কলকাতা শহর থেকে আড়াইশো মাইল দূরে। ব্রহ্মপুত্রের শাখানদীর শাখানদী ঘুরে ঘুরে এঁকেবেঁকে গেছে। সে বড়ো সহজ ব্যাপার নয়। নদী তো আরও কত দেখলাম, কিন্তু সেরকমটি আর দেখলাম না। ফাল্গুন, চৈত্রে মরুভূমির মতো ধু-ধু করছে বালির চড়া, রোদূরে তাকিয়ে থাকলে মাথা ঝিমিঝিম করে। ওপারে বালির ডাঙা, মুসলমান চাষিদের বাস। কী দুর্দান্ত কষ্ট সহ্য করতে পারে কালো কালো বলিষ্ঠ সেই চাষির দল। তাদের মধ্যে বেঁটেখাটো সর্দার গোছের একটা লোক–”শাহেনশা’ নাম ধারণ করে দোর্দন্ড রাজত্ব চালাচ্ছিল সেই তখনকার ইংরেজ রাজত্বের কালে। প্রকান্ড একটা আস্ত চরের মালিক ছিল সে। রাস্তায় যখন চলত তখন তার সামনে পিছনে থাকত পঁচিশ-ত্রিশটি দেহরক্ষী সর্দার, কোমরে গামছা জড়ানো, মাথায় পাগড়ি, কাঁধে লাঠি। ফি-বছর দু-চারটি করে বিয়ে করত এবং বিয়ে করেই সেই অশিক্ষিত গ্রাম্য চাষির মেয়েদের সে রাইফেল ধরতে শেখাত। তাদের তৈরি করে নিত নিজের মনের মতো করে। কোনো পুলিশ, কোনো আদালতের সে তোয়াক্কা রাখে না। দশটি বছর ছায়ার মতো পিছনে ঘুরেও তার সন্ধান পায়নি সরকারের চরেরা। এই সেদিন শুনলাম পুলিশের শক্ত বেড়াজালে সে আটকা পড়েছে এতকাল পরে–রাইফেলধারী দুজন নতুন বিয়ে-করা স্ত্রীর সঙ্গে একত্রে। এরা ভয়ংকর, এরা ভীষণ। এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ থাকত সাত তল্লাটের লোক। তবু সে স্মৃতি ভালো লাগে।
স্টিমারঘাট থেকে আঁকাবাঁকা পথ–বিধবার সিঁথির মতো ম্লান, ধূসর। তারপরে খেলার মাঠ, তারপরে টিনের আটচালায় গ্রামের ইস্কুল, বাঁধানো-ঘাট পুকুর, কৃষ্ণচূড়ার গাছ, আবার সড়ক, সরু কাঠের পুল, সরষে খেতের ধার দিয়ে ঢুকে আমার গ্রামের গাছের ছায়া। আঃ গ্রীষ্মের বৃষ্টির মতো ঝরঝর করে সেই ছায়ার শান্তি যেন গলায় গায়ে মাথায় ঝরে ঝরে পড়ে। আর কত পাখি! শহরের লোক চেনে শুধু কাক আর চড়াই। কারও কারও খাঁচায় থাকে শিকল-বাঁধা কোকিল, বিরস সুরে বারোমাসই ডাকে। আর শহরে পাখি আছে আলিপুরের পশুশালায়। কিন্তু পাখি দেখতে, পাখি চিনতে কে বা যায় সেখানে? ওদিকে গ্রামে যখন মনমরা শীতের শেষে একদিন হঠাৎ ঝকঝকে গলায় কোকিল ডেকে ওঠে–আঃ, শত সহস্র প্রাত্যহিক দুঃখে-ভরা পৃথিবী যেন চিৎকার করে ওঠে আনন্দে। গ্রীষ্মের রাতে নির্লজ্জ ‘বউ কথা-কও’ ‘বউ-কথা-কও’ শুনতে শুনতে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে আবার ঘুমিয়ে পড়ি। সাত সকালেই দোয়েল চুপিচুপি বসে গলা সেধে নিয়ে ফুড়ত করে দিনের কাজে বেরিয়ে পড়ে। ঘুঘু তখন কলমের ডালে বসে রোদকে সাধে—’সুয্যি ঠাকুর ওঠো-ওঠো-ওঠো।’
পূর্ববাংলার কোনো গৌরবই নেই আজ। কিন্তু কোমলে কঠোরে বিচিত্রতায় ভরা তার যে আপনকার রূপটি এই এ-যুগেও আমরা দেখেছি, আর কোথাও তার তুলনা নেই। যদি সম্ভব হত, এখনও যদি সম্ভব হয়, আবার কি তাহলে সেই নিভৃত পল্লিতে ফিরে গিয়ে দিন কাটবে, মন টিকবে? স্বীকার করি–টিকবে না। আরও শিক্ষিত, আমরা শহরের নেশার স্বাদ পেয়েছি। আমাদের জাত গেছে। তাই আমরা আন্তর্জাতিক। কলের জল আর পাউরুটি না হলে আমাদের মুখে রোচে না! বিজলি তারের আলো না জ্বললে আমাদের জীবন অন্ধকার। আমাদের জীবন জটিল হয়েছে। আমাদের প্রয়োজনের সীমা বেড়েছে। তা ছাড়া শহর আমাদের জীবিকা দেয়, শহরের ইস্কুলে আমাদের ছেলেরা পড়ে। পারব না, আবার সেই গ্রামে ফিরে যাওয়ার পথ চিরকালের মতো রুদ্ধ হয়েছে আমাদের জীবনে।
কিন্তু তাতে কী? সে যে আমার নিজের বাড়ি, নিজের ঘর! তারা যে আমার নিজের লোক। জীবিকার ধাঁধায়, জীবনের জটিল পাকে যতই আমরা ঘুরি না কেন, এক সময় তো ইচ্ছে করে ফিরে যাই মিটমিটে প্রদীপ জ্বালানো আপন বাড়ির ঘরটিতে! সেই আমার স্বপ্নে ভরা ছেলেবেলার দেশ। বোমায়, আগুনে, কামানে, বারুদে, যুদ্ধে, দাঙ্গায় পৃথিবীর অর্ধেক যদি ছারখারও হয়, তবু সেখানে থাকবে চুল-এলানো বাঁশবনের লুটোপুটি হাওয়া, কোজাগরী পূর্ণিমার মধুর রাত। টিনের আটচালায় সরসর করে পাতা ঝরবে। হিজলের ফুল ভাসবে পচা ডোবার জলে। সেই রবিবারে হাট বসবে। পাঠশালার বুড়ো মৌলবি সাহেব ওপারের চরের থেকে বেগুন-মুলো বেচতে আসবেন এ পারের গ্রামের বাজারে। কৃষ্ণের জীব বেতো ঘোড়ার পেটে-পিঠে তিনমন বোঝা দিয়ে গঞ্জের হাটে যাবে গাঁয়ের ব্যাপারীরা! বর্ষায় খেত ডুববে, ঝড়ে ভাঙা গাছের ডালে পথ বন্ধ হবে। কেউ তাকিয়ে দেখবে না, তবু সময় এলেই পুকুরের ধারে পলাশের ডাল লাল হয়ে উঠবে। বাবুই পাখিরা দোল খাবে নিপুণ ঠোঁটে-বোনা তাদের তালের পাতার দোলনায়। কিন্তু তারা কোথায়? যারা একদিন এপাড়া ওপড়ায় সাতপুরুষের ভিটে আঁকড়ে পড়েছিল? সেই দলাদলি, নিন্দা, ঈর্ষা, মন্দ আর অফুরন্ত ভাললাতে ভরা তারা
কোথায়?
সময় অস্থির, জীবন অস্থির। যারা গেছে তাদের আর এ জীবনে খুঁজে পাওয়ার সময় হবে না।
.
কমলপুর
আমি একজন সাধারণ মানুষ। আপনাদের সাধারণতন্ত্রের পুরোপুরি নাগরিকও নই। কারণ, নাগরিক-গৌরবের অধিকারী হবার পূর্ণ যোগ্যতা নেই বলেই হয়তো চিনবেন না আমাকে, অন্তত চেনবার মতো সময়, সুযোগ ও প্রয়োজনবোধও নেই হয়তো আপনার। কিন্তু আপনি আমাকে দেখেছেন, শুধু আমাকে নয়, আমার মতো হাজার হাজার গৃহহীন উদবাস্তু ছন্নছাড়াদের কলকাতায় ও তার আশপাশের শরণার্থী শিবিরে কিংবা ভাঙা বস্তির অন্ধ কুটিরে; না দেখলেও কাগজে নিশ্চয় পড়েছেন তাদের খবর।
