এখন মাঝে মাঝে বুনো হাঁসের স্বপ্ন দেখি, আকাশ আঁধার-করা মেঘের ছায়া পড়ে মনে। এখনও ঢল নামে মগরায়। টিনের চালে শিশির ঝরে, কাঁঠালপাতা পড়ে টুপটাপ। এখনও এসব শুনি। অভয়দার দোকান, আমতলা–ধবলার পুলের পাড়ের সূর্যাস্ত, গুদারার ঘাটে হাটুরে মানুষের ভিড়। এখনও এসব দেখি। মনের দিগন্তে তারা আছে, দেশের সীমান্তে তারা দুরে।
.
বিন্যাফৈর
জননী আর জন্মভূমি–পৃথিবীর শেষপ্রান্তে বসেও মনে পড়ে, মন ভার হয়ে আসে, প্রাণ বলে যাই-যাই, আর একবার সেই ডোবার জলে ধ্যানী মাছরাঙার ঝাঁপ খাওয়া দেখে আসি।
বাংলাদেশের গ্রাম বলতে শুধু রামধনু রঙের আকাশ, বুনো ঘোড়ার মতো বর্বর বর্ষার নদী, মাঠভরা সবুজ ধানের ঢেউ বোঝায় না–সে-কথা জানার মতো বয়স এখন হয়েছে। অনেক দুঃখ দেখেছি, অনেক কান্না শুনেছি, অনেক মৃত্যু দেখেছি। জানি সেখানে ম্যালেরিয়ার সময় ঠিকমতো কুইনিন মেলে না, সুযোগ বুঝলে মহাজনের গোলায় রাতারাতি চালের বস্তা কাবার হয়ে যায়, ডাকাত পড়লে তোক এগিয়ে আসে না, ভালো একটা ইস্কুল নেই, ঝড়ে ঘরের চালা উড়ে যায়, ঝাঁঝরা টিনের ফাঁক দিয়ে অবিরলধারে বর্ষার জল পড়ে। সবই জানি। মন্বন্তরে আশপাশের কত বাড়ির ভিটে উজাড় হয়ে গেল। ভূতের ভয়ে-ভরা ছেলেবেলা থেকে রোজ রাত্রিতেই ঘুম ভেঙে দুখীরাম দফাদারের বাজখাঁই গলার হাঁক শুনে বুক দুর দুর করে উঠেছে। হাতে টিমটিমে লণ্ঠন, সাপের মতো লিকলিকে সড়কি, দুখীরাম হাঁক দিচ্ছে—’বাবু জাগেন?’ আজও যেন হঠাৎ এক এক রাত্রিতে সেই স্বর শুনতে পাই। গাঁজার টানে ঊর্ধ্বনেত্র হয়ে সন্ধ্যায় গুম হয়ে বারান্দায় বসে থাকত, সময়ে অসময়ে বউটাকে ধরে বেধড়ক পেটাত। নিঃস্ব নিরন্ন সেই ইস্পাতের মতো লোকটাকে পঞ্চাশ সালে খ্যাঁকশিয়ালরা রাতারাতি টেনে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলল। আর আমার মালিবউ মোক্ষদা–অফুরন্ত রূপকথার মায়াপুরী যে খুলে দিয়েছিল–ভাঙা কুঁড়ের নীচে সেকেলে এক নড়বড়ে খাটের তলায় খিদের জ্বালায় ধুঁকতে ধুঁকতে তার প্রাণের ভোমরা চুপ করল। তার গোছাভরা তাগাতাবিজ আর মন্ত্রের শক্তিতে বাঁধা পোষা ভূতের দল বাঁচাতে পারল না তাকে। কলকাতা থেকে সেবার গ্রামে গেলাম। চিরকাল যার বুকেপিঠে মানুষ হয়েছি, নিজে না খেয়ে কলাটা-মুলোটা রেখে দিত আমাদের জন্য সরিয়ে, সেই লোক আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে হাত ধরে কেঁদে বলল-”খোকন, বড়ো দুঃখ। পারিস তো চার আনা পয়সা আমাকে দিয়ে যা।’-এই সবই তো দেখেছি। তবু যেন আর একবার মন বলে যাই-যাই। ঝুমকোলতায় ঢাকা ছ্যাঁচা বাঁশের বেড়ার ধারে সেই শূন্য উঠোনের তুলসীতলায় গিয়ে দাঁড়াই একবার। জননী আর জন্মভূমি–তার চাইতে আপনকরা প্রাণের জিনিস স্বর্গে গেলেও পাব না।
সেই দেশ চিরকালের মতো পর হয়ে গেল? মানচিত্রে একটা রেখার এক টানে নিজের বাড়ি হয়ে গেল বিদেশ?–ভাবতেও পারি না। আমরা রাজ্য চাইনি, রাজত্ব চাইনি, সরকারি খেতাবের গৌরব চাইনি। শিশুকাল থেকে মুসলমান প্রজার দেওয়া সুখ-দুঃখের টাকায় আমরা মানুষ হয়েছি–কিন্তু মনে মনে লজ্জা পেয়েছি সেজন্যে। প্রাণের তেপান্তরের খোঁজে মন্ডল সাহেবের আরবি-ঘোড়ায় চড়ে মাঠের পথে উদ্দাম হয়ে ছুটে বেড়ানোর সুখ এ জীবনে আর কি কখনো হবে?
কত মুখ মনে পড়ে! কচি, কাঁচা, ছেলে, বুড়ো, কার গালে দাড়ি, কার শিরে টিকি; পিঠে জাল কাঁধে লাঙল, মাথায় ঝাঁকা; ছিন্ন লালশাড়ি, গ্রন্থি-দেওয়া আধময়লা থান; কাকা, চাচা, দিদি, বউ-কতরকম সম্পর্ক। দ্যাশে আইলেন?’–একগাল হাসি। কী এক রকম খুশিতে মনটা লাফ দিয়ে উঠত নদীর ঘাটে স্টিমার থেকে নেমেই। মাল আছে না কর্তা? তাইলে ঘোড়া দেই এট্টা। গরম চমচম আছে বাবু, নিয়া যান কিছু। শরীর ভালো আছে ত?’-কে হিন্দু, কে মুসলমান? এরা সবাই আমার আপনজন। তারা আছে, তারা থাকবে। পৃথিবীর কোনো যুদ্ধ, কোনো দাঙ্গা, সে-কথা ভুলিয়ে দিতে পারবে না। তবু যখন দলে দলে নিরাশ্রয়ের দল চিরকালের ভিটে-মাটি ফেলে নিষ্ঠুর প্রবাসের গাঁয়ে প্রাণের মায়ায় ছুটে আসে, অভিমানে মন ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু অভিমান কার ওপর করব? যদি নিশ্চিন্ত মনে সে-কথা জানতুম!
নিজের জন্মভূমি, নিজের গ্রাম যে এত আমাদের প্রিয়, এত গরীয়সী সে কি শুধু অবুঝ মনের ভাবালুতা? সে কী শুধু দশের মুখের শোনা কথা? পৃথিবীর সবচেয়ে হতশ্রী পল্লিতে জন্মের জীর্ণ কুটিরটি নিজের চোখে যে তাজমহলের চেয়েও সুন্দর লাগে-তার মধ্যে ফাঁকি নেই। সেই বাড়িতে একদিন আমি চোখ মেলে অবাক-বিশ্বে প্রথম তাকিয়েছিলাম। বাতাবিলেবু ফুলের ঘ্রাণ চিনতে চিনতে গুনগুন করে মায়ের মুখে সেই বাড়িতে আমার রবীন্দ্রনাথের গান প্রথম শোনা। মালিবউ-এর হাত ধরে শঙ্কিত মনে সেই গ্রামের রাস্তা বেয়ে প্রথম পাঠশালায় যাওয়া। রহস্যে ভরা কলকাতা শহরের প্রথম চিঠি পাওয়া সেই বিন্যাফৈর গ্রামের ডাকপিয়োন আতোয়ার ভাইয়ের হাত থেকে। নদীর পাড়েতে দাঁড়িয়ে ধু-ধু চরের দিকে তাকিয়ে বিরাট বিশ্বের অস্ফুট স্বপ্ন দেখা। এসব কি ভোলা যায়? দু-চোখ ভরে, মন ভরে, হৃদয় ভরে আমার সেই আপন গ্রাম আমাকে অকৃপণভাবে কতই যে দিয়েছে। এই সুয়োরানির দেশ কলকাতা শহরের এত সুখ গলা দিয়ে যেন নামতে চায় না। ধড়ফড় করে এক সময় মন বলে ওঠে, যাই-যাই আমাদের সেই দুয়োরানি দুঃখিনী মায়ের কোলটিতে।
