এতকাল দেখেছি মেয়ে-ইস্কুলের ‘ঝি’ এসে বেলা ন-টায় একবার রাস্তা দিয়ে হাঁক পেড়ে যেত। তারপর খালি পা, ভেজা চুল, গাছকোমর-শাড়ি একপাল মেয়ে তাড়িয়ে সেই ‘ঝি’ তার ছাতা ও ছেঁড়া চটি টানতে টানতে মোক্তারপাড়ার দিকে পথ ধরত। সেখানে দুই মানুষ উঁচু টিনের বেষ্টনী তুলে মেয়ে-ইস্কুল স্তব্ধ। আর তারই উলটো দিকে দত্ত হাই-এর দিলদরিয়া খোলা মাঠে আমাদের দিনভর হইহই। বছরে একটি দিন সন্ধেবেলায় সেই মেয়ে-ইস্কুলের টিনের দরজা খুলত, ছেলে-মেয়েতে মিলে সেদিন হত রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসব। দাদাদের কাছে শুনতাম, শান্তিনিকেতনের বাইরে রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসব প্রথম হয়েছিল আমাদের এই পান্ডববর্জিত দেশে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেসব দিন সরে গেল। এখন ঝি ছাড়াই মেয়েরা চলেন, দু-একটা বিদগ্ধ রাজনীতি আলোচনায়ও ওঁদের অঞ্চলের ছায়াপাত ঘটে। দিন কাটছিল বেশ। শহর জুড়ে রাজনীতি ছাড়া কথা নেই, দেখতে দেখতে আরও চায়ের দোকান বসল তেরিবাজারের পাড়ায়। নদীর ঢালু পাড়ের ওপর তাদের ঝোলানো বারান্দা, বর্ষায় জল এসে নীচে খেলা করে। যুবা, প্রৌঢ় ও বৃদ্ধের জন্যে বয়ঃক্রমে নির্দিষ্ট হল চায়ের ঘর-তারও মধ্যে কংগ্রেস, আর. সি. পি. আই. ও কম্যুনিস্টদের চা-পান সভা পৃথক হল। আমতলা থেকে শুরু করে নদীর ধারে ধারে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ল রাজনৈতিক দলের আলাপন গৃহ। মাঝখানে অভয়দা আর মানিকের ঘরে চায়ের আড্ডা সর্বজনের। সকল দলের লোক সেখানে আসে। চেঁচিয়ে পাড়া গরম করে তারপর ধীরে সুস্থে নিজের নিজের চা-ঘাঁটির বিবরে গিয়ে ঢোকে। এইসব চায়ের দোকানে একটা কাল্পনিক বিদগ্ধতার ভাব ছিল প্রখর। বড়ো বড়ো লিখিয়েদের নাম শোনা যেত প্রায়শই। তার মধ্যে বিদগ্ধতায় অগ্রণী তরুণ সভাগুলো, সেখানে যোশী, এম. এন. রায়দের উক্তি নিয়ে তক্তপোশ ফাটে। ভাবী সংগ্রামের নীতি ও পথ এবং জার্মান জাতির কখনো রণবল ও ইয়োরোপের ভবিষ্যৎ আলোচনায় কখনো হাতাহাতিরও জোগাড় হত কসমোপলিটান ঘর অভয়দা ও মানিকের দোকানে। তবে তার মধ্যে হঠাৎ হালকা হাওয়ার মতো সলিলদার হাসির কথা ছুটত, বিমলদার রবীন্দ্রগীতির ভান্ডারও ছিল অফুরান। ঠাণ্ডা হতে সময় লাগত না। এই ছোটো শহরে যেমন আট বছরের ছেলেও দল করে, তেমনি কেউ আবার দলাদলিতে নেই। সমস্ত কিছুরই ওপরে আড্ডা আর হো হো করে দিন কাটিয়ে দেবার এমন একটা নেশা ছিল যে, কারুরই নিষ্ঠা সহকারে ঝগড়া করার সময় মিলত না। কম্যুনিস্ট পার্টির যিনি প্রধান দাদা ছিলেন, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেসের ছেলেরাও ঝুলে থাকত। কোনো একটা অন্যায় আচরণের জন্যে আর, এস, পি-র ছেলেকে ডেকে ধমকে দিতেন কংগ্রেসের মুখ্য নেতা। আড্ডার ঘড়ি চলেছে সকাল আটটা থেকে বেলা একটা, তারপর কয়েক ঘণ্টার বিরতি দিয়ে আবার রাত সাড়ে আটটা অবধি। তারও পরে রাত্রির খাওয়া সেরে, বাছাই করা কয়েকটি দলনির্বিশেষে গোষ্ঠী আছে, তাদের আসর জমে নদীর পারে ঘাটলায় ঘাটলায়। কালীবাড়ির ঘাটে আমাদের আসন ছিল নির্দিষ্ট করা। শচীবাবুর বাড়িতে সান্ধ্য আসর জমত সাহিত্য ও সংগীতের। সে বাড়ির মেয়েরা ছিলেন রুচিতা। কলেজ ছুটির অবসরে তাঁদের হত দুষ্প্রাপ্য আবির্ভাব, কিন্তু তবু সুখলভ্য। অনেকদিন আমার পড়ার ঘরটিতে নির্বাচিতদের শুভাগমনে সন্ধ্যা জমে উঠত, বারিবর্ষণ তাকে আরও নিবিড় করত। হয়তো গানের সুর শুনে তেরিবাজারের আড্ডা-শেষের দু-একজন গৃহমুখী পথ ছেড়ে আস্তে এসে আসন নিত। বীরেন্দ্রকিশোরের পৃষ্ঠপোষিত উচ্চাঙ্গের মিউজিক কনফারেন্স ও রবীন্দ্র জয়ন্তী এক দিকে, অন্য দিকে রাজনীতি, অফুরন্ত সময় আর আড্ডা–এই গৌরবে গৌরবান্বিত নেত্রকোণা। এখানকার যুবকেরা বিদ্যার্জনের জন্যে যদি বা যায় বাইরে, বিদ্যাবিক্রয়ের জন্যে নয়। লোকে বলে সকালবেলায় ফেনভাত আর আড্ডার টান,–যাক জগৎ উচ্ছন্নে! থাকুক শুধু এককলি গান, দুটি রাজনীতির কেতাব আর দুর্লভ অমৃতসুধা এককাপ চা।
কিন্তু হঠাৎ একদিন ছেলেরা ইস্কুল যাবার পথ থেকে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এল। দেখতে দেখতে চৌধুরিবাড়ি থেকে সাত পাই পেরিয়ে উকিলপাড়া, মালগুদাম ছাড়িয়ে একদিকে মোক্তারপাড়া, অন্য দিকে নউল্যাপাড়া আর বড়ো পুকুরের পাড়গুলোতে কথাটা ছড়িয়ে পড়ল আগুনের মতো। মালগুদামের কুলিরা এল, আই. জি. এন. কোম্পানির মেয়ে-পুরুষ পাটের মুটে, ইস্কুলের ছেলেরা বেরিয়ে পড়ল। মেয়েদের ইস্কুলের বেড়া সরে গেল। ঘরের মেয়েরা পেছনের শানপাতা রাস্তা ছেড়ে সদর রাস্তায় এলেন। অগ্নিশিখার মতো একটি চলমান জনতা এসে থামল থানার বাইরে-ওদের ছাড়তেই হবে। বিয়াল্লিশের আগস্ট আন্দোলন শুরু হল নেত্রকোণা কাঁপিয়ে। কম্যুনিস্ট দাদারা নামলেন না সংগ্রামক্ষেত্রে। তবু যে ঘরের গৃহস্বামীরা গিয়েছেন, সেই ঘরের দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁদেরই ঘাড়ে। দেখতে দেখতে পাড়া খালি হয়ে গেল। আদালতের সামনের পিকেটিং পাতলা হল, ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী সব যুবা গেল কারাগারে।
এখন চায়ের দোকান ম্লান। তারপর আবার নেত্রকোণার দিন এসেছিল। হাজংদের পদধ্বনি ভেসে এসেছিল গারো পাহাড়ের সানুদেশ থেকে। কিন্তু বিয়াল্লিশের পাঁচ বছর পর আবার প্রাণশক্তি দুর্বল হয়ে এল পাহাড়তলির শহর নেত্রকোণায়। নেত্রকোণার জীবনরস শুষে নিল তারই আরাধ্য দেবতা-ব্যভিচারী রাজনীতি।
