তারিখ নিয়ে কোনোদিন তর্ক করেন না। যেটুকু শ্রুতি আছে তাও ক্রমে লোপ পেতে বসেছে। কারণ বহুপুরুষ অতিক্রম করে এসে তার প্রতি আমাদের ঔৎসুক্য কমে আসছে। কিংবদন্তি মতে মোগল রাজত্বের শেষের দিকে দক্ষিণ রাঢ় থেকে দুই ভাই পশুপতি ঠাকুর ও গণপতি ঠাকুর নিজেদের স্বাতন্ত্র ও স্বাধীনতা বজায় রাখবার জন্য মুসলমানদের সঙ্গে রণে ভঙ্গ দিয়ে জলপথে পলায়ন করে এসেছিলেন। বহুদেশ অতিক্রম করে প্রথমে খালিয়াজুরি গ্রামে তাঁরা বাসস্থান নির্মাণ করেন। এই স্থানটি জনবিরল এবং বর্ষায় একটি ছোটো দ্বীপের আকার ধারণ করে বলেই হয়তো তাঁরা এ স্থানটিকে নিরাপদ বলে মনে করেছিলেন। হয়তো বা বাসস্থানের পক্ষে যথেষ্ট মনে না হওয়ায় কিছুকাল মধ্যেই গণপতি ঠাকুর নতুন বাস্তুর সন্ধানে নির্গত হয়ে পাশের গ্রামে এসে আস্তানা গাড়েন। আর পশুপতি খালিয়াজুরিতেই থেকে গেলেন।
এই বাসস্থান নির্বাচনের মূলে নিরাপত্তার প্রশ্নটা যেমন ছিল, তেমনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রাচুর্যের আবেদনও যে ছিল, একথা অনুমান করা যেতে পারে। একদিকে কলস্বনা নদী বেত্রবতী, চলতি কথায় যাকে বলে বেতাই’–অপরদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি, মাঝখান দিয়ে সুপরিসর নদীতটরেখা–বাসস্থানের যোগ্য স্থানই বটে। নদীকে পেছনদিকে ফেলে বাড়ি নির্মিত হল–সম্মুখের অঞ্চল জুড়ে আয়োজন হল আবাদের। তারই শেষ প্রান্ত থেকে বিস্তীর্ণ বিলের অপর তীরে সুর্যোদয় এক লোভনীয় প্রাকৃতিক পটভূমি সৃষ্টি করে। নদীর পশ্চিম তীরটি অপেক্ষাকৃত ঢালু এবং বনজঙ্গলময়। কিছুদূরে কয়েক ঘর হদির বাস। হদি’রা এখন আর নেই, কবে কোন অতীতে যে তাদের বাসস্থান শূন্য হয়ে গেছে তার ইতিহাসও কেউ বলতে পারে না। তবে ক্রমে এই গণপতি ঠাকুরের বংশধরেরাই নদীর পশ্চিম তীরেও বসবাস আরম্ভ করেছিল এবং বিরাট জনপদ গড়ে তুলেছিল। কালক্রমে শুধু আদি বাড়িটাই পূর্বতীরে থেকে যায়, আর সবাই পশ্চিম তীরেই পল্লি গড়ে তোলে। এর মাইল দুই দূরেই ‘রোয়াইল বাড়ি’র ভগ্নাবশেষ আজও বিদ্যমান। বিরাট রাজপ্রাসাদের ভগ্নাবশেষ–চতুর্দিকের পরিখা আজও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বহুভগ্ন বা ভূগর্ভনিমজ্জিত অট্টালিকা আজও পূর্ব পরিচয়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে। সিংহদ্বারের দু-পাশে দুটি বিরাট দীঘি। এটি ছাড়াও অন্দরমহলের সংলগ্ন তিনটি পুকুর এবং দু-তিনটি স্ফটিকস্তম্ভও দেখতে পাওয়া যায়। প্রায় অর্ধমাইল পরিবৃত স্থান ইষ্টক-সমাকীর্ণ। কোনো কোনো ইটের গায়ে ফুল লতাপাতা খোদিত। কোনো কোনো ইট আবার চিনামাটির মতো একপ্রকার জিনিস দিয়ে তৈরি এবং তাতেও অপূর্ব শিল্পকলার নিদর্শন বর্তমান।
