কলকাতার সঙ্গে নাড়ির যোগ নেই আমার, আছে প্রয়োজনের। বিপর্যয়ের পসরা মাথায় বহন করে যেদিন এসেছিলাম কলকাতায়, তখন এই মহানগরী নিষ্ঠুর ঔদাসীন্যে আমায় ঠেলে বের করে দিতে চেয়েছিল তার আঙিনা থেকে। দাবি তো আমার বেশি কিছু ছিল না। আট নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়িটাও আমি চাইনি, কিংবা পারমিটের জন্যে আবেদন নিবেদনও করিনি রাজ্যসচিবদের কাছে। চেয়েছিলাম একটু মাথা গোঁজবার জায়গা আর সাধারণ সুস্থ নাগরিকের মতো খেয়ে-পরে থাকবার অধিকার। কলকাতায় ধনভান্ডার দিন দিন স্ফীতকায় হয়ে উঠছে ক্লাইভ স্ট্রিট বড়োবাজারের হর্ম্যাভ্যন্তরে। সে ভান্ডারের অংশীদার হতে তো চাইনি আমি। আমি চেয়েছিলাম নেহাৎ জীবনধারণের মতো আয়, কায়িক ও মানসিক শ্রমের বিনিময়ে। নিষ্ঠুর নগর-লক্ষ্মী রূঢ়ভাবে প্রত্যাখান করেছে আমায় বারবার। তবুও নিরাশ হইনি আমি! জীবিকার জন্যে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম কলকাতাকে। সে আমাকে হারাতে পারেনি। তাই আজও বেঁচে আছি আপনাদের শোনাব বলে আমার ফেলে-আসা জীবনের ইতিহাস, যা জড়িত হয়ে আছে আমার সাতপুরুষের ভিটে ছেড়ে-আসা গ্রামের সঙ্গে।
।মেঘনার কোলঘেঁষা পূর্ববাংলার একটি গ্রাম। পৃথিবীতে প্রথম যে আকাশের নীল আর সূর্যের আলো এসে লেগেছিল আমার চোখে, সেটি সেই গ্রামের। স্বপ্নের মতো লাগত গ্রামের প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মাঠ, প্রতিটি পুকুরের চারধারের প্রকৃতির পরিবেশকে। পশ্চিমবাংলার অনেক গ্রাম দেখেছি। কিন্তু পূর্ববাংলার গ্রামের মতো সবুজ স্নিগ্ধ মাটির স্পর্শ কোথাও পাইনি। যে গ্রামে জন্মেছিলাম, তার আয়তন ক্ষুদ্র, জনবল নগণ্য। হয়তো পাঁচ হাজারের বেশি হবে না। নগণ্য বললাম এইজন্যে যে, পূর্ববাংলার যেকোনো গ্রামে দশ হাজার লোকের বসবাস অত্যন্ত স্বাভাবিক। গ্রাম থেকে একমাইল দূরে উদ্দাম স্রোতোধারায় বয়ে চলেছে দূরন্ত মেঘনা। কালো মেঘের ছায়া বুকে নিয়ে ভরা বর্ষায় সে কী দুর্দাম, দুর্বার তার গতি! একবার মনে আছে ছোটোবেলায় পাড়ি দিয়েছিলাম মেঘনা, ছোট্ট নৌকা করে। ঢেউয়ের ঝাঁপটা লেগে নৌকা প্রায় তলিয়ে যায়। আমার কিশোর মন সেদিন ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মেঘনা নদীর মুসলমান মাঝি ঢেউকে ভয় পায় না। দরিয়ার পিরের দোহাই দিয়ে নির্বিঘ্নে পৌঁছে দিয়েছিল সে আমাকে নদীর ওপারে। বিদ্রোহী মেঘনার সেদিনের রূপটি মনের স্লেটে খোদাই করা আছে আজও। সেই মেঘনার স্মৃতি নিয়ে সুবর্ণরেখা, অজয় কিংবা কোপাই নদী দেখলে মনে হয়, এগুলো নদী নয়, নদীর ছায়ারূপ।
যে গ্রামে জন্ম, সেখানে সব সময় থাকতাম না আমি। মাইল ষোলো দূরের একটা আধা শহর বৃহত্তর গ্রামের ইস্কুলে পড়তাম আমি আমার মা-বাবার সঙ্গে থেকে। ছুটিতে চলে আসতাম বাড়িতে। রেলস্টেশন ছিল একমাইল দূরে। পরে অবশ্য গ্রামের মধ্যে স্টেশনটি স্থানান্তরিত হয়ে এসেছিল রেল কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনে। স্টেশন থেকে হেঁটে গ্রামমুখো আসবার সময়টা যেন আর কাটতে চাইত না। কতক্ষণে সুপুরি গাছের সারের তলা দিয়ে বাঁকা পথটি ধরে বাড়ির উঠোনে এসে হাঁক দেব ঠাকুরমাকে, সেজন্যে মনটা উন্মুখ হয়ে থাকত। গ্রীষ্মের ছুটিটাকে আমরা বলতাম আম-কাঁঠালের ছুটি। কাঁচা আমের গন্ধে তখন গ্রামের আকাশ ভরপুর। কিছুদিন পরেই রং ধরতে শুরু করবে গাছগুলোতে। ঘুঘু-ডাকা এক-একটা দুপুর। কত দুরন্ত মধ্যাহ্ন কাটিয়েছি কাঁচামিঠে আমগাছের ওপরে, সেগুলো আজ স্মৃতিমাত্র। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা সামনের ধানখেতের উদার বিস্তারকে মনে হত রাত্রিবেলা ঠাকুরমার কাছে শোনা রূপকথার সেই তেপান্তরের মাঠের মতো। কতদিন যে আশা করেছি, দেখা হয়ে যাবে নীল ঘোড়ায়-চড়া রাজপুত্রের সঙ্গে!
স্নান করতে যেতাম দক্ষিণের বিলে কিংবা কোনো কোনোদিন পঞ্চবটির ঘাটে। ঘাটটিতে পাঁচটি বটগাছ ছিল বলেই নামকরণের এত ঘটা। গ্রীষ্মের শেষে বিল যেত শুকিয়ে, তবু সেই কাদাভরা বিলের জলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি। শালুক আর পদ্মলতার অরণ্য ছিল বিলটিতে। সাঁতার কাটতে গিয়ে অনেকবার লতায় জড়িয়ে যেত পা। তবু আমাদের দুরন্তপনার শেষ ছিল না। গ্রামটি ক্ষুদ্রায়তন হলেও এর মধ্যেই নানা পল্লিতে ভাগ করা ছিল তার অধিবাসীদের বাসস্থান। পূর্বদিকে ছিল আচার্যপাড়া, দক্ষিণে ছিল জেলেপাড়া, উত্তরে তাঁতিদের বাসস্থান, তারই পাশে ছিল মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের বাড়ি, পশ্চিমে ছিল মুসলমান চাষিদের পাড়া। প্রতিসন্ধ্যায় এক-একটা পাড়ার এক-একটা বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ত। জেলেদের ঘরে জন্মেছিলেন বৃন্দাবন। আমরা তাঁকে দাদা বলে ডাকতাম। তিনি ছিলেন কবিয়াল। তারাশঙ্কর বাবুর কবি’ যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা সেই কবির জীবনীটি মনে করে দেখুন। এ কবিকে আমি চোখে দেখেছি। তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে ধন্য হয়েছিল আমার কিশোর মন। তিনি ছিলেন বৈষ্ণব।
দোল-উৎসবে, ঝুলনযাত্রায় আমরা বহুবার বৃন্দাবনের কণ্ঠে কবিগান শুনেছি। বাংলার লুপ্তপ্রায় কবি-সংস্কৃতির শেষপর্যায়টুকু আমরা শুনেছিলাম তাঁর গানে। তিনি আজ নেই। তাঁর গানের স্মৃতি বেঁচে আছে। দুর্গাপুজোর উৎসবের স্মৃতি আজও অমলিন। বারোয়ারি পুজোয় চাঁপার ডালে ভিড় করত এসে দোয়েল। দুর্গা পুজোর সে কী উদ্যম আর উদ্যোগ। বর্ষ পরিক্রমা করে আশ্বিনের এই দিনগুলোর জন্যে, উৎসব-বিলাসী গ্রামের ধনী-নির্ধন অধিবাসীরা প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে থাকত। শরতের সোনালি আঁচল ছড়িয়ে পড়ত আকাশের গায়। পেঁজা তুলোর মতো নির্জলা মেঘের দল উধাও হয়ে যেত মেঘনার দু-তীরের আকাশে। নদীর চরে একরাশ সাদা কাশবনের ভেতর যেন হারিয়ে যেত মন। রাস্তার দু-ধারে অযত্ন-বর্ধিত কেয়া আর জুইফুলের ঝোপে মন-পাগলকরা গন্ধ ছড়িয়ে থাকত। শিবতলার মন্দিরের গা বেয়ে যে মাধবীলতার মালঞ্চ নুয়ে পড়েছিল মাটিতে তার সৌরভ পথ-চলা হাটুরে লোকদের মনকেও দিত ভরিয়ে। গ্রামের বাড়িতে বারোমাসে তেরো পার্বণের প্রথা প্রচলিত পূর্ববাংলার সবখানেই। সেই উৎসবের আনন্দ শুধুমাত্র হিন্দুদের ছিল না, আমাদের মুসলমান প্রতিবেশীদেরও ভাগ নিতে দেখেছি তাতে সমানভাবে। দুর্গাপুজো কিংবা লক্ষ্মীপুজোর সময়ে মুসলমান ভাইবোনদের জন্যে খাবার আলাদা করে রাখত গৃহকর্তারা। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের খেত-জমিগুলো ভাগে চাষ করত মুসলমান কৃষকেরা। তাদের বলা হত বর্গাদার। কয়েকজন বর্গাদার কৃষকের নাম আজও মনে আছে আমার। সুন্দর আলি, রহিমউদ্দিন, সুকুর, মামুদ। এরা সবাই আমাদের বাড়িতে আসত। পরমসম্প্রীতি আর প্রতিবেশিত্বের মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ওদের সঙ্গে। আমার ঠাকুরমা ওদের ভালোবাসতেন ছেলের মতো। কোনোদিন ভাবিনি এমনি করে তাদের ছেড়ে চলে আসতে হবে অভাবনীয় ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে।
